বলে পাশের লোকটার দিকে তাকালো। জিজ্ঞেস করলে–তারপর? তারপর কী হলো মহেশ?
মহেশ একপাশে চোরের মতন দাঁড়িয়েছিল। সে এবার বলতে লাগলো–তারপর শ্রাদ্ধশান্তি মিটে যাবার পর বড়দাদাবাবু এ বাড়িতেই এসে উঠেছেন।
–আর কাকীমা?
–তাঁর কথা আর বলবেন না দাদাবাবু, বড় কষ্ট তাঁর। এককালে মার কথাতেই সংসার চলতো, এখন চলে বাতাসীর কথায়। বাতাসীকে চেনেন তো? সেই যে বড়দাদাবাবুর মেয়েমানুষ?
সদানন্দ বললে–হ্যাঁ তা চিনি–
–আর সেই সঙ্গে আমাদেরও হয়েছে যত হেনস্থা। বউদি এখন কেউ নয়, মাও এখন কেউ নয়, এখন সেই রাক্ষুসীটাই হয়েছে বাড়ির গিন্নী। দেখুন মানুষের কী নিয়তি! বাবু অত করে যা ঠেকাতে চেষ্টা করেছিলেন, এখন কিনা তাই-ই সত্যি হলো!
–আর তোমার বউদি? তিনি কেমন আছেন?
মহেশ বললে–তিনি বেঁচে আছেন কি মারা গেছেন তা কারো জানবার উপায় নেই, তবে আগেও যেমন ঘর থেকে বেরোতেন না, এখন আরো তেমনি। দিন-দিন শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছেন–
তারপর একটু থেমে বললে–এখন আমি যাই দাদাবাবু, পরে আবার আসবো–
সদানন্দ বললে–আমি তোমাকে আর একটা কথা জিজ্ঞেস করবার জন্যে ডেকেছিলুম মহেশ, সেই নবাবগঞ্জে গিয়েছিলে তুমি, সেখানকার কথা আমার আরো জানা দরকার, সেদিন সব কথা তাড়াতাড়িতে শোনা হয়নি, এখন বলো তো সেখানে গিয়ে কী দেখেছিলে তুমি—
মহেশ বললে–সবই তো বলেছিলুম আপনাকে বলেছিলুম যে সেখানে কেউই নেই, আপনার কর্তাবাবু মারা গিয়েছেন, আপনার স্ত্রীকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে–
–তাই নাকি? আগে তো তুমি তা বলোনি! কী জন্যে তাড়িয়ে দিয়েছে? কেন তাড়িয়ে দিয়েছে?
–গাঁয়ের লোক যা আমাকে বললে–তাই-ই আমি আপনাকে বলছি। আমি তো আর নিজের চোখে কিছু দেখিনি। সে নাকি গাঁয়ের সমস্ত লোক দেখেছে!
সদানন্দ বললে–তা কী করেছিল নয়নতারা?
–আজ্ঞে শ্বশুর শাশুড়ীর সঙ্গে ঝগড়া করেছিল। গাঁ-সুদ্ধ লোক নাকি এসে জড়ো হয়েছিল আপনাদের বাড়িতে। সব লোক মজা দেখতে ছুটে এসেছিল। শেষকালে কান্নাকাটি ঝগড়া কিছু আর বাকি ছিল না। লজ্জায় আপনার মা মারা গেছেন, আর আপনার বাবাও দেশত্যাগী হয়েছেন–
–দেশত্যাগী হয়েছেন।
–হ্যাঁ, দেশত্যাগী হয়ে সুলতানপুরে আপনার দাদামশাই-এর দেশে গেছেন।
সদানন্দ কী যেন ভাবতে লাগলো। সেই সব পুরোন কথাগুলো একে একে সব মনে পড়তে লাগলো তার।
সেই তার জন্মভূমি, সেই তার নয়নতারা। এতকাল এই কলকাতার বউবাজারে আর এই বড়বাজারের ধর্মশালাটার মধ্যে থেকে নবাবগঞ্জের কথা সে প্রায় ভুলতেই বসেছিল। শুধু মাঝখানে একদিন নয়নতারার সঙ্গে দেখা হয়ে গিয়েছিল শেয়ালদা স্টেশনের প্লাটফরমে। তাও কেবল এক মুহূর্তের জন্যে। কিন্তু সেই একমুহূর্তের দেখাই যেন এখনও তার জীবনে এখন অক্ষয় হয়ে রয়েছে, এই এতদিন পরেও।
খানিকক্ষণ পরে বললে–মহেশ, এবার তোমাকে আর আটকাবো না, তুমি যাও–তোমারও দেরি হয়ে যাচ্ছে–
মহেশ বললে–হ্যাঁ, পরে আবার একদিন আসবো দাদাবাবু, আজ যাই–
সদানন্দ বললে–পরে হয়ত আর আমাকে পাবে না এখানে, এমনিতেই আমার শরীর খারাপ। এই দেখ না, আমি তো কদিন খুব জ্বরে ভুগে উঠলুম
পাঁড়েজী এতক্ষণ সব কথা শুনছিল পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। বললে–বোখারে ভুগলেন তো আপনারই নিজের দোষে, ঠাণ্ডা লাগলে বোখার হবে না?
মহেশ তখন চলে গেছে। তার বাড়িতে নতুন মনিবের তখন অনেক হুকুম, অনেক হাঁক-ডাক।
সদানন্দ বললে–সত্যিই আমি আর থাকবো না এখানে পাঁড়েজী, কাল ভোরবেলা আমি একবার দেশে যাবো–
–দেশে যাবেন? কিন্তু আপনার ছেলে-পড়ানো? তারা কী বলবে? তাদের খবর দিয়েছেন?
সদানন্দ বললে–তারা বড়লোকের ছেলে, আমি না পড়ালে তারা আর একজন মাস্টার যোগাড় করে নেবে। কিন্তু কাল ভোরের গাড়িতে আমাকে দেশে যেতে হবেই।
বলে ঘরের মধ্যেই পায়চারি করতে লাগলো সে। এক মুহূর্তে সে যেন-কলকাতা থেকে একেবারে সোজা নবাবগঞ্জে চলে গেছে। একেবারে সোজা সেই চৌধুরীবাড়িতে। সমস্ত পাড়ার লোক জড়ো হয়েছে। সকলে ঘিরে ধরেছে নয়নতারাকে। নয়নতারা চৌধুরী বংশের সম্মান ধুলোয় লুটিয়েছে, নয়নতারা চৌধুরী বংশের মুখে কালি মাখিয়েছে, এ অপরাধের ক্ষমা নেই। সবাই বলছে এ অপরাধের জন্যে তাকে শাস্তি দাও, তাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দাও, তাকে অপমান করে তার বাবার কাছে পাঠিয়ে দাও।
রাত্রে সদানন্দ ধর্মশালার ঘরটার ভেতরে শুয়ে শুয়েও ছটফট করতে লাগলো। বহুদিন ধরে তার মনে হয়েছিল সে বুঝি সমস্ত বন্ধন থেকে মুক্তি পেয়েছে। সংসারের বন্ধন, সমাজের বন্ধন, এমন কি নিজের বন্ধন থেকেও সে পরিত্রাণ চেয়েছে। নিজেরও তো একটা প্রয়োজন বলে বস্তু আছে। নিজের প্রয়োজনের বন্ধনটাই মানুষের সব চেয়ে বড় বন্ধন। যে নিজেকে অস্বীকার করতে পেরেছে তার কাছে তো প্রয়োজনটা আর কোনও বন্ধন নয়। সদানন্দ এতদিন কামনা থেকে পরিত্রাণ চেয়েছে, ক্ষুধা থেকে পরিত্রাণ চেয়েছে আঘাত থেকে পরিত্রাণ চেয়েছে। সে চেয়েছে আঘাত পেতে। আঘাত পেয়ে আঘাতের ঊর্ধ্বে উঠতে। কিছু না পেয়ে সব পাওয়ার পরিতৃপ্তি পেতে। নিজের উপার্জিত অর্থ সকলের মধ্যে বন্টন করে দিতে চেয়েছে সে, যাতে অর্থ না-থাকার যন্ত্রণা সে উপলব্ধি করে। শীতের কাপড় পরকে বিলিয়ে দিয়েছে যাতে শীত পাওয়ার কষ্টটা সে উপভোগ করতে পারে। লোভ, সুখ, সৌভাগ্য থেকে সে দূরে থাকতে চেয়েছে। সংসার থেকে বনে পালিয়ে গিয়ে নয়, সংসারের সমস্ত জ্বালা-যন্ত্রণার মুখোমুখি হয়ে সে সংগ্রাম করতে চেয়েছে। এই আদর্শ নিয়েই সে এতদিন এখানে-ওখানে কাটিয়েছে।
