কিন্তু সেদিন সেই ধর্মশালাটার ঘরখানার মধ্যে রাত জেগে জেগে আত্ম-সমালোচনা করতে করতে তার মনে হলো সে হয়ত ভুল করেছে। এ হয়ত তার জীবনের যোগ বিয়োগের ভুল। এ ভুল শোধরাতে হবে।
সদানন্দ পাশের ঘরের সামনে গিয়ে ডাকতে লাগলো–পাঁড়েজী—পাঁড়েজী–
পাঁড়েজী অনেক রাত থাকতেই ঘুম থেকে ওঠে। উঠে গঙ্গায় নিয়ে স্নান করে আসে। তখন অন্ধকার থাকে চারিদিক। তখন সে গলা ছেড়ে গঙ্গা-স্তোত্র আওড়ায়।
হঠাৎ সদানন্দর নজরে পড়লো গঙ্গাস্তোত্র আওড়াতে আওড়াতে পাঁড়েজী রাস্তা থেকে ধর্মশালায় ঢুকছে।
সদানন্দকে দেখেই পাঁড়েজী বললেন–এত ভোরে কোথায় যাচ্ছেন–বাবুজী, ঠাণ্ডা লাগবে যে
সদানন্দ বললে–আমি আজ ভোরের ট্রেনেই দেশে যাবো পাঁড়েজী, আমাকে ক’টা টাকা দিতে পারো?
–দেশ? কোথায় আপনার দেশ বাবুজী?
–নবাবগঞ্জ।
–নবাবগঞ্জ? সে কোথায়? কত দূর?
সদানন্দ বললে–সে তুমি চিনবে না পাঁড়েজী, সে এখান থেকে বেশি দূর নয়। এক পিঠের ট্রেন ভাড়া চার টাকার মতন পড়বে। আর বাকিটা হেঁটে চলে যাবো।
–কবে ফিরবেন?
সদানন্দ বললে–দু’একদিনের মধ্যেই ফিরব। আমাকে দশটা টাকা দিলেই চলবে–
পাঁড়েজী ঘর থেকে একটা দশ টাকার নোট এনে সদানন্দর হাতে দিলে। সদানন্দ টাকাটা নিয়েই বাইরে চলে যাচ্ছিল। পেছন থেকে পাঁড়েজী বললে–এখুনি চলে যাচ্ছেন?
সদানন্দ বললে–হ্যাঁ, এখান থেকে সোজা শেয়ালদা স্টেশনে হেঁটে যেতে হবে, তারপর ভোর পাঁচটার সময় ট্রেন ছাড়বে–
বলে সদানন্দ অন্ধকার রাস্তায় পা বাড়ালো। ঘড়িতে তখন বোধ হয় ভোর চারটে। চারদিকে তখনও রাস্তার আলোগুলো জ্বলছে। তবু অত ভোরেও অনেক লোক রাস্তায় বেরিয়েছে। ঠাণ্ডা কনকনে হাওয়া। হাড়ের ভেতরটা পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। সদানন্দর মনে হলো তা হোক, তার যত কষ্টই হোক, যত শীতই করুক, এতে ভয় করলে চলবে না, এতে থেমে গেলে চলবে না, এতে হতাশ হলেও চলবে না। বাধা যত আসে তত মঙ্গল, কাঁটা যত ফোটে ততই সুখকর। এ পথের শেষে যা আছে তার দিকে লক্ষ্য স্থির রেখেই এগিয়ে যেতে হবে। পথটাও সত্যি, পথের শেষটাও সত্যি। এই পথটাকে অতিক্রম না করতে পারলে তো আর সে তার গন্তব্যস্থানে পৌঁছোতে পারছে না। হোক, তার আরো কষ্ট হোক, আরো যন্ত্রণা! তার নিজের যন্ত্রণা একদিন সকলের কল্যাণ হয়ে সকলকে অভিষিক্ত করুক, এইটেই তার ভরসা, এইটেই তার আকাঙ্খা!
.
নৈহাটি স্টেশনের প্ল্যাটফরমে এসে দাঁড়ানোর খানিকক্ষণ পরেই ডাউন ট্রেনটা আসে। তখন হুড়-হুড় করে যে যে কামরায় পারে টপটপ করে উঠে পড়ে। আগে স্টেশনটা ছিল ছোট, পরে বড় হয়েছে। প্ল্যাটফরমও অনেকগুলো। দিনে দিনে লোকও বেড়ে যাচ্ছে। শহরও বেড়ে যাচ্ছে হু-হু করে। শহরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মানুষের সংখ্যাও যেন হু-হু করে বেড়ে চলেছে।
বেহারি পালের বউ বলেছিল–তা আজকেই যাবে কেন বাবা? এতদিন পরে এলে, দু’দিন দেশে থাকো না–
সদানন্দ বলেছিল-কোথায় থাকবো?
বেহারি পাল মশাইও বলেছিল–কেন, আমরা কি তোমার পর? আমাদের বাড়িতেও থাকতে পারো।
কিন্তু সদানন্দর তখন আর থাকবার ইচ্ছে ছিল না। বললে–না। আর থাকা চলবে না আমার এখানে–
বেহারি পালের বউ বললে–শেষকালের দিকে বড় কষ্ট হয়েছিল বাবা নয়নতারার। সে কাণ্ড এ গাঁয়ের সবাই দেখেছে। তা নয়নতারার আর দোষ কী বলে? ওই বউ যে এতদিন অত সহ্য করেছে, সেইটেই এক অবাক কাণ্ড–
সদানন্দ সব ঘটনাই শুনেছিল। বললে–তারপর?
বেহারি পালের বউ বললে–তারপর তোমার দাদামশাই চেপে ধরলেন তোমার বাবাকে। তারক চক্কোত্তি মশাইও বললেন–চৌধুরীবাড়ির বউকে এমন করে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া চলবে না। আমরা পাঁচজনা বিচক্ষণ মানুষ থাকতে এ আমরা হতে দেবো না।
তারপর রজব আলির গাড়ি জোড়া হলো। পাড়ার সব মানুষ ভিড় করে উঠোনে তখনও দাঁড়িয়ে। যারা কেষ্টনগরের ভট্টাচার্যি মশাই-এর কাছ থেকে মেয়ে-জামাই-এর জন্যে জামাইষষ্ঠীর তত্ত্ব নিয়ে এসেছিল তারা তখন বাসি মুখে জলটুকু পর্যন্ত না দিয়ে আবার সেই খালি থালাবারকোশ নিয়ে চলে গেছে। অমন অলুক্ষণে কাণ্ড নবাবগঞ্জে কেউ কখনও দেখেনি। তারপর নয়নতারা এসে উঠোনে দাঁড়ালো। আমি দেখলুম নয়নতারা একটা বেনারসী শাড়ি পরেছে। বাড়ির বউ বাপের বাড়ি যাচ্ছে, কিন্তু গায়ে একটা গয়না পর্যন্ত নেই। যা দু’চার গাছা সোনার চুড়ি হাতে ছিল তাই-ই শুধু তখন হাতে রয়েছে।
আমি গিয়ে বললুম–এ কী বউমা, তুমি গয়না পরলে না কেন? তোমার গয়না-টয়না সব কোথায় গেল?
নয়নতারা আমার দিকে চাইলে। তার চোখ দুটো ছল ছল করছে।
বললে–দিদিমা, আসল জিনিসেই যখন ফাঁকি তখন আর গয়না নিয়ে কি আমি ধুয়ে খাবো?
বলে হঠাৎ এক কাণ্ড করে বসলো নয়নতারা। উঠোনে তখন অনেক লোকের ভিড়। সে-সব কোনও দিকেই তখন আর তার ভ্রূক্ষেপ নেই। একেবারে লোকের ভিড় ঠেলে সোজা কুয়োতলার দিকে চলে গেল। সেখানে মাটির জালায় জল ছিল ঘটি করে সেই জল নিয়ে মাথার সিঁথিতে ঢালতে লাগলো।
গোপালের মা ছিল দাঁড়িয়ে। সে তো দৌড়ে গিয়ে বউমার হাত দুটো ধরে ফেলেছে। বললে–করছো কী বউমা, করছো কী? সিঁদুর ধুয়ে ফেলছো কেন?
কিন্তু কে আর কার কথা শোনে তখন? নয়নতারা এক হাতে ঘটি করে তখন নিজের সিঁথির ওপর জল ঢালছে, আর এক হাতে সিঁথির সিঁদুর ঘষে ঘষে তুলে ফেলছে। সিঁথিটা একেবারে বিধবার মত সাদা করে তবে ছাড়লে।
