পাঁড়েজী বললে–এখন কেমন আছো বাবুজী?
সদানন্দ বললে–আমি আজকে উঠবো পাঁড়েজী, আমার হাতটা একটু ধরো তো–
পাঁড়েজী ধমক দিয়ে উঠলো–আপনি চুপ করে শুয়ে থাকুন তো, ডাক্তার আপনাকে শুয়ে থাকতে বলেছে, আমি দরজায় শিকলি দিয়ে যাচ্ছি, ঘর থেকে বেরোতে পারবেন না–
বলে সত্যি-সত্যিই দরজায় শিকল দিয়ে চলে যেত পাঁড়েজী।
কিছুতেই যেন সদানন্দর কিছু খারাপ হতে দেবে না পাঁড়েজী। যেন পাঁড়েজীই সদানন্দর ভালো-মন্দের নিয়ন্তা।
কিন্তু আর কতদিন সদানন্দ চুপচাপ শুয়ে থাকবে! সেদিন আর থাকতে পারলে না সদানন্দ। বললে–আমি আজ বেরোবাই, তুমি আমাকে আটকে রাখতে পারবে না পাঁড়েজী, আমাকে ছেড়ে দাও–
পাঁড়েজী বললে–কিন্তু আপনি সকাল-সকাল ফিরে আসবেন বলুন?
সদানন্দ বললে–আমি ফিরে আসি না-আসি তোমার কি? জানো আমার কত কাজ? আমার অসুখের জন্যে কত কাজ আটকে আছে?
পাঁড়েজী বললে–আপনি অসুখ বাধাবেন আর দোষ হলো আমার?
সদানন্দ বললে–তোমারই তো দোষ, তুমিই তো আমাকে বাইরে বেরোতে দাও না, ঘরে শেকলবন্ধ করে আটকে রেখে দাও–
পাঁড়েজী বললে–আপনি আলোয়ানটা না হারালে তো আর আপনার অসুখ করতো না–আপনি আলোয়ান হারালেন কেন?
সদানন্দ বললে–তা যাদের আলোয়ান আছে তাদের বুঝি অসুখ বিসুখ করে না?
বলে রাগ করে তাড়াতাড়ি ধর্মশালা থেকে বেরিয়ে গেল।
কিন্তু ঘণ্টাখানেক পরেই ধর্মশালার সামনে একটা বুড়ি মতন মেয়েমানুষ এসে হাজির। তখন ধর্মশালাটা ফাঁকা। পাঁড়েজী তখন সবে সদর গেটে এসে বসেছে। বুড়িটাকে দেখেই কেমন সন্দেহ হলো পাঁড়েজীর। বুড়িটার গায়ে বাবুজীর আলোয়ান কেন?
সঙ্গে সঙ্গে পাঁড়েজী বুড়িটাকে ধরে ফেলেছে। বললে–কে তুমি? এ আলোয়ান কোথায় পেলে? এ কার আলোয়ান?
বুড়ি বললে–আমি খোকাকে খুঁজতে এসেছি বাবা–
–খোকা? খোকা কে?
বুড়িটা তখন ভয়ে থর থর করে কাঁপছে। তার হাতখানা পাঁড়েজী জোরে টিপে ধরেছে। বললে–বলো এ আলোয়ান কার? কোত্থেকে চুরি করেছ?
বুড়িটা সঙ্গে সঙ্গে কেঁদে ফেললে। বললে–আমাকে খোকা দিয়েছে এটা।
পাঁড়েজী বললে–খোকা কে আগে তাই বলো? কোথায় তোমার খোকা? কোন্ বাড়িতে থাকে?
বুড়ি কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলো–আমার খোকা যে এ বাড়িতে থাকে গো, এই ধর্মশালায়। খোকা যে বলেছিল। কদিন ধরে খোকাকে দেখতে পাইনি তাই খোকাকে দেখতে এলুম–
পাঁড়েজী বুঝলো বুড়িটা চোর। বললে–তোমাকে আমি পুলিসে দেব, চলো থানায় চলো, চলো থানায়–
পাঁড়েজী বুড়িকে হাত ধরে হিড়হিড় করে টানতে লাগলো। বললে–বলো তোমার নাম কী? এ আলোয়ান আমি নিজে বাবুজীকে কিনে দিয়েছি, আমার চেনা আলোয়ান, আমি তোমাকে জেলে পাঠাবো, চলো–
বুড়ি ভয়ে হাউ-মাউ করে কেঁদে উঠলো। বললে–না বাবা দারোয়ান, আমাকে তুমি জেলে দিও না, তুমি খোকাকে একবার ডেকে দাও, খোকা নিজে আমাকে আলোয়ানটা দিয়েছে, আমি চাইনি, খোকাকে তুমি একবার ডেকে দাও–
পাঁড়েজী বললে–এখানে খোকা বলে কেউ নেই, তোমাকে থানায় যেতে হবে। বলো তোমার নাম কী?
বুড়ি বললে–আমার নাম কালীগঞ্জের বউ বাবা, কালীগঞ্জের বউ বললেই খোকা আমাকে চিনতে পারবে, তুমি একবার ডেকে দাও না বাবা–
হঠাৎ সদানন্দ সেই সময়ে সেই দিকেই আসছিল। ধর্মশালার সামনে আসতেই বুড়ি চিনতে পেরেছে। খোকাকে দেখে বুড়ি গলা ছেড়ে কেঁদে উঠলো–ও খোকা এই দ্যাখ, দারোয়ান আমায় পুলিসে ধরিয়ে দিচ্ছে–
সদানন্দও অবাক। বললে–এ কি, কালীগঞ্জের বউ, তুমি এখানে?
বুড়ি হাউ-মাউ করে তখন কাঁদছে। এ সেই আনন্দের কান্না। বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়ার আনন্দে চোখে জল এসে সব কিছু ভাসিয়ে দেওয়া।
পাঁড়েজীও কাণ্ড দেখে অবাক। কিছুক্ষণ তার মুখে কোনও কথাও ছিল না। এবার বললে,– বাবুজী, একে আপনি চেনেন?
সদানন্দ বললে–তুমি একে কিছু বোল না পাঁড়েজী, এ আমার বড় আপনার লোক, এ হলো কালীগঞ্জের বউ।
কালীগঞ্জের বউ! কাঁহা কালীগঞ্জ, কিস্কা বহু সে সব কিছুই সে বুঝতে পারলে না। শুধু এইটুকু বুঝতে পারলে যে বুড়ি বাবুজীর খুব আপনার লোক। কিন্তু আপনার লোক বলে অত দামী আলোয়ানটা তাকে দিয়ে নিজে ঠাণ্ডায় কষ্ট পেতে হবে!
বুড়ি তখন বলছে—ক’দিন তুমি যাওনি দেখে আমি বাবা আর থাকতে পারলুম না, তুমি বলেছিলে এই ধর্মশালায় তুমি থাকো তাই মরতে মরতে এলুম, ভাবলুম যাই দেখে আসি আমার খোকা কেমন আছে–
সদানন্দ বললে–আমার যে খুব জ্বর হয়েছিল–
–জ্বর? কেন বাবা, তোমার জ্বর হয়েছিল কেন? ঠাণ্ডা লাগিয়েছিলে বুঝি?
পাঁড়েজী মাঝখান থেকে বলে উঠলো–বোখার হবে না? একটা আলোয়ান কিনে দিয়েছিলুম বাবুজীকে তাও তোমাকে দিয়ে দিয়েছে, এ রকম করলে বাবুজীর তবিয়ৎ ঠিক থাকে?
বুড়ি বললে–তা তোমার নিজের আর আলোয়ান নেই নাকি বাবা? তা হলে আমাকে এ আলোয়ান দিলে কেন?
সদানন্দ বললে–ও সব কথা থাক, এখন কী বলতে এসেছিলে বলো? ওষুধ খাচ্ছো তুমি? ডাক্তারবাবুর কাছে গিয়েছিলে আর?
–হ্যাঁ বাবা, তোমার দয়াতেই এ-যাত্রা বেঁচে গেলুম বাবা, তুমি আমার জন্যে যা করেছ সে আমি মরে গিয়েও মনে রাখবো–
সদানন্দ বললে–তা এই শরীর নিয়ে তুমি আবার এখানে আসতে গেলে কেন? কে আসতে বললে? এই শীতের মধ্যে কেউ জ্বর থেকে উঠে বেরোয়? চলো, চলো তোমাকে বাড়ি পৌঁছিয়ে দিচ্ছি, চলো–
