সামনেই বাস দাঁড়িয়ে ছিল। আগে এই রাস্তাটুকু বরাবর হেঁটেই মেরে দিয়েছে সে। কিন্তু এখন বয়স হয়েছে। এখন গতরও আগের চেয়ে অনেক ভারি হয়েছে। সোজা বাসের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন–নবাবগঞ্জে যাবে ভাই, নবাবগঞ্জে?
নবাবগঞ্জে যাবে না। মুবারকপুর থেকে হাঁসখালি চলে যাবে—
–মবারকপুর কত ভাড়া?
–কুড়ি পয়সা।
–কুড়ি পয়সা! কুড়ি পয়সায় এক কাপ চা, আর দুটো সিগারেটও হয়ে যেত। যা গে, কপালে পয়সা নষ্ট আছে, কে খণ্ডাবে? ঠিক আছে, মবারকপুরেই নেমে যাবে সে। প্রকাশ রায় সুটকেসটা নিয়ে বাসে উঠে পড়লো।
মবারকপুরে বাস থেকে নেমে প্রকাশ রায় যখন নবাবগঞ্জে এল তখন আরো বেলা বেড়েছে। নবাবগঞ্জে সেদিন হাটবার। কিন্তু হাট বসতে বসতে সেই যার নাম বেলা দেড়টা। সকাল বেলার দিকে তেমন লোকজন থাকে না। কিন্তু যত বেলা বাড়ে তত চারিদিকের গ্রাম গঞ্জ থেকে ব্যাপারী-চাষা-খদ্দের এসে জোটে। আর আসে ভেনডাররা। কলকাতার কোলে-মার্কেট থেকে সোজা চলে আসে কেষ্টগঞ্জে। কেউ-কেউ নামে মদনপুরে, কেউ আড়ংঘাটায়, আবার কেউ বগুলায়। বেগুন, মূলো, পটল, কপি, কিম্বা আম-কাঁঠাল কিনে ঝুড়ি ভর্তি করে ট্রেনে চাপিয়ে সোজা শেয়ালদা। সেখান থেকে কোলে-মার্কেট।
তখন হাটে আসে ডাক-পিওন। আসে মবারকপুরের ডাক্তার কার্তিকবাবু। আসে কেষ্টগঞ্জ ইস্কুলের হেডমাস্টার। কেউ আসে সাইকেলে চড়ে, কেউ চলে আসে হেঁটে, আবার কেউ বা বাসে চড়ে। এক হপ্তার বাজারটা হয়ে যায় নবাবগঞ্জের হাট থেকে।
–সপ্তাহের ওই দিনটা শুধু হাট করার দিন নয়, পরস্পর দেখা-সাক্ষাৎ করবার দিনও বটে। এ সেই নরনারায়ণ চৌধুরীর আদি আমল থেকেই এমনি চলে আসছিল। বলতে গেলে তিনিই এই হাট বসান এখানে। আগে নবাবগঞ্জের লোকজন বড়-হাট করতে যেত সেই রেলবাজারে আর নয়তো বাজিতপুরে। অবশ্য হাট করার রেওয়াজ তখন এত ছিল না। আলুটা রেলবাজার থেকে নিয়ে এলেই হতো। আলু আর কেরাসিন। বাকি শাক-পাতা-মাছ ওই নবাবগঞ্জের ঘরে বসেই মিলতো সকলের। মালোপাড়া থেকে আসতো মাছ বিক্রি করতে। আর যার যার বাড়ির উঠোনে গজাতে শাক পাতা-কলা-মুলো। তখন কর্তাবাবু নতুন করে বাড়ি করেছেন। পাকা দোতলা বাড়ি। কৃষাণ খাতক ব্যাপারী মহাজন দর্শনার্থী প্রার্থী নানা লোকের আনাগোনা শুরু হয়ে গেছে। নবাবগঞ্জের নামধাম হয়েছে এ দিগরে। তিনি বললেন,–এ কী কথা, নবাবগঞ্জে হাট নেই, এটা তো ভালো কথা নয়! দশটা গ্রামে ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে জানান দিয়ে দিলেন যে, এবার থেকে প্রত্যেক শনি-মঙ্গলবারে নবাবগঞ্জের বারোয়ারি-তলায় হাট বসবে। ব্যাপারীরা যারা হাটে বেচা-কেনা করতে আসবে, জমিদার তাদের কাছ থেকে কোনও তোলা নেবেন না, ব্যাপারীদের কাজ-কারবারে সব রকমের সুবিধে দেওয়া হবে।
যতদিন কর্তাবাবু ছিলেন ততদিন তিনি দেখে গেছেন নবাবগঞ্জের শনি-মঙ্গলবারের হাট বেশ জমজমাট হয়ে চলছে। তারপর কর্তাবাবুর ছেলে হরনারায়ণের আমলেও হাট রমারম হয়ে উঠেছে। হাটে আরো ব্যাপারী আরো খদ্দের আরো দূর-দূর দেশ থেকে এসে জড়ো হয়েছে। সেই কর্তাবাবু আজ নেই, সেই কর্তাবাবুর ছেলে হরনারায়ণ চৌধুরীও আজ আর নেই। এমন কি হরনারায়ণ চৌধুরীর অত যে আদরের ছেলে, সেও আর নবাবগঞ্জে নেই। ওই হাটের দিন সদানন্দ আসতো দীনুর সঙ্গে, কৈলাস গোমস্তাও আসতো এক-একদিন। কৈলাস গোমস্তা আসা মানেই স্বয়ং হরনারায়ণ চৌধুরীর আসা। কৈলাস গোমস্তা হাটে এলে কারো কোনও জিনিসের জন্যে দরদস্তুরের প্রয়োজন হতো না। অনেক সময় সঙ্গে কর্তাবাবুর নাতি সদানন্দ আবদার ধরতো–কৈলাস কাকা, আমি বেলুন নেব–
রেলবাজার থেকে রবারের বেলুন নিয়ে এসে বেচছিল কপিল পায়রাপোড়া। আবদারের কথা শুনেই সে বললে–এই ন্যান্ গোমস্তা মশাই, খোকাবাবুর জন্যে বেলুন ন্যান্–
কৈলাস গোমস্তা বেলুন নিলে।
জিজ্ঞেস করলে–কত দাম রে কপিল?
কপিল পায়রাপোড়া বললে–দামের কথা বলে লজ্জা দেবেন না গোমস্তা মশাই, আমি খোকাবাবুকে এমনই খেলতে দিলুম–
–খেলতে দিলুম মানে? খোকাবাবু তোর কাছে ভিক্ষে নেবে নাকি? খোকাবাবুর পয়সার অভাব?
কপিল পায়রাপোড়া বললে–আজ্ঞে, বাবুদের খেয়ে পরেই তো আমরা বেঁচে আছি, খোকাবাবু খেলতে চেয়েছেন তাই দিলুম ওনাকে—
বেলুন পেয়ে মহাখুশী সে। দীনুমামা আর কৈলাস কাকার সঙ্গে সারা হাট ঘুরতে লাগলো বেলুন নিয়ে। সদানন্দ যেখানে যায়, তার সঙ্গে সঙ্গে বেলুনও মাথার ওপর চলতে থাকে। সেই বেলুন নিয়েই কয়েক ঘণ্টা কেটে গেল। বাড়ির ভেতর মাকে গিয়ে বেলুন দেখালে, চণ্ডীমণ্ডপে বাবাকে গিয়ে দেখালে। কাছারি বাড়িতে কর্তাবাবুকে গিয়ে দেখালে। যেন এক মহা সম্পত্তি পেয়েছে সে। বাড়িময় তার বেলুন নিয়ে খেলা। কিন্তু পরের দিন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই দেখলে সেটা চুপসে গেছে। তখন শুরু হলো নাতির কান্না।
কর্তাবাবুর কানে কান্না যেতে তিনি জিজ্ঞেস করলেন–খোকা কাঁদে কেন রে? কী হয়েছে? মেরেছে নাকি কেউ?
দীনু বললে–আজ্ঞে, খোকাবাবুর বেলুন চুপসে গেছে…
শেষ জীবনে কর্তাবাবু নাতি-অন্ত প্রাণ হয়ে গিয়েছিলেন। যে বায়না ধরতো তাই-ই যোগান দিতেন। কখনও বেলুন, কখনও পাখি, কখনও ঘুড়ি, কখনও সাইকেল। সুদখোর মানুষ কারো সুদের একটা পয়সা ছাড়তেন না। কিন্তু নাতির জন্যে যত টাকাই হোক তার খরচ হওয়াটাকে খরচ বলে কখনও মনে করতেন না।
