.
শেষ পর্যন্ত সেদিন প্রকাশের হাঁক-ডাকে পাড়ার লোকজন এসে জড়ো হয়েছিল। বেহারি পাল মশাই এসেছিল, তারক চক্রবর্তী মশাই এসেছিল। নিতাই হালদারের মাচার ওপর বসে যারা অনেক রাততির পর্যন্ত তাস খেলছিল তারাও শালাবাবুর চেঁচানি শুনে হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ে এসেছিল।
সে এক ভয়ঙ্কর কাণ্ড ঘটে গিয়েছিল সেদিন সেই চৌধুরীবাড়িতে।
শেষকালে দরজা শাবল মেরে ভাঙা হলো। ননী ডাক্তার এল। কদিন ধরে ওষুধ খেয়ে তবে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে উঠলেন চৌধুরী মশাই।
প্রকাশ জিজ্ঞেস করলে–কী হয়েছিল আপনার জামাইবাবু? অমন করে চেঁচিয়ে উঠেছিলেন কেন?
বেহারি পাল, তারক চক্রবর্তী, তারাও সবাই জিজ্ঞেস করলে–কিছু ভয় পেয়েছিলেন নাকি?
কিন্তু চৌধুরী মশাই কারোর কোনও কথার জবাব দিলেন না। তিনি যে সেদিন কাকে পালকি চড়ে আসতে দেখেছিলেন, কাকে দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন তাও কাউকে বললেন না। তিনি আপন মনেই সেই সেদিনকার ঘটনাটা নিয়ে ভাবতে লাগলেন। যতই ভাবতে লাগলেন ততই তাঁর ভয় করতে লাগলো। মনে হলো যেন তাঁর সমস্ত সম্পত্তি একটা ভারি জগদ্দল পাথর হয়ে তাঁর বুকের ওপর চেপে বসেছে। সে-বোঝা তিনি বুক থেকে আর কিছুতেই নামাতে পারছেন না।
সাতদিন পর বিছানা ছেড়ে উঠলেন। হাতের কাছে দলিল-দস্তাবেজগুলো ছিল, সেইগুলো নিয়েই তাঁর দুর্ভাবনা ছিল খুব। কাউকে বিশ্বাস নেই সংসারে। এই-গুলোর ওপরেই সকলের নজর। যতক্ষণ না সেটা তিনি প্রাণকৃষ্ণ সা’মশাই-এর হাতে দিতে পারছেন ততক্ষণ যেন নিশ্চিন্ত হতে পারছেন না।
প্রকাশকে একদিন জিজ্ঞেস করলেন–সা’ মশাই আসেননি?
প্রকাশ বললে–হ্যাঁ জামাইবাবু, এসেছিল, আপনার তখন অসুখ, আপনি অসুখে পড়েছিলেন, তাই চলে গেলেন। আবার আসবেন বলে গেছেন–
চৌধুরী মশাই বললেন–আর একবার ডাকো তাকে, ডেকে পাঠাও–
প্রাণকৃষ্ণ সা’ মশাই বহুদিনের আড়তদার। কর্তাবাবুর আমল থেকে লেনদেন আছে এ বংশের সঙ্গে। যখনই কারবারে কাঁচা টাকার তার দরকার হতো কর্তাবাবুর কাছে আসতো। কর্তাবাবুর কাছে টাকা নিতে আসতো।
সেই সা’ মশাই সেদিন এল। সা’ মশাই আসতেই চৌধুরী মশাই প্রকাশকে বললেন–তুমি ঘর থেকে একবার বেরিয়ে যাও প্রকাশ–
প্রকাশ কেমন থতমত খেয়ে গেল। বললে–আমি ঘর থেকে বেরিয়ে যাবো?
–হ্যাঁ, বেরিয়ে যাবে।
প্রকাশ তবু বুঝতে পারলে না। বললে–কেন বেরিয়ে যাবো জামাইবাবু, শেষকালে যদি কোনও দরকার-টরকার পড়ে?
চৌধুরী মশাই বললেন–না, তোমাকে আমার কোনও দরকার পড়বে না, তুমি এখন ঘর থেকে বেরিয়ে যাও–
প্রকাশ বললে–কিন্তু যদি আবার অজ্ঞান-টজ্ঞান হয়ে যান তখন কে দেখবে? তার চেয়ে বরং আমি থাকি—
চৌধুরী মশাই আর থাকতে পারলেন না, সোজা দাঁড়িয়ে উঠে তেড়ে গেলেন। বললেন–তুমি বেরোও বলছি, আগে বেরোও–
তবু প্রকাশ নড়ে না। বললে–আজ্ঞে আমি থাকলে দোষটা কী? আমি তো কিছু করছি না?
চৌধুরী মশাই প্রকাশের গালে ঠাস করে একটা চড় কষিয়ে দিলেন। বললেন–যত কিছু বলি না, তত তোমার বড় বাড় হয়েছে। বার বার বলছি বেরিয়ে যাও তবু থাকতে চাও এখানে! কেন? আমার সব জিনিস তোমার জানবার দরকার কী? সা’ মশাই-এর সঙ্গে যদি আমার দরকারী কথা থাকে তো তাও তোমায় শুনতে হবে?
চড় খেয়ে প্রকাশের তখন চোখে জল এসে গিয়েছিল। বিশেষ করে সা মশাই-এর সামনে চড় খেলে চোখে জল তো আসবেই। সেই অবস্থায় চোখের জল ফেলতে ফেলতে বলতে লাগলো আমাকে আপনি চড় মারলেন জামাইবাবু? আজ দিদি থাকলে আমার এত অপমান সইতে হতো না–দিদি নেই বলেই……
চৌধুরী মশাই ধমক দিলেন–থামো তো, দিদির কথা আর তুলো না। তোমার জন্যেই তো দিদি মারা গেল। তুমিই তো যতো নষ্টের গোড়া–
–আমার জন্যে দিদি গেল? আমি যত নষ্টের গোড়া? আপনি বলছেন কী জামাইবাবু? প্রাণকৃষ্ণ সা’ মশাই টাকাকড়ির লেন-দেন নিয়ে কথা বলতে এসেছিল। এই সব ঝগড়া বাগবিতণ্ডার মধ্যে তাকে পড়তে হবে তা ভাবতে পারেনি।
কথার মাঝখানেই বললে–কেন আর ও-সব নিয়ে কথা কাটাকাটি করছেন চৌধুরী মশাই, ও সব কথা এখন বন্ধ করুন না–
চৌধুরী মশাই বললেন–দেখুন না কত বড় শয়তান, আমার ছেলেকে ওই প্রকাশই ছোটবেলা থেকে বিগড়ে দিয়েছে। ওর জন্যেই তো সদানন্দ অমন করে বিগড়ে গেল–
প্রকাশ বলে উঠলো–আমি বিগড়ে দিলুম না আপনারা বিগড়ে দিলেন? আপনি আর কর্তাবাবু
–তুমি থামো, তুমি আর কথা বলো না। বেছে বেছে অমন বউকে কে আনলে শুনি? আমি, কর্তাবাবু, না তুমি? তুমি যদি অমন বউ ঘরে না আনতে তাহলে তোমার দিদি অমন করে মারা যায়? এই নবাবগঞ্জের এই বাড়ি এমন করে শ্মশান হয়ে যায়? দেখছো না এ বাড়ি কী হয়েছে? নইলে আমি এই সম্পত্তি জলের দরে বিক্ৰী করি? এই তো সা’ মশাই তো সবই জানেন, আপনিই বলুন, আপনি তো বরাবর সবই দেখে আসছেন সা’ মশাই, বলুন আপনি।
তারপরে একটু থেমে আবার বলতে লাগলেন–জানেন সা’ মশাই, ছোটবেলা থেকে এ ছেলেটাকে কোথায় কোথায় নিয়ে যেত, কোথায় রাণাঘাট, কোথায় কেষ্টনগর, কোথায় কলকাতা, সেই সব দেখেই তো সে বিগড়ে গেল–
প্রকাশ বললে–বা রে, বা, এখন সব দোষ হলে আমার–
–তা তোমার দোষ হবে না তো দোষ হবে আমার? তুমি বেছে বেছে ওই বউ ঘরে আনোনি? তুমি বলোনি যে ওই বউ আনলে সদানন্দ সংসারী হবে, বউএর রূপ দেখে সব ভুলে যাবে? বলোনি তুমি?
