রাস্তা দিয়ে একজন যাচ্ছিল। সদানন্দ তাকেই ডাকলে। বললে–এইটেই তো কালীকান্ত ভট্টাচার্যের বাড়ি না? এখানকার কলেজের মাষ্টার মশাই?
ভদ্রলোক বললেন, কিন্তু তিনি তো নেই–
–নেই?
–না, তিনি তো বছর দুয়েক হলো মারা গেছেন। আপনি কোত্থেকে আসছেন?
–মারা গেছেন?
সদানন্দ কিছুক্ষণ স্তম্ভিতের মতন সেখানে দাঁড়িয়ে রইল। তাহলে? তাহলে নয়নতারা কোথায় আশ্রয় পেলে? নবাবগঞ্জ থেকে হাতের শাঁখা ভেঙে সিঁথির সিঁদুর মুছে চলে এসে কোথায় গিয়ে উঠলো? তাহলে কাকে আশ্রয় করে সে বাঁচবে? আশ্চর্য, সদানন্দ নিজের মনেই হেসে উঠলো। নয়নতারার জন্যে সে নিজেই তো দায়ী, অথচ সেই কিনা তার দুর্ভাগ্য নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে!
তবু সদানন্দ স্থির থাকতে পারলে না। ভদ্রলোক তখন অনেক দূরে চলে গেছে। সদানন্দ তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে ভদ্রলোকের কাছে এগিয়ে গেল। বললে–আচ্ছা কালীকান্ত ভট্টাচার্যের এক মেয়ে ছিল, তার কি হয়েছে বলতে পারেন?
ভদ্রলোক বললেন–সে মেয়ের তো নবাবগঞ্জে না কোথায় বিয়ে হয়েছিল, বোধহয় তার শ্বশুরবাড়িতেই আছে। সে মেয়ে এখানে নেই–
সদানন্দ বুঝলো ভদ্রলোক বেশি কিছু জানেন না! তাঁকে আর বেশি কিছু জিজ্ঞেস করা বৃথা। ভদ্রলোক যেদিকে যাচ্ছিলেন সেইদিকেই আবার চলতে লাগলেন। সদানন্দ তাঁকে আর কিছু জিজ্ঞেস করলে না।
তারপর আস্তে আস্তে আবার স্টেশনের দিকে চলে এল। তার প্রতিশোধ নেবার প্রচেষ্টার যে এই পরিণতি হবে তা কে জানতো! অথচ কী-ই বা সে করতে পারে! নয়নতারার সঙ্গে দেখা হয়নি ভালোই হয়েছে। দেখা হলে কী-ই বা সে বলতো! বড় জোর বলতো–আমায় তুমি ক্ষমা কোর—
যেন কাউকে ক্ষমা করতে বললেই কেউ ক্ষমা করে! যেন ক্ষমা করার ক্ষমতাই সকলের আছে! যেন ক্ষমা করার মত অপরাধ সদানন্দ করেছে!
তারপর কলকাতার ট্রেনটাতে উঠে এক কোণে নিজের আশ্রয় করে নিলে সে। আসবার সময় পাঁড়েজীকে বলে এসেছিল দু একদিনের মধ্যে সে ফিরবে। অথচ তার আগেই যে তাকে কলকাতায় ফিরতে হবে তা কি সে তখন নিজেই জানতো!
নৈহাটি স্টেশনে ট্রেনটা পৌঁছোবার আগেই গাড়ির ভেতরে হই-চই শুরু হয়ে গিয়েছিল। নৈহাটির আগের স্টেশনে একটা থার্ড ক্লাস কামরার এক কোণে একজন প্যাসেঞ্জারকে চুপ করে বসে থাকতে দেখেছিল সবাই। অত শীতের মধ্যেও লোকটার গায়ে কোনও গায়ের কাপড় ছিল না। অনেকক্ষণ ধরেই লোকটা থর-থর করে কাঁপছিল। তারপরেই হঠাৎ কী যেন হলো। লোকটা সেইখানেই বেঞ্চি থেকে টলে নিচের মেঝেতে পড়ে গেল।
সঙ্গে সঙ্গে একটা শোরগোল উঠলো গাড়িতে।
–কী হলো মশাই? লোকটা কি পড়ে গেল নাকি?
পাশের লোকটা তখনো বিস্ময়ের চমক কাটিয়ে উঠতে পারেনি। এতক্ষণে তার মুখে কথা ফুটলো।
বললে–কী জানি, আমি তো বুঝতেই পারিনি আগে, ভদ্রলোক আপন মনে এতক্ষণ তো চোখ বুঁজে বসে ছিলেন–
মেঝের ওপর পড়ে গিয়ে মাথায় চোট লেগেছিল সদানন্দর। কপালের সেই চোট-লাগা জায়গাটা দিয়ে তখন ঝর ঝর করে রক্ত পড়ছিল।
–আর কেউ আছে ভদ্রলোকের সঙ্গে?
না, কেউ নেই। কে আর থাকবে সদানন্দর! পৃথিবীতে সদানন্দদের মত মানুষদের হয়ত কেউই থাকে না। কেউ থাকবার জন্যে সদানন্দর মত মানুষদের হয়ত জন্মই হয় না। কেউই যদি থাকবে তার তাহলে মানুষের মুক্তি কী করে আসবে? কী করে পৃথিবীর ইতিহাস এগিয়ে চলবে? সদানন্দের কেউ যদি থাকতো তাহলে তো পৃথিবীর এগিয়ে চলা কবে থেমে যেত!
ট্রেনটা নৈহাটি স্টেশনে পৌঁছুতেই একজন বললেন–এখানে ওঁকে নামিয়ে দিন মশাই, গার্ডকে খবর দিন, ডাক্তার হাসপাতাল যা হোক সবই আছে নৈহাটিতে–
তখন অফিস টাইম। অফিসযাত্রী প্যাসেঞ্জাররা নৈহাটি স্টেশনের প্লাটফরমে ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে তৈরি হয়ে। কিন্তু ট্রেনটা এসে থামতেই গার্ডের কাছে খবর চলে গেছে। খবর চলে গেছে যে একজন প্যাসেঞ্জার গাড়ির ভেতরে অজ্ঞান হয়ে পড়েছে। গার্ডের কাছে ফার্স্ট-এড-এর বাক্স আছে। সামান্য ব্যাপার হলে গার্ড সাহেব নিজেই তার প্রাথমিক চিকিৎসা করতে পারে।
অন্য প্যাসেঞ্জাররা তখন ট্রেনে ওঠবার জন্যে ব্যস্ত ব্যতিব্যস্ত। তার ভেতর থেকে কয়েকজন মিলে ধরাধরি করে সদানন্দকে কামরা থেকে নামিয়ে আনলে। স্টেশন মাস্টার নিজে এসে দাঁড়িয়েছে। চারদিকে ভিড় জমে গেল।
গার্ড বললে–এখুনি হসপিটালে পাঠাবার ব্যবস্থা করুন মাস্টার মশাই, আমার মনে হয় কেসটা সিরিয়াস–
ভিড়ের মধ্যে থেকে হঠাৎ একজন মহিলা সামনে এগিয়ে এল। সদানন্দর দিকে চেয়ে দেখেই বললে–এঁকে আমার কাছে দিন, আমি এঁর দেখাশোনা করবো–
সবাই মহিলাটির মুখের দিকে চেয়ে দেখলে, বিবাহিতা মহিলা। মাথার সিঁথিতে সিঁদুর। বোঝা যাচ্ছে অফিসে যাবার জন্যে তৈরি হয়ে এসেছিলেন। ডেলি-প্যাসেঞ্জার। অনেকের মুখ চেনা।
স্টেশন মাস্টারও দেখেছেন মহিলাটিকে। চিনতে পারলেন।
জিজ্ঞেস করলেন–আপনার কেউ হন নাকি ইনি?
মহিলাটি বললেন–হ্যাঁ, ইনি আমার….আমার আত্মীয়–আমি এঁকে আমার বাড়িতে নিয়ে যেতে চাই।
–আপনি এই নৈহাটিতেই থাকেন?
মহিলাটি বললেন—হ্যাঁ—
স্টেশন মাস্টার আবার জিজ্ঞেস করলেন–আপনার নাম?
–আমার নাম নয়নতারা। নয়নতারা ব্যানার্জি।
–ইনি আপনার কী রকম আত্মীয় হন?
–আমার খুব নিকট-আত্মীয়। আপনি দয়া করে শুধু একটা স্ট্রেচারের ব্যবস্থা করে দিন, শিরগির, দেরি করবেন না–খুব তাড়াতাড়ি…
