পাঁড়েজী বলে–আপনার কাপড়টা যে ছিঁড়ে গেছে বাবুজী, একটা কাপড় কিনুন এবার–
সদানন্দ বুঝতে পারে না। বললে–ও থাক গে যাক, ওটুকু ছিড়লে ক্ষতি কী? আমাকে তো আর ওরা কাপড় দেখে মাইনে দিচ্ছে না, আমার পড়ানো খারাপ না হলেই হলো–
পাঁড়েজী শীতের সময় একটা আলোয়ান কিনে দিয়েছিল তার মালিকের গদি থেকে। এত যে ঠাণ্ডা পড়েছে সেদিকে খেয়াল ছিল না সদানন্দর। সেই শীতের মধ্যেই হি-হি করে কাঁপতে কাঁপতে পড়িয়ে ফিরতো।
পাঁড়েজী বলতো–আপনার জাড়া লাগে না বাবুজী? কোনদিন আপনার বোখার হবে ঠিক–
বোখার হোক আর না হোক ক’দিন সদানন্দ খুব কাশিতে ভুগলে। কাশতে কাশতে শেষকালে প্রায়ই দম আটকে আসতো।
সেদিন পাঁড়েজী আর স্থির থাকতে পারলে না। কোথা থেকে পাঁড়েজী একটা গরমের আলোয়ান কিনে এনে দিলে। বললে—রাততিরে আপনাকে বেরোতে হয়, এটা পরে বেরোবেন বাবুজী–
তা পড়ানো তো ঘণ্টাখানেকের কাজ মাত্র! তারপরে সদানন্দ যে কোথায় যায় তা পাঁড়েজী বুঝতে পারে না। অনেক রাত্রে যখন সদানন্দ ফেরে তখন বউবাজারের রাস্তা রীতিমত ফাঁকা। তখন পা দুটো আর যেন চলতে চায় না।
ধর্মশালার বড় ফটকটা তখন বন্ধ করে দেয় পাঁড়েজী। মধ্যেখানের দরজাটা শুধু খুলে রেখে দেয়। যে তখন ভেতরে আসতে চাইবে সেই ছোট গর্তটার মধ্যে মাথা গলিয়ে তাকে ঢুকতে হবে। কেউ ভেতরে মাথা গলালেই পাঁড়েজী উঠোনের কোণে চাপাটি বানাতে বানাতে জিজ্ঞেস করবে –কে? কোন্ হ্যায়?
চাপাটি তৈরি করে পাঁড়েজী অনেকক্ষণ সদানন্দর জন্যে অপেক্ষা করে। উনুনের আগুন নিবে যায় তখন। তবু ফটকের দিকে চেয়ে পাঁড়েজী হাঁ করে বসে থাকে। কখনও কখনও নিজের কাঠের বাক্সটা থেকে পুরোন ‘রাম-চরিত মানস’টা বার করে উচ্চারণ করে করে পড়তে থাকে। আর উঠোনের বড় ঘড়িটার দিকে চেয়ে সময়টা মাঝে মাঝে দেখে নেয়।
প্রচণ্ড শীত পড়েছে তখন কলকাতায়। শীতে হি-হি করে সবাই কাঁপে। পাঁড়েজী গরম উনুনটার পাশে বসে হাত পাগুলো একটু সেঁকে নেয়।
ঠিক তখন সদানন্দ ঢোকে।
পাঁড়েজী দেখেই অবাক। বললে–আপনার আলোয়ান কোথায় গেল বাবুজী! সেদিন যে নতুন আলোয়ান কিনে দিলাম!
সদানন্দ সে-কথায় কান দিলে না। ঘরের ভেতরে ঢুকে হাতের বইটা রেখে বললে–রুটি করেছ নাকি পাঁড়েজী?
পাঁড়েজী সেকথার জবাব না দিয়ে বললে–আপনার আলোয়ানটা কোথায় গেল তাই বলুন বাবুজী? আলোয়ানটা কোথায় ফেলে এলেন?
সদানন্দ বললে–সে কোথায় হারিয়ে গেছে বোধ হয়
–হারিয়ে গেছে মানে? নতুন আলোয়ানটা ওমনি হারিয়ে গেল?
সদানন্দ বললে–হারিয়ে গেলে আর কী করবো বলো? আমি তো আর ইচ্ছে করে হারাইনি
–তা ছাত্রের বাড়িতে ফেলে আসেন নি তো? সেখানে ফেলে এলে কাল ঠিক ফিরে পেয়ে যাবেন।
সদানন্দ বললে–তাহলে তো ফিরে পাবোই। কালই গিয়ে সেখানে খোঁজ করবো তুমি ও নিয়ে কিছু ভেবো না।
তার পরের দিন সদানন্দ যখন বাড়ি ফিরে এল পাঁড়েজী দেখলে সেদিনও সদানন্দর গায়ে আলোয়ান নেই। বললে–কই, আলোয়ান কোথায় গেল? পেলেন না?
সদানন্দ বললে–যাক গে আলোয়ান, তুমি ওই সামান্য আলোয়ান নিয়ে আবার মিছিমিছি মাথা ঘামাচ্ছো কেন পাঁড়েজী?
পাঁড়েজী বললে–তা সত্তর টাকা দামের জিনিসটা সামান্য জিনিস হলো? আমার এক মাসের মাইনে, তা জানেন? আলোয়ানটা তাহলে সত্যি-সত্যিই হারালেন?
সদানন্দ বললে–তুমি বোঝ না পাঁড়েজী, আলোয়ানের চেয়ে জীবনের দাম অনেক বেশি তা জানো? কলকাতায় যে কত লোকের আলোয়ান নেই, তা তারা কি সব মরে গেছে? তুমি দাও, আমাকে খেতে দাও–
আশ্চর্য, যে মানুষটা লক্ষ লক্ষ টাকার সম্পত্তি অকাতরে ছেড়ে আসতে পারলে তাকে পাঁড়েজী আলোয়নের মূল্য বোঝাতে চাইছে! কিন্তু তার জন্যে পাঁড়েজীরই বা এত দরদ কেন? কে এই পাঁড়েজী যে সদানন্দর জন্য এত ভাবে! সদানন্দ মাঝে মাঝে পাঁড়েজীর কথা ভেবে অবাক হয়ে যায়। সংসরে এমন ঘটনা কেন ঘটে! কেন একজন বেহারবাসী লোক তার জন্যে রাত জেগে না খেয়ে বসে থাকে? কেন তার ঠাণ্ডা লাগবে বলে তাকে আলোয়ান কিনে দেয়? সমস্ত পৃথিবীর লোক যখন নিজের স্বার্থ চিন্তা ছাড়া আর কিছু চিন্তা করবার সময় পায় না তখন কেন এমন এক-একজন মানুষ পৃথিবীতে জন্মায়! কোথায় ছিল পাঁড়েজী, কী এক ঘটনায় দু’জনে একদিন ঘটনাচক্রে দেখা হয়ে গেল, আর কোথাকার কোন্ নবাবগঞ্জের সদানন্দ চৌধুরী তার সঙ্গে এক ছাদের তলায় এসে জীবন কাটাতে লাগলো। যখন বউবাজারের সমরজিৎবাবুর বাড়িতে সে ছিল তখনও তো সে জানতো না যে ভবিষ্যতে এখানে এই ধর্মশালায় এমন করে তাকে দিন কাটাতে হবে!
.
কিন্তু সেদিন যা হবার তাই হলো।
প্রত্যেক দিন ভোরবেলা সদানন্দ ঘুম থেকে উঠতো। উঠেই চলে যেত বাইরে। সেদিন আর সে উঠলো না। বিছানা থেকে মাথাই তুলতে পারলে না সে।
পাঁড়েজী একটু অবাক হয়ে গিয়েছিল। তারপর মাথায় হাত ছোঁয়াতেই চমকে উঠেছে।
বললে–ইস, আপনার যে বোখার হয়েছে বাবুজী, আপনার গা যে একেবারে পুড়ে যাচ্ছে–
সদানন্দ তখন অচৈতন্য একেবারে। তার নড়বারও ক্ষমতা নেই, কথা বলবারও ক্ষমতা নেই। কদিন একেবারে বেঁহুশ হয়ে কাটলো। কোথা দিয়ে দিন গেল রাত গেল তাও তার খেয়াল হলো না। যত জ্বালা পাঁড়েজীর। ডাক্তার ডেকে আনা ওষুধ খাওয়ানো থেকে শুরু করে সব কিছুই করতে হলো তাকে। যখন জ্ঞান হলো একটু তখন সদানন্দ চেয়ে দেখলে পাঁড়েজী তার মুখের ওপর ঝুঁকে রয়েছে।
