বেহারি পাল জিজ্ঞেস করলে–সদানন্দর খবর কিছু পেলে নাকি তোমরা?
প্রকাশ বললে–না না, সে বেঁচে নেই আর–
–বেঁচে নেই মানে?
বেহারি পাল প্রকাশের কথা বলার ভঙ্গি দেখে ক্ষুণ্ণ হলো। এমন করে কেউ কথা বলে?
বললে–-বেঁচে নেই মানে কী? খোঁজখবর কিছু নিয়েছ তোমরা?
প্রকাশ মামা বললে–খোঁজখবর আর নেব কী? মারা গেলে কি কারো খোঁজখবর পাওয়া যায়?
–তা জলজ্যান্ত মানুষটা মারা গেলে খোঁজখবর পাওয়া যাবে না? পুলিসের খাতাতেও তো একটা হিসেব থাকবে তার!
প্রকাশ বললে–পুলিশের কাছে কি খোঁজখবর নিইনি ভাবছেন? আমি কলকাতায় নিজে গিয়ে ছ’মাস কাটিয়েছি, পুলিসের পেছনে হাজার হাজার টাকা খরচ করেছি, কোনও ফায়দা হয়নি। এখন আমিই বা কী করবো আর জামাইবাবুই বা কী করবে?
–আর নয়নতারা?
প্রকাশ বললে–তার আর নাম করবেন না আপনি। আমারই ঘাট হয়েছিল, অমন মেয়েকে এ বাড়ির বউ করে আনা। সেই অলক্ষুণে বউ এসেই তো সব লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে গেল। নইলে জামাইবাবুরও এই দশা হতো না, আর দিদিও এমন বেঘোরে মারা যেত না
একজন বললে–তাহলে তো শালাবাবু, আপনারই পোয়া বারো। চৌধুরী মশাই-এর সব সম্পত্তি এখন আপনারই কব্জায়–
–আরে দূর! আমার কি তেমনি কপাল?
বেহারি পাল জিজ্ঞেস করলে–কেন বাবাজী! তুমি ছাড়া তো চৌধুরী মশাই-এর আর কেউ ওয়ারিশ রইল না!
প্রকাশ বললে–সে তো রইল না জানি। সেই জন্যেই তো জামাইবাবুকে কোথাও ছাড়ি না। কিন্তু শত্তুরের তো আর অভাব নেই মশাই। তারা যে সব তলে তলে অন্য মতলব ভাঁজছে!
–কী মতলব?
প্রকাশ বললে–সুলতানপুরের লোকদের তো চেনেন না, এমন নির্লজ্জ লোক সব, নিজের আইবুড়ো মেয়েদের সব জামাইবাবুর কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছে, পাঠিয়ে তাদের দিয়ে জামাইবাবুর পা টিপে দেওয়াচ্ছে, তা জানেন? আমি ভাগ্যিস ছিলুম তাই রক্ষে–
কেন? কিসের জন্যে পা টেপাচ্ছে? টাকার জন্যে? চৌধুরী মশাইকে খোসামোদ করবার জন্যে?
–আরে না, আমার জামাইবাবুকে জামাই করবার জন্যে!
–তা ছোটমশাই-এর তো আর মতিভ্রম হয়নি!
প্রকাশ বললে–মতিভ্রম এখনো না-হয় হয়নি। কিন্তু হতেই বা কতক্ষণ? আপনারা পুরুষমানুষ হয়ে এই কথা জিজ্ঞেস করছেন? পুরুষ হল পুরুষ, পুরুষ মানুষ কখনও বুড়ো হয়?
সবাই কথাটা বুঝলো। তা বটে! বিয়ে করতে আর কতক্ষণ লাগে? বিয়ে একটা করে ফেললেই হলো। টাকার যখন অভাব নেই তখন কনেরও অভাব নেই কোথাও।
তা প্রকাশ সেই জন্যেই চৌধুরী মশাই-এর কাছ ছাড়ে না। সব সময় সঙ্গে সঙ্গে থাকে। সুলতানপুর থেকে চৌধুরী মশাই একলাই আসতে চেয়েছিলেন কিন্তু প্রকাশ ছাড়েনি। জামাইবাবুকে এক মিনিট কাছছাড়া করতে ভয় লাগে প্রকাশের। বলে-সম্পত্তির লোভ বড় লোভ হে, ওতে লঘু-গুরু বিচার থাকে না।
চৌধুরী যখন একলা থাকেন তখন হিসেব নিয়ে বসেন। তখন প্রকাশকেও ঘরের ভেতর ঢুকতে দেন না। তখন আর কাউকেই বিশ্বাস করেন না তিনি। দরজা বন্ধ ঘরের ভেতর বসে বসে কেবল হিসেব করেন। কত বিঘে বাগান আর কত বিঘে ধান-জমি আর কত বিঘে বিল। আর বসতবাড়িটারও আলাদা একটা দলিল বার করেন। বসতবাড়িটার দামও কম করে তিরিশ চল্লিশ হাজার টাকা। প্রাণকৃষ্ণ সা রেলবাজারের আড়তদার। তার সঙ্গেই লেন-দেনের কথাবার্তা চলছিল। তিন লাখ যদি পেয়ে যান তাহলে আর পীড়াপীড়ি করবেন না তিনি। যা পাওয়া যায়। এখানে না থাকলে একটা পয়সাও পাওয়া যাবে না। এখানকার তিন লাখ আর সুলতানপুরের সাত। এই পুরো দশ লাখ টাকা ব্যাঙ্কে রেখে দেবেন তিনি! আর বাকি রইল সোনা-দানা। তারও একটা মোটা দাম আছে। সবটা নিজের কাছে রাখা নিরাপদ নয়। কেউ বিষ খাওয়াতে পারে। পৃথিবীতে কাউকে বিশ্বাস নেই।
সেদিন হিসেব করতে করতে অনেক রাত হয়ে গেল। চৌধুরী মশাই সা’ মশাইকে খবর দিয়েছেন। সকাল বেলাই আসবে। তার আগে দলিলপত্র ঠিক করে রাখছিলেন। রাত তখন অনেক। প্রকাশ বাইরের বারান্দায় শুয়ে অঘোরে ঘুমোচ্ছে।
হঠাৎ বারবাড়ির সদরের দিকে নজর পড়তেই মনে হল সদর দরজা ঠেলে একটা পালকি এসে ঢুকলো। চার বেহারার পালকি। পালকিতে এত রাত্রে কে এল!
চৌধুরী মশাই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে চেয়ে দেখলেন।
পালকি থেকে কে একজন ঘোমটা-দেওয়া চেহারা নামলো। নেমে হাঁটতে হাঁটতে ভেতরবাড়িতে ঢুকলো। আর তাকে দেখা গেল না। তারপর সিঁড়িতে তার পায়ের শব্দ পাওয়া গেল! সিঁড়ি দিয়ে ওপরে দোতলায় উঠেছে। তারপর একেবারে তাঁর জানলার সামনে। ঘোমটার ভেতরে মুখখানার দিকে চেয়ে যেন চেন-চেনা মনে হলো।
তিনি জিজ্ঞেস করলেন–কে?
মেয়েলী গলায় উত্তর এল–আমি কালীগঞ্জের বউ–
কালীগঞ্জের বউ শব্দটা শুনতেই চৌধুরী মশাই-এর মুখ দিয়ে অস্ফুট একটা আওয়াজ বেরিয়েই তিনি অচৈতন্য হয়ে সেখানে পড়ে গেলেন। কিন্তু তাঁর পড়ার শব্দটা প্রকাশের কানে গেছে। ঘুমন্ত অবস্থাতেই তার মনে হলো যেন অশ্বিনী ভট্টাচার্য তাকে লুকিয়ে জামাইবাবুর সঙ্গে কথা বলতে এসেছে। আসতে গিয়ে চৌকাঠে পা লেগে হোঁচট খেয়েছে—
প্রকাশ সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে উঠছে–তবে রে শালা অশ্বিনী, তুই এখেনেও আমাকে জ্বালাতে এসেছিস?
কিন্তু না, স্বপ্নের ঘোরটা কেটে যেতেই দেখলে জামাইবাবু অজ্ঞান হয়ে মেঝের ওপর শুয়ে পড়ে আছে।
প্রকাশ চিৎকার করে ডাকতে লাগলো–জামাইবাবু, ও জামাইবাবু কী হয়েছে আপনার? অমন করে শুয়ে পড়ে আছে কেন? জামাইবাবু—
