একটু পরেই প্রকাশ এসে হাজির হলো। এই প্রকাশ, সেই যে একদিন চৌধুরী মশাইএর পিছু নিয়েছে সে বুঝি আর তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত তাঁকে ছাড়বে না। হয়ত একেবারে তাঁকে নিঃশেষ করে তবেই তাঁকে রেহাই দেবে।
চৌধুরী মশাই জিজ্ঞেস করলেন–সুলতানপুরের খবর কী?
প্রকাশ বললে–খবর ভালো, অশ্বিনী ভট্টাচার্যিকে খুব কষে বকে দিয়ে এলুম,–
–অশ্বিনী ভট্টাচার্যির কথা থাক, যে কাজে তোমাকে পাঠিয়েছিলুম সেকাজের কী হলো তাই বলো?
প্রকাশ বললে–সব ঠিক আছে দেখে এলুম, বিলের জমিতে এবার পাট ধান দুটোই বুনেছে সিকদাররা।
–কিন্তু গেল সনের টাকাটা? টাকার কথা কী বললে?
–আজ্ঞে টাকা দিলে না।
–কেন? টাকা দিলে না কেন?
প্রকাশ বললে–বললে–তোমার হাতে টাকা দেব না। যে মালিক তার হাতে টাকা দেব, তুমি কে? আমাকে এই রকম আরো কত কথা শোনালে। আমি বলে এলুম –আমিও তোমাকে দেখে নেব। এবার তোমার জমি খাস করে নেব তবে ছাড়বো–
চৌধুরী মশাই কিছু বললেন না। খানিক পরে বললেন–চলো, আজই সুলতানপুরে চলে যাবো আমি, এই সকালের ট্রেনে
–সকালের ট্রেনে? তাহলে খাওয়া? দুটো ভাত চড়াবো?
চৌধুরী মশাই বললেন–আমার খাবার দরকার নেই, আমি খাবো না—
প্রকাশ অবাক হয়ে গেল। বললে–খাবেন না মানে? উপোস করে থাকবেন?
চৌধুরী মশাই বললেন–তা একবেলা না হয় উপোসই করলুম, ক্ষতি কী?
–সে কী জামাইবাবু, আপনি না-হয় বুড়ো মানুষ উপোস করে থাকতে পারবেন, কিন্তু আমি? উপোস করলে যে কষ্ট হবে আমার। আমি কী উপোস করে থাকতে পারবো?
–খুব পারবে, খুব পারবে। আমি আর থাকবো না এখানে, আমার এখানকার কাজ সব মিটে গেছে। চলো–
–তার মানে?
–তার মানে আমি এবাড়ি বিক্রি করে দিয়েছি। আজ থেকে এবাড়ি রেল বাজারের আড়তদার প্রাণকেষ্ট সা’ মশাইএর।
প্রকাশ থমকে দাঁড়ালো। যেন বিশ্বাস করতে পারলে না কথাটা। জিজ্ঞেস করলে–আর জমি-জমা ক্ষেত-খামার?
–সমস্ত।
–সমস্ত বেচে দিলেন? কত টাকায় বেচলেন?
চৌধুরী মশাই চটে গেলেন। বললেন–সে-সব কথায় তোমার দরকার কী? আমি যদি লোকসান দিয়ে বেচি তো তোমার কী বলবার আছে?
প্রকাশ বললে–না, তা নয়, মানে বেহারি পাল মশাই আমাকে বলছিলেন কী না, বলছিলেন তিনি মোটা দর দিতে পারেন।
–মোটা দর? পাল মশাইএর বুঝি খুব টাকা হয়েছে? খুব টাকার গরম দেখাচ্ছে বুঝি? তাহলে তুমি পাল মশাইকে বলে এসো প্রকাশ যে আমি বরং সব জমি-জমা সরকারের খাস করে দেব তবু পাল মশাইকে দেব না, দশ লাখ টাকা দিলেও দেব না। দশ লাখ টাকা হয়েছে পাল মশাইএর?
প্রকাশ হতভম্বের মত চাইলে চৌধুরী মশাইএর দিকে। জামাইবাবু বলে কী! দশ লাখ! সে যে অনেক টাকা!
চৌধুরী মশাই বললেন–এই তো কাল সদা এসেছিল—
সদা? সদানন্দ? কোথায়? কখন?
–হ্যাঁ, কাল এখানে বারোয়ারিতলায় ওদের যাত্রা না কবিগান হচ্ছিল। সেই সন্ধ্যেবেলা আমার কাছে এসেছিল।
–এসে কী বললে?
–কী আবার বলবে! আমি কী কিছু কথা বলতে দিয়েছি যে কথা বলবে? আমি দিয়েছি তাড়িয়ে!
প্রকাশ বললে–আপনি ঠিক দেখেছেন সদা এসেছিল? সেবার তো ওই রকম করে কালীগঞ্জের বউকেও এ বাড়িতে আসতে দেখেছিলেন। ভুল দেখেন নি তো?
চৌধুরী মশাই তখন চলে যাবার জন্যে ব্যস্ত। সারারাত ঘুম হয়নি, খাওয়া হয়নি। তারপর সদানন্দকে তাড়িয়ে দিয়েছেন, মনটাও কেমন বিগড়ে ছিল। প্রকাশের কথায় আর কান দেবার সময় ছিল না তখন।
বললেন–চলো চলো, এখন ওসব কথা থাক–
প্রকাশ বললে–থাকবে কেন ওসব কথা, সদানন্দ এলো আর আপনি তাকে তাড়িয়ে দিলেন? কোথায় গেল সে?
–কোথায় গেল তা কি আমি দেখতে গিয়েছি? দেখতে আমার বয়ে গেছে। সে কী আমার ছেলে? সে আমার শত্রু! তা কোথায় আর যাবে, তার যাবার জায়গা আছেই বা কোথায়? ওই পাল মশাইএর বাড়িতেই বোধ হয় গিয়ে উঠেছে। ওখানেই বোধ হয় খেয়েছে দেয়েছে–ওদের জন্যেই তো আজকে এই সব্বোনাশটা হলো আমার–
প্রকাশ বললে–যাই গিয়ে দেখে আসি সদা আছে কি না
চৌধুরী মশাই বললেন–তা যাও, কিন্তু খবরদার বলছি, এখানে সদাকে ডেকে আনতে পারবে না, আমি তার মুখদর্শনও করবো না আর–
–আজ্ঞে না, তাই কখনও ডাকি? তার জন্যেই তো আমাদের এই হেনস্থা, তার জন্যেই তো আমার দিদি মারা গেল, তার জন্যেই তো আপনি জমিদারি বেচে দিলেন, আমি কি ভাবছেন জানি নে কিছু? ওকে খুঁজে বার করার জন্যে আমি কতবার কলকাতায় গেলুম, পুলিসকে কত টাকা ঘুষ দিলুম, আর সে কি না এখানে এসে হাজির হয়েছে
বলে প্রকাশ দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে গেল। পেছন থেকে চৌধুরী মশাই বলে দিলেন–বেশি দেরি কোর না, এখুনি আবার রওনা দিতে হবে।
ততক্ষণে প্রকাশ একেবারে সোজা পাল মশাইএর দোকানে গিয়ে হাজির। বেহারি পাল মশাই তখন সবে মাত্র তার দোকান খুলে বসেছে। তখনও ভালো করে ধুনো-গঙ্গা জল দেওয়া হয়নি। পেছনে ডাক শুনেই মুখ ফিরিয়ে দেখে শালাবাবু। বললে–কী শালাবাবু, কী খবর? কখন এলে আবার?
প্রকাশ বললে–পাল মশাই, শুনলাম সদা নাকি চলে এসেছে, আপনার বাড়িতে আছে? সে কোথায়?
পাল মশাই–সদা? সদা তো এসেছিল কাল। সে তো কাল রাত্তিরে ছিল আমার বাড়িতে, কিন্তু এখন সে তো নেই, সে চলে গেছে
–চলে গেছে? কোথায় চলে গেল? কখন গেল?
পাল মশাই বললে–সে তো অনেকক্ষণ চলে গেছে। সে কি থাকবার ছেলে! আমি তাকে জিজ্ঞেস করলুম কোথায় যাচ্ছে তা সে কথার কোনও উত্তরই দিলে না সে!
