ওদিকে ধর্মশালার পাঁড়েজী দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রোজ রাস্তার দিকে বসে থাকে– কই, বাবুজী তো আসছে না। কত লোক আসত ধর্মশালায়, কত লোক আবার চলেও যেত। কলকাতা শহরে মানুষের আনাগোনার বিরাম নেই। বিরাট জনস্রোতের সঙ্গে কর্মস্রোত জড়িয়ে একাকার হয়ে গিয়েছিল বড়বাজারে।
মহেশ আসতো। জিজ্ঞেস করতো–আমার দাদবাবু আসেনি পাঁড়েজী?
পাঁড়েজী বলতো—নেই—
মহেশ বলতো–দাদাবাবুর এত দেরি হচ্ছে কেন আসতে?
শুধু মহেশ নয়, কালীগঞ্জের বউও আসতো। কোন্ বিরাট এক প্রাসাদের পেছনকার খাটাল থেকে বুড়ো মানুষ সদানন্দের দেওয়া আলোয়ানটা গায়ে জড়িয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে এসে হাজির হতো ধর্মশালার সামনে। পাঁড়েজীকে জিজ্ঞেস করতো–আমার খোকা এসেছে দারোয়ান বাবা?
পাঁড়েজী চাপাটি সেঁকতে সেঁকতে বলতো–না বুড়ি মাঈ, বাবুজী আসেনি–
মহেশও ফিরে চলে যেত, কালীগঞ্জের বউও আবার খোঁড়াতে খোঁড়াতে যেমন করে এসেছিল তেমনি করে খাটালে ফিরে যেত।
কিন্তু তাদের কেউই জানতো না তাদের এত সন্ধানের মানুষটা তখন নৈহাটির একটা বাড়িতে বিছানার ওপর সমস্ত চেতন-অচেতনের অতীত হয়ে শুয়ে আছে।
পাড়ার ডাক্তারবাবু আসতো। শরীর পরীক্ষা করতো। বলতো–রোগী যেন কখনও উঠে না বসে, একেবারে চুপ করে শুয়ে থাকতে দেবেন, নড়া-চড়া একেবারে বারণ—
প্রথমে ট্রেনটা থেকে যেদিন সদানন্দকে এখানে তুলে আনা হয়েছিল সেইদিন থেকেই কোনও চৈতন্য ছিল না তার। কিন্তু সেদিন সদানন্দ প্রথম চোখ মেললে।
বললে–কালীগঞ্জের বউ, ও কালীগঞ্জের বউ–
গিরিবালা ঘর সাফ করছিল। সদানন্দর ডাক শুনে অবাক হয়ে গিয়েছিল। তাড়াতাড়ি হাতের কাজ ফেলে দৌড়ে ভেতরে চলে গেল। গিয়ে ডাকতে লাগলো,–দিদিমণি–
নয়নতারা তখন কলঘরের ভেতর থেকেই জিজ্ঞেস করলে কী রে? কী বলছিস?
গিরিবালা বললে–নতুন বাবুর জ্ঞান ফিরেছে, দিদিমণি, বিড় বিড় করে কী সব বকছেন—
নয়নতারা আর দেরি করলে না। গিরিবালাকে কাছে বসিয়ে রেখেই কলঘরে গিয়েছিল সে। ওইটুকুর মধ্যেই হঠাৎ সদানন্দর জ্ঞান ফিরে এসেছে। তাড়াতাড়ি শাড়িটা বদলে মাথার খোঁপাটা ঠিক করে একেবারে সোজা সদানন্দের ঘরে এল। এসে দেখল সদানন্দর চোখ দুটো খোলা। কিন্তু দৃষ্টিটা বিহ্বল। মুখে যেন কী বলছে বিড়-বিড় করে।
নয়নতারা একেবারে সদানন্দর মুখের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। যদি তাকে চিনতে পারে। কিন্তু তাতেও সদানন্দর চোখের দৃষ্টির কোনও তারতম্য হলো না।
নয়নতারা তখন সদানন্দর মুখের কাছে মুখ নিয়ে গেল।
জিজ্ঞেস করলে–আমায় তুমি কিছু বলছো?
সদানন্দ তেমনি বিহ্বল দৃষ্টি দিয়ে বিড়বিড় করে বললে–আমি প্রায়শ্চিত্ত করবো কালীগঞ্জের বউ, তুমি কিছু ভেবো না–
নয়নতারা কী বলবে বুঝতে পারলে না। আশ্চর্য, ও হয়ত নয়নতারাকে চিনতেও পারছে না। চিনতে পারলে হয়ত ঠিক আগেকার মত বিছানা থেকে ওঠবার চেষ্টা করতো, উঠে ঘর থেকে পালিয়ে যাবার চেষ্টাও হয়ত করতো।
নয়নতারা বললে–তুমি ওসব কথা ভুলে যাও, তুমি ওসব কথা আর ভেবো না।
সদানন্দ বলে উঠলো–কেন তাহলে ওরা আমাকে ঠকালে?
নয়নতারা এবার তার মুখটা সদানন্দর কানের কাছে নিয়ে এসে বললে–ওগো তুমি ওসব কথা ভুলে যাও, এই দেখ আমি, আমাকে চিনতে পারো? আমি নয়নতারা–
সদানন্দ এবার নয়নতারার দিকে চাইলে। তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগলো। নয়নতারা শাড়ির আঁচলটা দিয়ে সদানন্দর চোখ দুটো মুছিয়ে দিলে।
বললে–ছিঃ, কেঁদো না, কাঁদতে নেই।
সদানন্দ বললে–কিন্তু ওরা আমাকে ঠকালে কেন? আমি তো বলেছিলুম তোমাকে টাকা দিলে আমি বিয়ে করবো না, তবু কেন ওরা ঠকালে আমাকে? তবু কেন ওরা তোমাকে খুন করলে?
নয়নতারা আবার বললে–তুমি ঘুমোও, তুমি একটু ঘুমোতে চেষ্টা করো, বুঝলে? ঘুমোও, চোখ বোজ–
সদানন্দ বললে–তুমি তো কোনও দোষ করোনি, তাহলে কেন ওরা তোমাকে এত বড় শাস্তি দিলে? ওরা কপিল পায়রাপোড়াকে মেরেছে আমি কিছু বলিনি, মানিক ঘোষের সর্বনাশ করেছে তবু কিছু বলিনি, ফটিক প্রামাণিককে পাগল করেছে, তখনও তো আমি কোনও কথা বলিনি, কিন্তু তোমার টাকা কেন ঠকিয়ে নিলে ওরা? কেন তোমাকে ওরা খুন করলে? তোমাকে খুন করবে জানলে আমি তো বিয়ে করতুম না–
তারপর একটু থেমে বললে–আমাকে একটু জল দেবে? তোমার কথা ভাবলেই কেবল আমার জলতেষ্টা পায়, আমার গলা শুকিয়ে যায়–
নয়নতারা বললে–তুমি জল খাবে? দাঁড়াও, আমি তোমাকে জল এনে দিচ্ছি—
বলে কুঁজো থেকে জল এনে গেলাস মুখের কাছে নিয়ে গেল। বললে–মুখটা হাঁ করো, আমি জল দিচ্ছি–হাঁ করো–
–না, জল খাবো না। খাবো না জল—
নয়নতারা বললে–তবে যে বললে–তোমার জলতেষ্টা পাচ্ছে, তোমার গলা শুকিয়ে যাচ্ছে?
সদানন্দ বললে–হোক কষ্ট, আমার তেষ্টা পাক, তবু আমি জল খাবো না–
–কিন্তু জলতেষ্টা পেলে জল খাবে না কেন?
–ওগো আমার আর কতটুকু কষ্ট? কপিল পায়রাপোড়ার গলায় দড়ি দিয়ে মরতে বুঝি কষ্ট হয়নি? মানিক ঘোষ, ফটিক প্রামাণিকের কষ্টর কাছে আমার কষ্ট কতটুকু? আমার এ কষ্ট হওয়াই ভালো–হোক আমার কষ্ট–
–না না তুমি জল খেয়ে নাও–লক্ষ্মীটি খাও—
বলে নয়নতারা সদানন্দর চিবুকটা বাঁ হাতটা দিয়ে ধরলে। বললে–খাও জল, তোমার অসুখ ভালো হয়ে যাবে–
সদানন্দ মাথা নাড়তে লাগলো–আমি ভালো হবো না, আমি ভালো হতে চাই না–
