নিখিলেশ বললে– গেলেই ভালো। আমি তো চাই ও ভাল হয়ে উঠুক, ভালো হয়ে নিজের বাড়িতে যাক। যার সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক শেষ হয়ে গেছে তার তো এখানে থাকাটাই উচিত নয়–
–কিন্তু সে জ্ঞান এখন কি ওর আছে? জ্ঞান থাকলে কি আমি ওকে এ বাড়িতে আনতেই পারতুম?
–তা ডাক্তারবাবু কী বলছেন?
–ডাক্তারবাবু তো বলছেন সারতে সময় লাগবে। বলছেন অনেকদিন ধরে কোনও মানসিক শক পেয়ে পেয়ে নার্ভের চাপ পড়েছে, তা ছাড়া শরীরে নাকি রক্তও নেই এক ফোঁটা–
–রক্ত দিতে হলে সে তো আবার অনেক খরচের ধাক্কা।
নয়নতারার ভালো লাগলো না কথাটা। বললে–তুমি কেবল খরচের কথাটাই ভাবছো। একটা মানুষের জীবনের চেয়ে কি খরচটাই বড় হলো? তেমন যদি হয় তাহলে না হয় অফিস থেকে দু’চার শো টাকা যা পাওয়া যায় লোন নেব
–লোন নেবে? লোন নিলে শোধ করতে হবে না? মাইনে থেকে মাসে-মাসে কেটে নেবে না?
নয়নতারা বললে–তা তো নেবেই। কিন্তু কত লোকের বাড়িতে বুড়ো শ্বশুর শাশুড়ী থাকে, তাদের খাওয়াতে পরাতে হয় না? অসুখ-বিসুখ হলে তাদের চিকিৎসার খরচ দিতে হয় না জামাইকে? মনে করে নাও না সেই রকমই একটা কিছু মনে করে নাও না যে তোমার শ্বশুরবাড়ির কোনও নিকট-আত্মীয় বিপদে পড়ে তোমার বাড়িতে এসে উঠেছে–
–তা ও কি তোমার আত্মীয়? ওকে তুমি কি এখনও তোমার আত্মীয় বলে মনে করো?
নয়নতারা বললে–যাও, তোমার সঙ্গে আমি তর্ক করতে পারবো না, তোমার মুখে কি কোনও কিছু আটকায় না? তুমি বাজে কথা বলছো কেন?
নিখিলেশ বললে–আমি বাজে কথা বলছি? তুমি উটকো একটা বাইরের লোককে বাড়িতে এনে তুললে আর দোষ হয়ে গেল আমার? তাহলে দরকার নেই আমার কথা বলে, আমি চলি, পথ ছাড়ো–
নয়নতারা পথ ছাড়লো না। নিখিলেশের দু’কাঁধে দুটো হাত রেখে বললে–না, যেও না, যদি যাও তো চা খেয়ে যাও, নইলে বুঝবো তুমি আমার ওপর রাগ করেছ–
নিখিলেশ বলে উঠলো–তা চা খেলেই কি আমি আমার কথার জবাব পেয়ে যাবো?
নয়নতারা বললে–তোমার কথার জবাব তো দিলুম, আবার কোন্ কথার জবাব চাও তুমি? তুমি তো কেবল টাকা খরচের কথা ভাবছো। তা আমি যদি চাকরি না করতুম তো তুমি আমার খাওয়া-পরার ভার নিতে না? কত লোকের বউ তো চাকরি করে না, তা তারা কি তাদের বউদের খাওয়ায় না, পরায় না? অসুখ হলে ডাক্তার দেখায় না? এর বেলায় আমি না হয় আমার মাইনের টাকাটাই খরচ করলুম, সে টাকাটা তো আমার চাকরি করা টাকা। সে-টাকাটাও কি আমি আমার ইচ্ছেমত খরচ করতে পারবো না? বলো, চুপ করে রইলে কেন, এর জবাব দাও–
নিখিলেশ উত্তেজিত হয়ে নয়নতারার কথার কোনও জবাব দিতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই পেছন থেকে গিরিবালার গলার শব্দ শোনা গেল। গিরিবালা বাইরে থেকে ডাকলে—দিদিমণি–
নয়নতারা এতক্ষণে যেন জ্ঞান ফিরে পেলে। নিখিলেশের সঙ্গে কথা বলতে বলতে সেও যেন তার পুরোন দিনগুলোতে ফিরে গিয়েছিল। হঠাৎ গিরিবালার ডাক শুনেই বললে–যাই–
গিরিবালা আবার বললে–ডাক্তারবাবু এসেছেন–
নয়নতারা চমকে উঠলো। নিখিলেশের দিকে চেয়ে বললে–ওই ডাক্তারবাবু এসেছেন, সকালবেলা একবার এসেছিলেন, বিকেলবেলা আর একবার আসতে বলেছিলুম। তুমি যেন চলে যেও না, ডাক্তারবাবু চলে গেলেই আমি তোমাকে চা করে দেব, চা খেয়ে তবে যেও
বলে তাড়াতাড়ি পাশের ঘরে চলে গেল। ডাক্তারবাবু তখন রোগীর ঘরে ঢুকে পড়েছেন।
পেশেন্ট কেমন আছে? তারপরে আর জ্ঞান ফিরেছিল?
নয়নতারা তখন পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল। বললে–আপনি চলে যাবার পর প্রলাপ বকছিলেন, তারপর জল খেতে চাইলেন–
–আর ওষুধ?
–ওষুধ খাইয়েছি। যে বড়িগুলো খাওয়াতে বলেছিলেন ওটা এখনও কিনে আনা হয়নি, এইবার কিনতে পাঠাবো—
ডাক্তার রোগীকে পরীক্ষা করতে করতে বললেন–ওইগুলো এতক্ষণে খাওয়ানো উচিত ছিল, ওইগুলোই আসল ওষুধ, ভিটামিন। ম্যালনিউট্রিশনের জন্যেই এই রকম হয়েছে
নয়নতারা বললে–আমি এখখুনি আনতে পাঠাচ্ছি–
–তাহলে পেশেন্টের জ্ঞান হয়েছিল!
ডাক্তারবাবু যেন নিজের মনেই কথাগুলো বললেন। তারপর রোগীর পরীক্ষা শেষ হতেই বললেন–ওই ওষুধগুলো পেটে পড়লে আরো তাড়াতাড়ি রোগীর জ্ঞান ফিরে আসতো–
নয়নতারা হঠাৎ জিজ্ঞেস করলে ভালো হতে আর কতদিন লাগবে ডাক্তারবাবু?
–বেশি দিন লাগবে না, তবে ওষুধটা আপনি তাড়াতাড়ি আনিয়ে নিন—
বলে বাইরে আসতেই নয়নতারা হাত-ধোবার জন্যে সাবান জল এগিয়ে দিলে। তারপর তাড়াতাড়ি আবার ঘরে ঢুকে আলমারিটা খুললে। আলমারির ড্রয়ারের মধ্যেই নয়নতারার সংসার-খরচের টাকা থাকে। নয়নতারা টাকাগুলো গুনে দেখলে। মাসের শেষ। মাত্র কটা টাকা পড়ে রযেছে। আটটা এক টাকার নোট নিয়ে এসে তাড়াতাড়ি ডাক্তারবাবুর হাতে দিয়েছে। সকালবেলাও একবার আটটা টাকা দিয়েছিল। মিকশ্চার কিনে আনতেও সাত-আট টাকা বেরিয়ে গেছে। অথচ আসল ওষুধগুলোই আনা হয়নি তখনও। সবগুলোই দামী দামী ভিটামিনের ওষুধ!
বাইরের উঠোনের ধারে ডাক্তারবাবু তখনও দাঁড়িয়ে ছিলেন। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তোয়ালে দিয়ে হাত দুটো মুছছিলেন। নয়নতারা কাছে গিয়ে টাকাগুলো দিতেই তিনি সেগুলো না গুনে পকেটে পুরে নিলেন।
তারপর বললেন–তাহলে কাল সকালের দিকে আমি আর একবার আসবো–আপনি ওই বড়িগুলো যেমন বলেছি তেমনি খাইয়ে দেবেন—
বলে তিনি রাস্তায় গিয়ে গাড়িতে উঠে চলে গেলেন।
