বলে সদানন্দ বুড়ির হাত ধরে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু পাঁড়েজী বাধা দিলে। বললে–আপনি কেন যাচ্ছেন বাবুজী, আপনি আমার ঘরে থাকুন, আমি কালীগঞ্জের বহুকে কোঠি পৌঁছে দিচ্ছি–
বুড়িটা বললো বাবা, তাই ভালো; তুমি কেন যাবে বাবা, তুমি থাকো, তোমাকে আর কষ্ট করতে হবে না, এই দারোয়ানবাবাই আমাকে বাড়ি পৌঁছে দেবেখন–
বলে পাঁড়েজীর পাশে পাশে চলতে লাগলো। সদানন্দ পেছন থেকে বললে–পাঁড়েজী, তুমি কালীগঞ্জের বউকে একেবারে বাড়িতে পৌঁছিয়ে দিয়ে তবে আসবে, বুঝলে? মাঝরাস্তায় ছেড়ে দিয়ে এসো না যেন–
শীতের রাত্রে বড়বাজারের রাস্তাও তাড়াতাড়ি অন্ধকার হয়ে যায়। সরু সরু গলি। এঁকে-বেঁকে চলেছে। সন্ধ্যেবেলা কারবারীরা দোকান খুলে রাস্তাটা আলোয় আলো করে রেখেছিল। একটু আগে তারা চলে গেছে। তখন সব অন্ধকার। বুড়িকে ধরে ধরে পাঁড়েজী চলছিল। কোন্ দিকে বুড়ির বাড়ি তাও জানে না পাঁড়েজী।
বুড়ি বললে–খোকা বড় ভালো ছেলে দারোয়ানবাবা, খোকা না থাকলে আমি মরে যেতুম–
বুড়ির বয়েস হয়েছে অনেক। ভালো করে সোজা হয়ে হাঁটতে পারে না।
বললে–তোমাকে বাবা আর আসতে হবে না, আমি ঐটুকু হেঁটে চলে যেতে পারবো–
পাঁড়েজী ছাড়লে না তবু। বললে–না, সে হয় না বহুজী, বাবাজী বলে দিয়েছে তোমাকে বাড়িতে পৌঁছি দিতে–আমি তোমার বাড়ি তক্ যাবো, চলো–
বাড়ি মানে সেই রকম বাড়ি। সে বাড়ির না আছে দেয়াল, না আছে ছাদ। একটা বিরাট প্রাসাদের পেছনে একটা খাটালের মতন জায়গা। গরু-মোষ বাঁধা থাকে সেখানে সার সার। সকাল বেলাটার ওই জায়গাটাতেই দুধের জন্যে মানুষের ভিড়ে ভিড় হয়ে যায়। কিন্তু সন্ধ্যেবেলা তার অন্য রকম চেহারা। তখন শুধু কয়েকটা লম্ফ টিম টিম করে জ্বলে।
পাঁড়েজী প্রথমে অবাক হয়ে গিয়েছিল। এ কোথায় এল সে!
বললে–এখানে কোথায় থাকো তুমি বহুজী? এ তো ভঁইসের খাটাল–
বুড়ি বললে–আমি ভিখারী মানুষ দারোয়ানবাবু, এই গয়লারাই আমাকে থাকতে দিয়েছে দয়া করে–
পাঁড়েজী বললে–কিন্তু বাবুজীর সঙ্গে তোমার জানপহচান হলো কী করে?
বুড়ি বললে–এমনি রাস্তায়, আমি রাস্তায় ভিক্ষে করছিলুম, আমার থাকবার জায়গাও ছিল না, খোকা আমাকে এখানে এনে থাকতে দিলে–আমার কাপড় কিনে দিলে, শীতের জন্যে আমার গায়ের কাপড় কিনে দিলে–
পাঁড়েজী হতবাক হয়ে গেল। যে-মানুষটার নিজেরই থাকবার খাবার ঠিক নেই সেই মানুষটা কিনা আবার তার মত আর একজনের থাকা-খাওয়ার ভার স্বেচ্ছায় মাথায় তুলে নিয়েছে। চারদিক থেকে খাটালের নোংরা দুর্গন্ধ নাকে আসছে। এতদিন ধরে পাঁড়েজী বড়বাজারে আছে, এরকম জায়গার অস্তিত্ব সম্বন্ধে তার কোনও ধারণাই ছিল না এতদিন। অথচ বাবুজী এই কদিনের মধ্যে এই জায়গারও খবর পেয়েছে।
পাঁড়েজী চলেই আসছিল। কিন্তু বুড়িটা পেছন থেকে ডাকলে।
বললে–ও দারোয়ানবাবা, একটা কথা বলি শুনে যাও–
পাঁড়েজী দাঁড়ালো। বললে–কেয়া?
বুড়ি বললে–আচ্ছা বাবা, খোকা আমাকে কালীগঞ্জের বউ বলে কেন ডাকে তা তুমি জানো? কালীগঞ্জের বউ কে?
পাঁড়েজী আরো অবাক। বললে–কালীগঞ্জের বহু তো তুমিই, তোমারই নাম তো কালীগঞ্জের বহু–
–না বাবা, আমার নাম তো রাজুবালা, আমি কেন কালীগঞ্জের বউ হতে যাবো? খোকা কেবল আমাকে ওই নামে ডাকবে। আমি যত বলি আমার নাম রাজুবালা তত খোকা আমাকে কালীগঞ্জের বউ বলে ডাকবে। কে কালীগঞ্জের বউ তা তুমি বলতে পারো বাবা?
পাঁড়েজী বললে–তা তুমি বাবুজীকে জিজ্ঞেস করলেই পারো–
বুড়ি বললে–জিজ্ঞেস করেছি, তা তার কিছু জবাব দেয় না খোকা। তুমি খোকাকে একটু জিজ্ঞেস করো তো বাবা–
পাঁড়েজী জিজ্ঞেস করবে বলতেই বুড়ি বললে–ওই দেখ আমার ঘর, একদিকে গরু-মোষ থাকে, আর একদিকে আমি থাকি। খোকা আমাকে ভিক্ষে করতে বারণ করেছে। তা আমার কপালে যদি দুঃখু থাকে তো খোকার কী দোষ, খোকা কী করবে? আমার চিরকাল এমন দুর্দশা ছিল না বাবা, একদিন এই আমিই আবার রাজরানী ছিলুম, সে সব কেউ জানে না–
বলে বুড়ি একগাদা দুঃখের কাহিনী বলতে লাগলো। সে কাহিণীর আর শেষ হয় না। কবে নাকি কোন জমিদারের বউ ছিল বুড়ি, দেওর আর ভাসুরপোরা মিলে তার সম্পত্তি গ্রাস করে নিয়েছে। বিধবা পেয়ে তাকে দিয়ে কী সব কাগজে সই করিয়ে নিয়ে এক কাপড়ে বাড়ি থেকে বার করে দিয়েছে। তারপর থেকে এই দোরে দোরে ভিক্ষে করেই তার দিন কাটছিল।
অত সব কথা শোনবার দরকার ছিল না পাঁড়েজীর। খানিকটা শুনে সোজা আবার ধর্মশালায় চলে এল।
কিন্তু ধর্মশালায় এসে দেখলে সেখানে বাবুজীর কাছে তখন আর একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। একেবারে অচেনা মুখ। পাঁড়েজীকে দেখেই সদানন্দ জিজ্ঞেস করলে কী হলো পাঁড়েজী, কালীগঞ্জের বউকে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছ?
পাঁড়েজী বললে–হ্যাঁ বাবুজী, লেকিন বুড়ি জিজ্ঞেস করছিল ওকে আপনি কালীগঞ্জের বউ বলে ডাকেন কেন? ওর নাম তো রাজুবালা–
সদানন্দ হাসলো। বললে–ও তুমি বুঝবে না পাঁড়েজী, ও কেউই বুঝবে না।
পাঁড়েজী বললে–কিন্তু ও তো নিজেই বললে–ওর নাম রাজুবালা–
সদানন্দ বললে–রাজুবালা হোক, আর যা-ই হোক, আমি ওকে কালীগঞ্জের বউ বলে ডাকি, ওই বলে ডেকে আমি সুখ পাই পাঁড়েজী, আমি যদি সুখ পাই ওই বলে তাহলে তুমি কেন আপত্তি করছো? জানো পাঁড়েজী, পৃথিবীতে যাদেরই কেউ দেখবার নেই তারা সবাই-ই হলো কালীগঞ্জের বউ।
