নয়নতারা বললে–না, কথা শোন, আমার কথা শুনতে হয়, ভালো না হলে তুমি বাড়ি যাবে কী করে?
–আমি বাড়ি যাবো না, আমি এখানে থাকবো—
নয়নতারা বললে–ছিঃ, এখানে থাকতে নেই। তুমি শিগগির ভালো হয়ে ওঠো, উঠে তোমার বাড়ি চলে যাও, জল খাও–
হঠাৎ পেছনে কী একটা ছায়ার আভাস পেছন ফিরে চাইতেই নয়নতারা দেখলে নিখিলেশ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে–
নিখিলেশকে দেখেই নয়নতারা অবাক হয়ে গেছে। মাথায় ঘোমটা টেনে দিয়ে বললে– তুমি? তুমি এ সময়ে? তোমার অফিস নেই?
নিখিলেশ এ-কথার উত্তর দিলে না। আস্তে আস্তে আবার বাড়ির ভেতরে অদৃশ্য হয়ে গেল। নয়নতারা হাতের গেলাসটা রেখে পাশের ঘরে ঢুকতেই দেখলে নিখিলেশ বিছানার ওপর চুপ করে বসে আছে।
নয়নতারা আবার সেই আগেকার প্রশ্নটাই করলে–কী হলো? তোমার অফিস ছুটি হয়ে গেল নাকি?
নিখিলেশ শুধু বললে—না–
নয়নতারা বললে–তবে? তবে কি তোমার শরীর খারাপ হলো নাকি? দেখি, কপাল দেখি–
বলে কাছে এগিয়ে গিয়ে নিখিলেশের কপালে হাত দিতে গেল। নিখিলেশ নয়নতারার হাতটা নিজের হাত দিয়ে সরিয়ে দিলে। বললে–না, আমার কিছু হয়নি।
নয়নতারা নিশ্চিন্ত হয়ে বললে–হয়নি ভালোই হলো। আমি তো ভয় পেয়ে গিয়েছিলুম। তুমি তো কখনও এমন করে ছুটি নাও না–তা এদিকে কী কাণ্ড হয়ে গেছে জানো। আমি এদিকে মহামুশকিলে পড়ে গিয়েছি। ও-ঘরে কে, চিনতে পারলে? কথা বলছো না যে? চিনতে পেরেছ, না চিনতে পারো নি?
নিখিলেশ মাথা নাড়লে। বললে–চিনেছি–
–চিনতে পেরেছ? তাহলে বলো তো এখানে ও কী করে এল? বলো না, কী করে এল ও এখানে?
নিখিলেশ কোনও উত্তর দিলে না। যেমন চুপ করে ছিল তেমনি চুপ করেই রইল।
নয়নতারা বললে–আমি ন’টা চল্লিশের ট্রেন ধরতে স্টেশনে গেছি, দেখি ট্রেনটা তখন এসে গেছে। তাড়াতাড়ি পৌঁছে দেখি প্লাটফরমের ওপর ভীষণ ভিড়। আমি উঁকি মেরে দেখি ও। একেবারে অজ্ঞান অচৈতন্য অবস্থা, স্টেশন মাস্টার তো ওকে হাসপাতালে পাঠিয়ে দিচ্ছিল, আমিই বলে কয়ে বাড়িতে নিয়ে এলুম ওকে–
নিখিলেশ এতক্ষণে কথা বললে। বললে–তা হাসপাতালে পাঠাচ্ছিল ওরা তাতে কী দোষ হচ্ছিল? হাসপাতালের চেয়ে কি বাড়িতে ভালো সেবা হবে?
নয়নতারা বললে–না, ভাবলুম হাসপাতালে তো ওর নিজের কেউ নেই, তাই…
নিখিলেশ বললে–কিন্তু তার জন্যে আজকে তোমার অফিসটা কামাই হলো তো?
–বা রে, আমার তো ছুটি পাওনা আছে।
–ছুটি পাওনা হলেই বা, কত কষ্টে আমি তোমার চাকরিটা যোগাড় করে দিয়েছি, বি-এ পাস করেও কত মেয়ে চাকরির জন্যে ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে আর তুমি এই রকম খবর না দিয়ে আজ অকারণ অফিস কামাই করলে, এটা কি ভালো হলো?
নয়নতারা বললে–তুমি এটাকে অকারণ বলছো?
–তা অকারণ নয় তো কী? রাস্তায়-ঘাটে এরকম কত লোকের অ্যাসিডেন্ট হচ্ছে, তুমি তাদের সকলকে বাড়িতে তুলে এনে সেবা করতে পারবে? সকলকে সেবা করে বাঁচিয়ে তুলতে পারবে?
নয়নতারা কথাটা শুনে মনে যেন একটু কষ্ট পেলো। বললে–সকলের সঙ্গে তুমি ওর তুলনা করলে? সকলে আর ও কি এক হলো? চোখের সামনে ওকে ওই অবস্থায় দেখলুম আর তারপর কী করে চুপ করে থাকতে পারি বলো?
নিখিলেশ বললে–ঠিক আছে, অফিস-টপিস গিয়ে তাহলে আর তোমার দরকার নেই, তুমি তাহলে ওর সেবাই করো–
বলে নিখিলেশ উঠে পড়লো। বললে–আমি যাচ্ছি—
নয়নতারা বললে–কোথায় যাচ্ছো!
নিলিখেশ বললে–একটা কাজ আছে–
–কী কাজ আবার তোমার এখন? অফিস থেকে কি তুমি ছুটি নিয়ে এলে নাকি? নিখিলেশ বললে–এখন বাজেট-তৈরির কাজ চলছে, এখন কি ছুটি পাওয়া যায়?
–তাহলে?
–টিফিনের সময় বেরিয়ে তোমার অফিসে গিয়েছিলুম তোমাকে বলতে যে আমি আজকে আটটা উনিশের ট্রেনে বাড়ি ফিরবো, তুমি অফিসে আমার জন্যে অপেক্ষা কোর না, একলাই বাড়ি চলে যেও। কিন্তু গিয়ে শুনি তুমি অফিসেই আসোনি–তাই খুব ভাবনা হলো। ভাবলুম এমন তো কখনও হয় না। মনে ভয়ও হলো হয়ত কোনও অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে অফিসে গিয়ে বললুম আমার স্ত্রীর খুব অসুখ, আমি চললুম–
নয়নতারা বললে–আমার অসুখ হয়েছে এ সন্দেহটাই বা তোমার হলো কী করে? যাবার সময় তুমি দেখে গেছ আমি দিব্যি সুস্থ আছি–হঠাৎ আমার শরীর খারাপ হতে যাবেই বা কেন?
–কিন্তু তা কি বলা যায়? আগে তো কখনও তুমি অফিস কামাই করোনি, আমি কী করে জানবো যে বাড়িতে এই কাণ্ড বেধে গেছে–মিছিমিছি আমার অফিসে হাফ-ডে কামাই হলো আজ। অথচ এখন বাজেট-তৈরি চলছে–
–তা এখন কোথায় চললে তুমি?
নিখিলেশ বললে–দেখি কোথায় যাই, কোনও রকমে সময়টা কাটাতে হবে তো–
নয়নতারা বলে উঠলো–তা আজ যে হঠাৎ সময় কাটাবার জন্যে তোমাকে বাইরে যেতে হচ্ছে? এতদিন তো বাড়িতেই তোমার সময় কাটতো ভালো করে–
–সে তখন কাটতো তোমার সময় ছিল বলে। আজকে তো তোমার নিজেরই সময় নেই। আজ তো ও-ঘরে রোগী নিয়ে ব্যস্ত থাকবে! তোমার যে অনেক কাজ!
–তুমি আমাকে অত খোঁটা দিয়ে কথা বলছো কেন?
নিখিলেশ বললে–খোটা? খোঁটা তোমায় কখন দিলুম? আমি তো সত্যি কথাই বলেছি, তোমার কাজ নেই?
নয়নতারা বললে–হাজার কাজ থাকলেও তোমার সঙ্গে কথা বলবার সময়ও আমার আছে। ওকে এ বাড়িতে এনেছি বলে তুমি রাগ করছো কেন? একটা লোক বেঘোরে মারা যাক এইটেই কি তুমি চাও?
–আমি কি তাই বলেছি–আমাকে কি তুমি অত নীচ ভাবো?
