–তা তাকে একটু ধরে রাখতে পারলেন না আপনি? আপনি জানেন আমি তার জন্যে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি, কলকাতায় গিয়ে পুলিসকে হাজার হাজার টাকা ঘুষ দিয়ে ধরবার চেষ্টা করছি, আর আপনি কিনা তাকে হাতের নাগালে পেয়ে ছেড়ে দিলেন? আর একটু আটকে রাখতে পারলেন না?
বেহারি পাল বললে–আরে তোমার ভাগ্নেকে আটকে রাখে, তেমনি সাধ্যি আছে কারো? তোমার জামাইবাবুর কাছে তো সদা গিয়েছিল, তা চৌধুরী মশাই তো তাড়িয়ে দিয়েছিলেন তাকে–
তা তাড়িয়ে দেবে না? তাড়িয়ে দেওয়া কি অন্যায় হয়েছে? আপনিই বলুন না! ওই ছেলের জন্যেই তো আজ জামাইবাবুর এই হাল। নইলে যে বাড়িতে এককালে লোক গম্ গম করতো সেই বাড়ি এখন শ্মশান হয়ে যায় এমন করে? ওই বাড়িতেই তো এককালে আপনারা গাঁ-সুষ্ঠু লোক পাত পেতে খেয়ে এসেছেন, সে-সব কি কারো মনে নেই? তাই যে-ছেলের জন্যে এত কাণ্ড হলো, যে-ছেলের জন্যে দিদি মারা গেল, যে-ছেলের জন্যে বউমা জামাইবাবুর নামে এত কেলেঙ্কারি কথা রটালে সেই ছেলের মুখদর্শন কেউ করে? কতখানি কষ্ট হলে বাপ হয়ে মানুষ ছেলেকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয় তা আপনারা বুঝতে পারলেন না?
পাল মশাই বললে–তা হাজার হলেও ছেলে বলে কথা, নিজের ছেলেকে অমন করে কেউ তাড়িয়ে দেয়? জানো, যখন বললুম যে বউমা চলে যাবার সময় মাথার সিঁদুর, হাতের শাখা ভেঙে ফেললে, তখন আর দাঁড়ালো না, তখন আর কিছুতেই থাকতে চাইলে না। সদানন্দ, তখন সোজা বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল
–তা ও-সব কথা আপনারা বলতে গেলেনই বা কেন?
–বলবো না? আমরা নিজের চোখে যা দেখেছি তা বলবো না? বউমার সঙ্গে কি তোমরা কেউ ভালো ব্যবহার করেছিলে?
এ কথার আর কোনও উত্তর না দিয়ে প্রকাশ আবার বাড়ি ফিরে এল। দেখলে ততক্ষণের মধ্যে চৌধুরী মশাই চলে যাবার জন্যে তৈরি হয়ে নিয়েছেন।
প্রকাশকে দেখেই জিজ্ঞেস করলেন–কী হলো, সে আছে?
–আজ্ঞে না জামাইবাবু, নেই, চলে গেছে–
–ভালোই হয়েছে, চলো সা’ মশাই-এর আসবার কথা আছে, চাবি দিতে হবে তাকে। চাবিগুলো তার হাতে দিতে পারলে তবে নিশ্চিন্ত হতে পারবো–
দোতলার ঘরে চাবি-তালা দেওয়া হলো। একেবারে চিরকালের মত দেশ ছেড়ে বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়া। দুজনেই নিচেয় নামলেন। সঙ্গে নিয়ে যাবার মত কিছুই নেই। যা দু একটা খাট-বিছানা আলমারি বাসনপত্র ছিল তা আগেই নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। বাকি যা পড়ে রইল তা পড়েই থাক। ওসব বোঝা। ওসব সুলতানপুরে অনেক আছে। আর কার জন্যেই বা নেওয়া। তিনি নিজেই বা কদিন বাঁচবেন? তিনি মারা যাওয়ার পর ওসব তো সাত ভূতে লুটে-পাটে খাবে।
তবু দেখতে ইচ্ছে হলো একবার। একতলায় নামলেন। পেছন-পেছন প্রকাশও আসতে লাগলো। মেঝের ওপর ধূলোর সর পড়েছে মোটা হয়ে। চলার পর স্পষ্ট পায়ের ছাপ পড়ছে। অন্দরমহলের দরজাটা খুলতেই কেমন একটা ভ্যাপসা গন্ধ নাকে এসে লাগলো। বহুদিনের চেনা জায়গা। বহু স্মৃতির জন্মভূমি। ওইখানে তিনি খেতে বসতেন, ওইটে তাঁর শোবার ঘর। আর ওই যে কোণের দিকের ঘরটা, ওইটে ছিল আঁতুড় ঘর। এইখানে জন্মেছিল সদানন্দ। গৌরী এসে প্রথম খবর দিয়েছিল যে কর্তাবাবুর নাতি হয়েছে।
কর্তাবাবু তখন রানাঘাটে। খবরটা শুনে প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেননি। বলেছিলেন কী বললে? ছেলে? ছেলে হয়েছে?
কৈলাস গোমস্তা বলেছিল–আজ্ঞে হ্যাঁ কর্তাবাবু–
সমস্ত বাড়িময় সেদিন কী আনন্দ! কর্তাবাবুর নাতি হয়েছে, নাতি হয়েছে। তোমরা শাঁখ বাজাও, উলু দাও, আনন্দ করো। যে যেখানে আছে তাকে খবর দাও, গাঁ-সুদ্ধ লোককে ডাকো, তারা এসে দেখে যাক। দেখে যাক চৌধুরী বংশের ছেলে হয়েছে, চৌধুরী বংশের উত্তরাধিকারী জন্মেছে। বাজাও, শাঁখ বাজাও।
–কে?
চৌধুরী মশাই চমকে উঠেছেন। তাঁর মনে হলো যেন সত্যিই কে উলু দিলো, কে যেন শাঁখ বাজালো। সমস্ত বাড়িটা যেন আনন্দে একেবারে গম্-গম্ করে উঠলো।
কিন্তু না, প্রকাশ পেছনেই ছিল। সে ভুল ভাঙিয়ে দিলে। বললে–জামাইবাবু, সা’ মশাই এসেছেন–
এসেছে! চৌধুরী মশাই পেছনে ফিরে দেখলেন প্রাণকৃষ্ণ সা’ মশাই দাঁড়িয়ে আছে।
বললেন–এসে গেছে? ভালোই হয়েছে, আমি ভাবছিলুম আপনার কথা–
–আপনি আজই চলে যাচ্ছেন নাকি?
–হ্যাঁ চলি, এই নিন আপনার চাবি
সা’ মশাই চাবিটা হাতে নিয়ে বললে–তা এত তাড়াতাড়ি যাবার কী দরকার ছিল, আর দুটো দিন থাকলেই পারতেন, এ আপনার নিজের দেশ, নিজের বাড়ি, আমি তো আর এত শিগগির এখানে আসছি না–
–না, আর এখানে থাকা যায় না। চৌধুরী মশাই বললেন–এখানে থাকলে সুলতানপুরের জমি-জমা আবার কে দেখবে? সেখানেও তো আমার শ্বশুরমশাই-এর জমি জমা রয়েছে, সে-সব দেখবার লোকও তো নেই–
বলে প্রকাশের দিকে চেয়ে বললেন–এসো প্রকাশ–
প্রকাশও চলতে লাগলো পেছন পেছন। একদিন বড় আশা করে নরনারায়ণ চৌধুরী যে বংশের যে-সংসারের পত্তন করেছিলেন চৌধুরী মশাই-এর চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা নিঃশেষে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। বোধহয় শেষ পর্যন্ত কালীগঞ্জের বউ-এর অভিশাপই ফললো। কে জানে!
.
নবাবগঞ্জের চৌধুরী বাড়ির সূতিকাগৃহে একদিন যে অসহায় শিশুটি ভূমিষ্ঠ হবার সঙ্গে সঙ্গে উলুধ্বনি উঠেছিল, শাঁখ বেজেছিল, সেদিন সেই নৈহাটি শহরের একটা গলির ভেতরের বাড়িতে সেই শিশুটিই তখন আবার তেমনি করেই অসহায় হয়ে একটা বিছানার ওপর শুয়ে ছিল। কিন্তু তখন আর তার জন্যে কেউ শাঁখও বাজাচ্ছে না, উলুধ্বনিও দিচ্ছে না।
