নয়নতারা বললে–না, লক্ষ্মীটি, তুমি আমার ওপর রাগ কোর না। ওকে তুমি চেনো না বলেই এত রাগ হচ্ছে তোমার, ওকে যদি তুমি চিনতে তাহলে বুঝতে পারতে ওর ওপর রাগ করা অন্যায়, বরং ওর ওপর দয়াই হওয়া উচিত সকলের–
নিখিলেশ বললে–আশ্চর্য, আজ তুমি কিনা ওর হয়ে সাফাই গাইছো, অথচ ওর জন্যেই তো আজ তোমার যত কষ্ট, যত যন্ত্রণা। মনে নেই, একদিন ওরা তোমাকে কী অপমানটাই না করেছিল, তোমার শ্বশুরবাড়ির সেই সব অত্যাচারের কথা এত শিগগির তুমি ভুলে গেলে? এত ভুলো মন তোমার? যে কদিন তুমি ওদের বাড়ি ছিলে একদিনের জন্যেও কি তুমি শান্তি পেয়েছিলে? তোমার সেই কান্নাকাটির কথা কি আমি ভুলে গেছি মনে করো?
নয়নতারা বললে–তুমি যা বলছো সব সত্যি কথা, কিন্তু তার জন্যে ওর কিছু দোষ নেই, ও কী করবে? এই দেখ না, এখনও এই অবস্থায়ও ‘কালীগঞ্জের বউ’ ‘কালীগঞ্জের বউ’ বলে প্রলাপ বকছে! কালীগঞ্জের বউকে আমার বৌভাতের দিন ওর ঠাকুর্দাদা খুন করেছিল তা এখনও ও ভুলতে পারছেন না–
–তা ওর ঠাকুর্দাদা দোষ করেছিল বলে তার শাস্তি পাবে তুমি? কোনও ভদ্রলোক নিজের বউ-এর সঙ্গে এরকম ব্যবহার করে? এরকম ঘটনা কেউ কখনও শুনেছে? তুমি আবার সেই লোককে সাপোর্ট করছো?
নয়নতারা বললে–না, তুমি দেখছি সত্যিই আমার ওপর রাগ করেছ, নইলে সব জেনেও কেন ওকে তুমি গালাগালি দিচ্ছ?
–তা গালাগালি দেব না? আমি যদি সেদিন নবাবগঞ্জে থাকতুম তো আমি ওকে চাবুক মারতুম তা জানো?
–ছিঃ, কী বলছো তুমি? পাশেই ও রয়েছে, যদি শুনতে পায়? তোমার কি রাগ হলে আর জ্ঞান থাকে না? ওর ব্যবহারের জন্যে কি ও দায়ী?
–তা ও দায়ী না তো কে দায়ী?
–দায়ী ওর বাবা, ওর ঠাকুর্দাদা। দায়ী ওর পূর্বপুরুষ!
–তা ওর পূর্বপুরুষের জন্যে তুমি শাস্তি পাবে এ কোন্ শাস্ত্রে লেখা আছে? এ কোন্ দেশের বিচার?
নয়নতারা বললে–তুমি চুপ করো বাপু, বড্ড চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কথা বলছো তুমি। তুমি সব জেনে শুনেও এসব কথা কেন বলছো? ও তো আমাকে সব খুলেই বলেছিল। তার পরেও কি আমি ওকে দোষ দিতে পারি?
–তাহলে তুমি তোমার শ্বশুরবাড়ি থাকলেই পারতে। সেখান থেকে কেন চলে আসতে গেলে?
নয়নতারা বললে–নাঃ, তুমি দেখছি আজকে আমার সঙ্গে ঝগড়া না করে আর ছাড়বে না।
নিখিলেশ বললে–তুমি আমার ঝগড়া করাটাই শুধু দেখলে, আর আমি যে তোমাকে প্রাইভেটে ম্যাট্রিক পাস করিয়ে চাকরি করে দিলুম, সেটা তো একবারও দেখলে না। তখন তো আমাকে বলেছিলে তুমি তোমার শ্বশুরবাড়ির লোকের নামও কখনও মুখে আনবে না–
নয়নতারা বললে–ঠিক আছে, কথা থাক, আমি চা করে দিচ্ছি, চা খাও, আমিও চা খাবো, চা খেলে তোমার রাগ কমবে।
নিখিলেশ বললে–না, তুমি চা খাও, আমি খাবো না, আমি বেরোব—
নিখিলেশ বেরোতে যাচ্ছিল, কিন্তু নয়নতারা পথ আটকে সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।
বললে–চা না খেয়ে তুমি যেতে পারবে না, অফিসে তো এই সময়ে একবার চা খাও তুমি, আমি গিরিকে বলছি চা করতে
কথাটা বলে নয়নতারা চলে যাচ্ছিল কিন্তু নিখিলেশ বললে–-শোন, একটা কথা শুনে যাও–
–কী?
–ওকে আর কতদিন এখানে রাখবে?
নয়নতারা কথাটা শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেল। বললে–তার মানে তুমি কি চাও এই অসুস্থ মানুষটাকে এই অবস্থায় বাড়ি থেকে বার করে দিই?
নিখিলেশ বললে–আমি কি তাই বলেছি? তুমি আমার কথার উলটো মানে করছো কেন? আজ তো ওর জন্যে অফিস কামাই করলে, এখন থেকে কি রোজই অফিস কামাই করবে?
নয়নতারা বললে–অফিস কামাই না করলে বাড়িতে কে ওকে দেখবে? গিরিবালা? গিরিবালার ওপর ওর ভার ছেড়ে দিয়ে চলে যাবো? শেষকালে যদি একটা কিছু হয় তখন ওই একলা বুড়ো মানুষ সামলাতে পারবে?
–তার চেয়ে হাসপাতালে পাঠালে হতো না! হাসপাতালে পাঠালে ক্ষতিটা কী? সেখানে ডাক্তার আছে, নার্স আছে, দেখাশোনা করবার লোকের অভাব নেই, তাই পাঠাও না–আর তাছাড়া, খরচের কথাটাও তো ভাবতে হয়, বাড়িতে ডাক্তার ডাকতেও তো টাকা লাগে, এখন মাসের শেষের দিকে…
নয়নতারা নিখিলেশের মুখের দিকে ভালো করে তাকালো। যে মানুষটা তার বিপদের দিনে তাকে বাঁচিয়েছে, তাকে নিজের পকেটের পয়সা খরচ করে প্রাইভেটে লেখাপড়া শিখিয়ে একটা ছোটখাটো চাকরিও যোগাড় করে দিয়েছে, তার মনও কি আজকে এমন একটা তুচ্ছ ঘটনায় ঈর্ষাকাতর হয়ে উঠলো নাকি!
নিখিলেশ আবার বললে–কথাটা যা বলেছি অন্যায় বলিনি, তুমি বরং একটু ভালো করে ভেবে দেখ–এখন কতদিনে ভদ্রলোক ভালো হয়ে উঠবেন তার তো ঠিক নেই, আর ভালো হবেন কিনা তারও ঠিক নেই–
নয়নতারা যেন ককিয়ে উঠলো। বললে–ওগো, ওকথা বোল না তুমি, বরং বলো তাড়াতাড়ি ও ভালো হয়ে উঠুক–
–ভালো হয়ে উঠুক সে তো আমিও চাই, আমি কি চাই যে ভালো না হোক? কিন্তু তোমার কথা ভেবেই আমি কথাটা বলছি, তোমার অফিসের কথা ভেবেই বলছি। রোজ রোজ কামাই করা তো তোমার চলবে না, এখন যদি ভদ্রলোকের অনেকদিন লাগে সেরে উঠতে তখন কী করবে? ততদিন অফিস কামাই কররে?
নয়নতারা বললে–আমার তো ছুটি পাওনা আছে–ছুটি নিলে তো আর মাইনে কাটা যাবে না, না-হয় যতদিন ছুটি পাওনা আছে ততদিন ছুটি নেব–
–কিন্তু তারপর? তারপর যখন ছুটি পাওনা থাকবে না?
নয়নতারা বললে–ততদিন কি আর ও শুয়ে পড়ে থাকবে? দেখো তার আগেই ভালো হয়ে যাবে, ভালো হয়ে গেলেই আমি ওকে বাড়ি পাঠিয়ে দেব–আর তা ছাড়া জ্ঞান হলে নিজেই আর এখানে থাকতে চাইবে না, ওকে তুমি চেনো না। আমাকে দেখলেই ও এড়িয়ে যেতে চাইবে
