.
সদানন্দর জীবনে সে এক মহা সংগ্রামের সময়। সংগ্রাম সারা জীবনই সে করেছে। সে কেবল সংগ্রাম করেছে আর বারে বারে সংগ্রামকে অতিক্রম করতে গিয়ে আর একটা সংগ্রামের কেন্দ্রস্থলে পৌঁছে আত্মপরীক্ষার মুখোমুখি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর সংগ্রাম কি শুধু বাইরের সঙ্গে? বাইরের সঙ্গে যে-সংগ্রাম সে তো সহজ সংগ্রাম। কিন্তু ভেতরের সঙ্গে যে সংগ্রাম সেই সংগ্রামই কঠোর। সেই কঠোর সংগ্রামের মুখোমুখি হয়েই সে সেদিন বিহ্বল হয়ে গিয়েছিল।
সেদিন নবাবগঞ্জ থেকে বেরিয়ে যখন সে কেষ্টনগরে গিয়েছিল তখন ভেবেছিল সে শুধু একবারের জন্যে নয়নতারার সঙ্গে দেখা করবে। দেখা করে তার কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নেবে। শুধু বলবে যে তুমি আমাকে ক্ষমা করো–
ক্ষমা! মুখের ক্ষমা যে ক্ষমা নয় তা কি সদানন্দ জানতো না? ক্ষমা সকলকে করাও যায় না, আবার সকলের কাছে ক্ষমা চাওয়াও যায় না। হাজার অপরাধের পরও যে ক্ষমা চায় তার ক্ষমা চাওয়ার মধ্যে কোনও মহত্ত্ব নেই, কিন্তু তবু তারপরেও যে ক্ষমা করে তার ক্ষমা করার মধ্যে মহত্ত্ব আছে। কিন্তু সদানন্দ কি আশা করেছিল নয়নতারা তাকে ক্ষমা করবে!
৩.৫ সমস্ত বাড়িটা ফাঁকা
সেদিন চৌধুরী মশাইএর ঘুমই হয়নি সারা রাত। ভোরের দিকে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়েছিলেন। সমস্ত বাড়িটা ফাঁকা। আগে দীনু আসতো সকাল বেলা চা দিতে। চা খাবার খানিক পরে পরমেশ মৌলিক এসে পড়তো। তারপর একে একে প্রজা-পাঠক-খাতক দেন্দার এসে হাজির হতো। চণ্ডীমণ্ডপে বসে সমস্ত জমিদারি তদারকি কাজটা হয়ে যেত। কোন ক্ষেতে লাঙল পড়বে, কোন খামারের ছোলা মাড়াই হবে, কোন ফসল আড়তদারের কাছে পাঠাতে হবে তার হুকুম দিয়ে দিতেন তিনি। তারপর হয়ত ওপরে ডাক পড়তো কর্তাবাবুর ঘরে। সেখানে গিয়েও বৈষয়িক কাজ। বৈষয়িক কাজটাই ছিল তাঁর জীবন। ছোট বেলা থেকে বৈষয়িক কাজে হাত পাকিয়ে পাকিয়ে সে কাজে তাঁর নেশা লেগে গিয়েছিল।
তারপর যখন বেলা দুপুর হতো তখন দীনু ডাকতে আসত চান করবার তাগাদা দিতে। কুয়োতলায় দীনু জল তুলে দিত বড় মাটির গামলায়। দীনু তাঁকে তেল মাখিয়ে দিত। তারপর তিনি ঘটি করে মাথায় জল ঢালতে শুরু করতেন। তখন ভাত খাবার পাট। গৌরী সামনে ভাতের থালা এনে বসিয়ে দিত। তখনই যা একটু বিশ্রাম তাঁর। খেতে খেতে জিজ্ঞেস করতেন–খোকা কোথায়, খোকা? খোকা খেয়েছে?
প্রীতি বলতো–সে কি আর বাড়িতে আছে? সে তো রানাঘাটে গেছে—
চৌধুরী মশাই বলতেন রানাঘাটে? রানাঘাটে গেছে কেন? কার সঙ্গে গেছে?
প্রীতি বলতে–প্রকাশের সঙ্গে গেছে, রামনবমীর মেলা দেখতে–
প্রকাশের সঙ্গে সদানন্দ রানাঘাটে রামনবমীর মেলা দেখতে যায় এটা চাইতেন না চৌধুরী মশাই। কিন্তু তাঁর কথা আর কে শুনবে! শুধু বলতেন–কখন আসবে?
প্রীতি বলতে–প্রকাশের সঙ্গে যখন গেছে তখন তুমি ভাবনা করছো কেন, সে তো আর জলে পড়ে নেই–
আর তখন থেকেই চৌধুরী মশাই জানতেন জিনিসটা ভালো হচ্ছে না। কিন্তু উপায় নেই। ছেলের ওপরে তাঁর যতখানি অধিকার আছে তার স্ত্রীরও ঠিক ততখানি। স্ত্রী যদি চায় যে ছেলে ওই সবই করুক তবে তাই হোক। কাছারির কাজ-কর্ম শিখে দরকার নেই। সংসার জ্বলে-পুড়ে খাক হয়ে যাক। তিনি যতদিন আছেন ততদিনই সংসার আছে, তারপর তিনি যখন থাকবেন না তখন যা হবে, তা তো আর তিনি দেখতে আসছেন না। এই সব ভাবতে ভাবতেই তিনি খাওয়া ছেড়ে উঠে পড়তেন।
প্রীতি বলতেন–ওমা উঠে পড়লে যে, দুধ খেলে না?
সে-সব দিন কোথায় গেল! তিনি ভেবেছিলেন একরকম আর হলো আর একরকম। সেই ছেলেই বা কোথায় গেল আর সেই স্ত্রীই বা কোথায় চলে গেল! তারাই তাঁর আগে চলে গেল। এই যে তিনি সকাল থেকে চা-ও পেলেন না এক বাটি, কেউ দেখবারও নেই আজ। কাল রেলবাজারের আড়তদার সা’ মশাই জলের দরে সমস্ত কিছু কিনে নিয়েছে। সদরে গিয়ে দলিল রেজিস্ট্রি হয়ে গিয়েছে। বুদ্ধি করে প্রকাশকে ভাগলপুরে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন তাই রক্ষে, নইলে সে বড় গণ্ডগোল করতো। আজ যে এবাড়িতে তিনি এখনও বাস করছেন এটা তাঁর বে-আইনী কাজ। সা’ মশাই অবশ্য কিছু বলবে না। আরো কিছু দিন তিনি এখানে থাকতে পারেন, কিন্তু এ এখন সা’ মশাইএর বাড়ি। আইনত এখানে থাকবার অধিকারও তাঁর নেই আর।
বারোয়ারিতলায় বোধ হয় সমস্ত রাতই কবিগান হয়েছে। তাই সকাল বেলার দিকে সব ঠাণ্ডা। চৌধুরী মশাই বিছানা ছেড়ে বাইরের বারান্দার দিকে এলেন। দুদিন আগের স্বপ্নটার কথা মনে পড়লো। আশ্চর্য, হঠাৎ জেগে জেগে অমন স্বপ্নটাই বা দেখতে গেলেন কেন? কালীগঞ্জের বউ এখানে আসতে যাবেই বা কেন, আর কী করেই বা আসবে? যে-মানুষ মারা গেছে সে-মানুষ কখনও বেঁচে উঠতে পারে! বংশী ঢালী তো তাকে চিরকালের মত শেষ করে দিয়েছে। তার সঙ্গের পালকি-বেহারাদের পর্যন্ত তো রেহাই দেয়নি সে। তবে? তবে কেন তিনি ভয় পেয়েছিলেন অমন করে? কেন তিনি অমন করে ভয় পেয়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন?
কালীগঞ্জের বউএর সেই কথাগুলো তাঁর কানে বাজতে লাগলো। কালীগঞ্জের বউ ওই উঠোনে দাঁড়িয়ে একদিন বলে গিয়েছিল–আমি এই শাপ দিয়ে গেলাম নায়েব মশাই, আমি যদি বামুনের মেয়ে হই তো একদিন আমার শাপ ফলবেই, দেখবে তুমি ঠিক নির্বংশ হবে—
ফাঁকা উঠোনটার দিকে চেয়ে চৌধুরী মশাই-এর একটা কথা মনে পড়লো। সত্যিই, কালীগঞ্জের বউ-এর সেদিনকার সেই অভিশাপ কি এমন করেই বর্ণে বর্ণে ফলতে হয়। এমন করে কর্তাবাবুর এমন সাধের সংসার নির্বংশ হতে হয়। সেদিন কি তিনিই ভাবতে পেরেছিলেন সেই বুড়ির কথাই একদিন নিষ্ঠুর ভাবে সত্যি হবে!
