চৌধুরী মশাই এতক্ষণে আবার কথা বললেন।–তা বউমাই কি আপনাকে এখানে পাঠিয়েছে?
নিখিলেশ বললে–আজ্ঞে না, আমি তো মাস্টার মশাইএর সমস্ত কিছুই দেখাশোনা করতুম, নয়নতারার বিয়ের সময় জিনিসপত্র কেনা-কাটা করা থেকে শুরু করে শীতের তত্ত্ব, জামাইষষ্ঠীর তত্ত্ব পাঠানো পর্যন্ত সমস্তই আমাকে করতে হতো। মাস্টার মশাইএর তো কাজকর্ম করবার আর কেউ ছিল না। তাঁর মৃত্যুর পর যা-কিছু করণীয় সব আমিই করেছি। নয়নতারার স্বার্থ দেখা তো আমারই কাজ, তাই আমি এসেছি–
–তা বউমার সঙ্গে কি ফিরে গিয়ে আপনার দেখা হবে?
–হ্যাঁ, দেখা হবে।
–তা একটা কথা তাকে গিয়ে বলবেন যে যে বাড়ি সে এত তেজ দেখিয়ে ছেড়ে চলে গিয়েছিল সেই বাড়ি থেকে চেয়ে নিয়ে যাওয়া গয়না পরতে তার ইজ্জতে বাধবে না তো? এ গয়না তার ছুঁতে ঘেন্না করবে না তো?
নিখিলেশ বললে–কিন্তু আমি যতদূর শুনেছি তাতে তো মনে হয় সে তেজ দেখিয়ে এ বাড়ি ছেড়ে যায়নি! সে ভদ্রভাবেই এখান থেকে চলে গেছে–
চৌধুরী মশাই বললেন–তা জামাইষষ্ঠীর তত্ত্ব ভেঙে চুরমার করে তছনছ করে দেওয়া যদি তেজ দেখানো না হয় তো তেজ দেখানো আবার কাকে বলে তা তো জানি না। পাড়ার লোকজন ডেকে শ্বশুর-শাশুড়ীর ইজ্জতে ঘা দেওয়া যদি তেজ দেখানো হয় তো তেজ দেখানো আর কাকে বলবো তাও তো বুঝতে পারছি না। এই তো এই সা’মশাইও সেদিন এখানে হাজির ছিলেন, ইনিও তো সাক্ষী আছেন, আমি সত্যি বলছি না কি মিথ্যে বলছি উনিই বলুন না! উনিই বলুন আজ পর্যন্ত কোনও বাড়ির বউ কারো শ্বশুরকুলে এমন করে কলঙ্ক দিয়েছে? আপনি জানেন যে সেই ঘটনার পর আমার স্ত্রী এত আঘাত পান যে সেই দিনই তিনি শয্যা নেন আর সেই শয্যাই তাঁর শেষ শয্যা হয়ে ওঠে? আমার বউমার জন্য যেমন আমার একমাত্র ছেলে বিবাগী হয়ে যায় তেমনি আমার সংসারও তারপর থেকে ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।
নিখিলেশ বললে–গয়না আপনি দেবেন না-দেবেন সে আপনার অভিরুচি, কিন্তু অকারণে নিজের পুত্রবধূর নামে মিথ্যে দোষারোপ করবেন না।
–মিথ্যে দোষারোপ? আপনি বলতে চান আমি এই বয়েসে মিছে কথা বলছি?
নিখিলেশ বললে–মিছে কথার আবার কম বয়েস বেশি বয়েস আছে নাকি? যাদের মিছে কথা বলা স্বভাব বুড়ো বয়েসেও মিছে কথা বলতে তাদের আটকায় না।
–তার মানে?
নিখিলেশ বললে–তার মানে বোঝাবার সময় আমার নেই। আমি অনেক দূর থেকে এসেছি। যদি নয়নতারার গয়নাগুলো দিতেন তো যাতে ঠিক-ঠিক নয়নতারার হাতে পৌঁছায় তা ব্যবস্থা করতে পারতুম। আমি চলি–
প্রকাশ বললে–হ্যাঁ আসুন, আর বউমার সঙ্গে যদি দেখা হয় তো বলবেন যে সে যেন মনে রাখে যে মাথার ওপর ভগবান বলে একজন আছেন, তাঁর আর এক নাম দর্পহারী মধুসূদন, তিনি কাউকে রেহাই দেন না। অত বড় লঙ্কার রাজা দশানন, তিনি পর্যন্ত রেহাই পাননি তা বউমা তো কোন্ ছার। কথাটা বউমাকে জানিয়ে দেবেন–
বলতে বলতে প্রকাশ নিখিলেশের পেছন পেছন বাড়ির সদর গেটের দিকে চলে গেল।
চৌধুরী মশাই আর দেরি করলেন না। প্রকাশ চলে যেতেই দরজায় খিল দিয়ে দিয়েছেন। তারপর সিঁড়ির দিকের জানালা দু’টোও বন্ধ করে দিয়ে এসে বসলেন।
বললেন–আপনার সঙ্গে নিরিবিলিতে যে দুটো কথা বলবো সা’ মশাই তারও যো নেই, এমনিই হয়েছে আমার কপাল
সা’ মশাই বললে–আপনার শরীর খারাপ ছোটমশাই, আপনি অত ব্যস্ত হবেন না–
চৌধুরী মশাই বললেন ব্যস্ত কি সাধে হই সা’ মশাই, আজকে যদি আমার উপযুক্ত ছেলে কাছে থাকতো তো আমি কি ব্যস্ত হতুম?
সা’ মশাই বললে–তা সদানন্দের কোনও খবর পেলেন নাকি?
চৌধুরী মশাই বললেন–ছেলের নাম আর আমার সামনে মুখে আনবেন না সা’মশাই, আমি জীবনে তার আর মুখ-দর্শনও করবো না–ওই ছেলেই আমার জীবনের মস্ত অভিশাপ।
সা’ মশাই বললে–কিন্তু সেই ছেলে যদি কোনওদিন আবার ফিরে আসে?
চৌধুরী মশাই বললেন–সেই জন্যেই তো এখানকার ওখানকার সব সম্পত্তি বিক্রি করে দিচ্ছি। বিক্রি করে দিয়ে টাকাগুলো ব্যাঙ্কে রেখে দেব, তারপর পায়ের ওপর পা তুলে দিয়ে বসে টাকা ভাঙাবো আর খাবো—
.
হায় রে মানুষের আশা, আর হায় রে মানুষের স্বপ্ন! মানুষ কত আশা করেই না সংসার গড়ে আর মানুষের সৃষ্টিকর্তা কত নিপুণভাবেই না সেই সংসার আবার ভাঙে! নরনারায়ণ চৌধুরীর সেই নিজের হাতে গড়া সংসার যে এমন করে তিন পুরুষের মধ্যে ভেঙে গুঁড়িয়ে যাবে তা কি তিনি স্বপ্নেও ভাবতে পেরেছিলেন। এই বাড়ির প্রত্যেকটি ইট, প্রত্যেকটি কাঠ, প্রত্যেকটি লোহার টুকরো পর্যন্ত ছিল তাঁর কাছে বড় মমতার সামগ্রী। বড় মমতা দিয়ে বড় স্নেহ দিয়ে এ বাড়ির প্রতিটি সামগ্রী তিনি একদিন সংগ্রহ করেছিলেন তাঁর বংশধরদের ভবিষ্যৎ পাকা করবার জন্যে। কিন্তু তিনি কি জানতে পেরেছিলেন যে একদিন তাঁরই নাতি সহায়-সম্বলহীন অবস্থায় বড়বাজারের এক অখ্যাত ধর্মশালার এক কোণে একটা অন্ধকার ঘরে তার জীবন কাটাবে!
ধর্মশালার জীবন এক অদ্ভুত ধরনের জীবন। ধর্মশালার ভেতরে কখন কে আসছে আবার কখন কে কোথায় বেরিয়ে যাচ্ছে তা কারো বলবার সাধ্য নেই। হঠাৎ এক-একদিন হয়ত মানুষে-মানুষে ঘর ভর্তি হয়ে গেল, দু’দিন পরে তারপর আবার হয়ত সব ফাঁকা। তখন খাঁ-খাঁ করে ভেতরটা! কিন্তু কদিনই বা সদানন্দ তা দেখতে পায়–আর ক’দিনই বা সে নিজের ঘরে থাকে! পাঁড়েজী দুটো ছাত্র পড়ানোর কাজ করে দিয়েছিল। সকালবেলা একটা ছাত্র আছে, তারা দেয় চল্লিশ টাকা, আর সন্ধ্যেবেলা আর একজন, তারা দেয় পঞ্চাশ টাকা। কিন্তু মাইনে পাবার দুদিন পরেই হাত ফাঁকা হয়ে যায়।
