আমিও আর থাকতে পারলুম না। বললুম–করছো কী বউমা, করছো কী?
আর আমিও নয়নতারার হাতটা চেপে ধরবার চেষ্টা করতে গেলাম। কিন্তু নয়নতারা এক ধাক্কায় আমার হাত সরিয়ে দিলে।
বললে–আমাকে বাধা দেবেন না দিদিমা–
আমি বললাম–এয়োতির চিহ্ন হলো সিঁদুর, ও কি মুছতে আছে বউমা, ওতে যে তোমার অকল্যেণ হবে–
নয়নতারা রেগে উঠলো–অকল্যাণের আর কতটুকু বাকি আছে দিদিমা যে অকল্যাণকে ভয় করবো?
বললাম–কিন্তু তুমি শুধু তোমার অকল্যাণের কথাই বা ভাবছো কেন বউমা, সদানন্দর অকল্যাণের কথাটাও তো ভাবতে হয়!
নয়নতারা বললে–তা তিনিই কি আমার কথা কখনও ভেবেছেন যে আমি তাঁর কথা ভাববো?
বলে আর এক কাণ্ড করে বসলো নয়নতারা। পেতলের ঘটিটা দিয়ে দু হাতের দুটো শাঁখা দুম্ দুম্ করে ভেঙে টুকরো টুকরো করে গুঁড়িয়ে ফেললে, আর তারপর হাতের নোয়াটা খুলে মুচড়ে বাগানের ঝোঁপের দিকে ছুঁড়ে ফেলে দিলে।
ফেলে দিয়ে বললে–এবার এ আপদগুলো ঘুচলো দিদিমা, আপনি আশীর্বাদ করুন যেন এ ভড়ং আর কখনও জীবনে না পরতে হয়—
আশপাশের লোক তখন সবাই স্তম্ভিত হয়ে নয়নতারার কাণ্ড দেখছে। নয়নতারা আর কোনও দিকে না চেয়ে সোজা রজব আলির গাড়িতে গিয়ে উঠলো।
আমি আর কী বলবো, আর কে-ই বা তখন কী বলবে।
জীবনে অনেক কাণ্ড দেখেছে বেহারি পালের বউ। আর শুধু বেহারি পালের বউ-ই বা কেন? বেহারি পাল নিজেই কি কিছু কম দেখেছে? কে কম দেখেছে এই পৃথিবীতে বেঁচে থেকে? তারক চক্রবর্তীও তো বুড়ো মানুষ। অনেক কিছু কাণ্ড দেখা আছে তার। গোপালের মা, চৌধুরি মশাই-এর গিন্নি, চৌধুরী মশাই, প্রাণকৃষ্ণ সা’ কেউই কোনও বউএর এমন কাণ্ড আগে কখনও কোনও সংসারে ঘটতে দেখেনি, শোনেও নি।
রজব আলির গাড়ি তখন চলতে আরম্ভ করেছে। গৌরীপিসী গাড়িতে উঠতে যাচ্ছিল, কিন্তু নয়নতারা তাকে গাড়িতে উঠতে দিলে না। বললে–না, তোমাকে আর উঠতে হবে না গাড়িতে, আমার সঙ্গে এসে আর ভড়ং করতে হবে না—
গৌরীপিসী আর এগোল না। কিন্তু পেছনে-পেছনে চলতে লাগলো কৈলাস গোমস্তা।
তারক চক্রবর্তী মশাই বলে দিলে–কৈলাস, তুমি বাবা আমাদের বউমাকে একেবারে কেষ্টনগরে ওর বাবার হাতে তুলে দিয়ে তবে ফিরে আসবে, বুঝলে?
কৈলাস গোমস্তা কথাটা বুঝলো কিনা তা বোঝা গেল না। সে তখন গাড়ির পেছন-পেছন অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছে।
বেহারি পালের বউ কথা বলতে বলতে কেঁদে ভাসিয়ে ফেললে। বললে–তারপর বউমার কথা কত ভেবেছি বাবা, ভেবেছি গিয়ে একবার দেখা করে আসি, তা কোথায়ই বা যাবো, আর কোথায় গেলেই বা বউমার সঙ্গে দেখা হবে, তাও বুঝতে পারিনি। তারপর এখন তো তোমাদের বাড়ির এই হাল দেখলে, ওদিকে চেয়ে দেখলেও কান্না পায়। তোমার মা মারা যাওয়ার পর ও-বাড়ির দিকে আর চেয়েই দেখিনি আমি–
কথাগুলো শুনতে শুনতে সদানন্দ উঠলো।
দিদিমা বললে–উঠছো কেন বাবা? কোথায় যাচ্ছো?
সদানন্দ বললে–এবার যাই দিদিমা–
দিদিমা বললে–এতদিন পরে যদি ফিরে এলে তো আবার চলে যাচ্ছো কেন বাবা? দু’টো দিন না হয় থাকলেই এখানে–
সদানন্দ বললে–থাকলে আমার চলবে না দিদিমা—
দিদিমা বললে–কী এমন তোমার কাজ যে দুটো দিনও থাকতে পারবে না? তুমি আজকাল কী করছো? কোথায় আছো?
সদানন্দ বললে–থাকার আমার কোনও জায়গাই নেই দিদিমা, যখন যেখানে থাকি তখন সেইটাই আমার থাকবার জায়গা।
দিদিমা বললে–ধন্যি বাপ বটে হয়েছিল তোমার। তবে তোমাকে বলি বাবা, রেল বাজারের আড়তদার প্রাণকেষ্ট সা’ মশাই আছে, তার কাছেই তোমার বাবা এই তোমাদের সব সম্পত্তি-টম্পত্তি বেচে দিচ্ছেন। তোমার দাদামশাই নিজে কিছু জমি বাগান কিনতে চেয়েছিলেন, তা তোমার বাবা কী বললেন, জানো, বললেন–আমি মিনিমাগনা লোককে বিলিয়ে দেব, তবু আপনাকে আমি এসব কিছুই বেচবো না। তা আমাদেরই ওপর চৌধুরী মশাইএর যত রাগ, তা জানো বাবা!
সদানন্দ জিজ্ঞেস করলে–কেন, আপনাদের ওপর বাবার রাগ কেন?
–ওই যে, নয়নতারার হয়ে আমি কথা বলতুম। আমরা যে বলতুম বউমার ওপর কেন এত হেনস্তা করছেন! বউমা পাছে আমার কাছে আসে তাই শেষের দিকে তাকে আটকে রাখতো তোমার মা, তা জানো–
সদানন্দ আর শুনলো না। এবার সত্যিই ঘরের বাইরে এসে দাঁড়ালো। তার মনে পড়তে লাগলো বহুদিন আগে এই নবাবগঞ্জ থেকেই একদিন যাত্রা শুরু করেছিল সে। সহায় সম্বলহীন অবস্থায় একদিন এই চৌধুরী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিল সে। তারপর ছোটবেলার আদর-আনন্দর মধ্যে কখন কোন্ ফাঁকে একটা দার্শনিক মনের জন্ম হয়েছিল তা সে নিজেও জানতো না। সেই মনটা সুখে-স্বস্তিতে শান্তি পেত না, দুঃখে-বেদনায় ক্লান্ত হতো না। কেবল খুঁজে বেড়াত নিজের ভেতরের নিজেকে। নিজের সেই অদৃশ্য অন্তরাত্মাকে। তাকে সে দেখতে পেত না কখনও। তবু তাকে উদ্দেশ্য করে বলতো–আমাকে বলে দাও কেমন করে আমি তোমাকে পাবো, কেমন করে আমি আমার সমস্ত জটিলকুটিল প্রশ্নের সমাধান করবো?
কিন্তু সদানন্দর এ প্রশ্নের উত্তর কে দেবে?
কেষ্টনগরের সেই ঠিকানার কথাটা মনে ছিল সদানন্দর। বহুদিন আগে একদিন নয়নতারার সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছিল সেই বাড়িটাতে। সেই বিয়ের ঘটনার কথাটা ভাবতেও যেন তার আতঙ্ক হলো। তার জীবনের এক মহা বিপর্যয় বুঝি সেটা।
–আচ্ছা কালীকান্ত ভট্টাচার্য বাড়িতে আছে?
