প্রকাশ বললে–তা তো বলেই ছিলুম, তা সেটা কি মিথ্যে বলেছিলুম? বলুন না সা’ মশাই আপনিও তো বউমাকে দেখেছিলেন, অমন রূপসী বউ কটা লোকের বাড়িতে আছে, আপনিই বলুন? বাইরে যার অমন রূপ ভেতরে ভেতরে যে তার মনে কালকেউটের বিষ তো আমি কী করে জানবো বলুন–
প্রাণকৃষ্ণ সা’ মশাই বললে–সে যা হয়ে গেছে গেছে, বাবাজী তুমি চুপ করো, চৌধুরী মশাই যা বলছেন তাই করো।
প্রকাশ বললে–তাহলে আমি ঘর থেকে বেরিয়ে যাবো বলতে চান?
সা’ মশাই বললেন–হ্যাঁ, যখন উনি বেরিয়ে যেতে বলছেন তখন বেরিয়েই যাও–আমাদের কাজ-কর্ম আছে, তোমার সামনে তো সে-সব কথাবার্তা হবে না–
প্রকাশ যেন কী রকম বিমূঢ় হয়ে গেল কথাগুলো শুনে। বললে–বুঝতে পেরেছি, যেই টাকাকড়ির কথা উঠেছে তখন আমি পর হয়ে গেলুম, আর যখন ভাত রান্নার কথা হবে তখনি আমি বড় আপনার লোক, না? জামাইবাবু যখন সেদিন অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়েছিলেন তখন কে তাঁকে দেখেছিল শুনি? তখন তো আমি ছাড়া আর কোনও শর্মা কোথাও ছিল না–
চৌধুরী মশাইএর ধৈর্যের বাঁধ এবার ভেঙে গেল। তিনি বললেন–আর কথা নয়, তুমি এবার বেরিয়ে যাও দিকি, এখখুনি বেরিয়ে যাও, তোমাকে আর ভাত রাঁধতে হবে না, টাকা ছড়ালে লোকের অভাব হবে না আমার, তুমি একেবারে বেরিয়ে যাও এখান থেকে, এ বাড়ি থেকেই বেরিয়ে যাও–
বলে ঠেলে বাইরে পাঠিয়ে দিতে যাচ্ছিলেন চৌধুরী মশাই, কিন্তু সেই মুহূর্তেই কে একজন অচেনা লোক এসে হাজির হলো। লোকটিকে দেখে তিনজনেই অবাক। কে এ?
প্রকাশ সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। জিজ্ঞেস করলে–কে আপনি?
লোকটা বললে–আমি চৌধুরী মশাইএর সঙ্গে দেখা করতে এসেছি–
চৌধুরী মশাই বললেন–আমি চৌধুরী মশাই–
লোকটা বললে–আপনার সঙ্গে আমার একটা কথা ছিল, কথাটা আমি সকলের অসাক্ষাতে বলতে চাই–
চৌধুরী মশাই এমনিতেই বিরক্ত হয়ে ছিলেন, তার ওপর আগন্তুকের কথায় মেজাজ আরো ক্ষুব্ধ হয়ে গেল। বললেন–আপনি কোত্থেকে আসছেন?
প্রকাশও সঙ্গে সঙ্গে বললো, আগে বলুন কোত্থেকে আসছেন? বলা নেই, কওয়া নেই অমনি দেখা করলেই হলো? যা বলতে চান সকলের সামনেই বলুন। তা বুঝতে পেরেছি, বিয়ের কথা বলতে এসেছেন তো?
লোকটা কেমন হয়ে গেল। বললে–বিয়ে? কার বিয়ে?
প্রকাশ বললে–হ্যাঁ, চৌধুরী মশাই-এর বিয়ে। আপনি চৌধুরী মশাই-এর বিয়ের সম্বন্ধ এনেছেন তো? তা আমি বলে দিচ্ছি আমার জামাইবাবু বিয়ে করবেন না। সম্পত্তির লোভে আপনারা সবাই চৌধুরী মশাইএর বিয়ে দিতে চান, সে আমরা জানি, তা সে আমরা হতে দেব না। আমি চৌধুরী মশাইএর শালা, আমার নাম প্রকাশ রায়, আমাকে না জিজ্ঞেস করে চৌধুরী মশাই বিয়ে করবেন না–
লোকটা বললে–না, আমি সে কথা বলতে আসিনি–
–তাহলে—
চৌধুরী মশাই বললেন–তুমি চুপ করো না প্রকাশ, তোমার অত কথা বলবার দরকার কী? উনি এসেছেন আমার সঙ্গে কথা বলতে, যা বলতে হয় আমি বলবো, তুমি কে?
প্রকাশ বললে–তা সেইজন্যেই তো আমি আপনাকে একা ছেড়ে কোথাও যাই না, শেষকালে কে আপনাকে ঠকিয়ে আপনার বিয়ে দিয়ে দেবে, তখন তো আপনিই হায় হায় করবেন। সুলতানপুরের অশ্বিনী ভট্টাচার্যিটা তো আপনাকে প্রায় গেঁথেই ফেলেছিল, আমি না থাকলে ছাড়া পেতেন?
প্রাণকৃষ্ণ সা’ মশাই-এর সময়ের দাম আছে। বাজে কাজে সময় নষ্ট হচ্ছিল বলে এতক্ষণ খুঁতখুঁত করছিল। এবার প্রকাশের দিকে চেয়ে বললে–তুমি বাবাজী একটু চুপ করো না, ভদ্রলোককে যা বলবার বলতে দাও না–
লোকটি এবার বললে–কালীকান্ত ভট্টাচার্য আপনার বেয়াই ছিলেন তো?
চৌধুরী মশাই বললেন–হ্যাঁ, তা তিনিই কি আপনাকে পাঠিয়েছেন?
–না, তিনি আর কী করে পাঠাবেন, তিনি এক বছর আগে মারা গেছেন—
–মারা গেছেন?
–আজ্ঞে হ্যাঁ। তিনি ছিলেন আমার মাস্টার মশাই, তাঁর মেয়ে নয়নতারার সঙ্গে আপনার ছেলের বিয়ে হয়েছিল তো?
নয়নতারা নাম উল্লেখের সঙ্গে সঙ্গে যেন আবহাওয়াটা গরম হয়ে উঠলো। চৌধুরী মশাই এতক্ষণে লোকটির দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে চেয়ে দেখলেন।
বললেন–আপনার নাম?
লোকটা বললে–আমার নাম নিখিলেশ বন্দ্যোপাধ্যায়–
প্রকাশ এতক্ষণে চিনতে পারলে। বললে–ও, আপনাকে তো আমি চিনি মশাই, আপনি ছিলেন বেয়াই মশাইএর ডান হাত। তাই বলুন! তা আপনি হঠাৎ কী উদ্দেশ্যে?
লোকটি বললে–নয়নতারার বিয়ের সময় মাস্টার মশাই মেয়েকে প্রায় আট-দশ হাজার টাকার গয়না দিয়েছিলেন। আপনার পুত্রবধূকে আপনারা বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন, কিন্তু সেই গয়নাগুলো তো তার সঙ্গে দেননি। নয়নতারার পক্ষ থেকে আমি এখন সেইগুলো দাবী করতে এসেছি–
এর চেয়ে সামনে যদি হঠাৎ বিনা মেঘে বজ্রপাত হতো তাতেও বুঝি চৌধুরী মশাই এত চমকে উঠতেন না।
কিন্তু প্রকাশ রায় সহজে কিছু সহ্য করবার লোক নয়। জবাবটা দিলে সে। বললে– নয়নতারার গয়না? আপনি বউমার গয়না চাইতে এসেছেন?
নিখিলেশ বললে—হ্যাঁ–
–আপনার লজ্জা করলো না সেই গয়না চাইতে? যে বউ এই বংশের কুলে কালি দিয়েছে তার নাম করতে লজ্জা হলো না আপনার? আপনি আবার সেই গয়না বাড়ি বয়ে চাইতে এসেছেন?
নিখিলেশ বললে–আমি তো কিছু অন্যায় দাবী করিনি, যে-গয়না তার বাপের বাড়ি থেকে দেওয়া হয়েছিল শুধু সেই গয়নাগুলোই চাইতে এসেছি। যখন সে আপনাদের বাড়ি থেকে চলে যায় তখন তো সঙ্গে কিছুই নিয়ে যায়নি সে। সব কিছু এখানেই রেখে গিয়েছিল আর আপনারাও তাকে কিছু গয়না পরে যেতে দেননি–
