খোকন বলে–আমি গান শিখেছি মা–
–ওমা তাই নাকি? কই গাও দিকি?
প্রকাশও উৎসাহ দিলে ভাগ্নেকে। বললে–গাও গাও, গেয়ে শোনাও মাকে, শোনাও–
খোকন দু’হাত তুলে এঁকে-বেঁকে নাচতে শুরু করে দিলে। তারপর গান গাইতে আরম্ভ করলে–
আগে যদি প্রাণসখি জানিতাম
শ্যামের পীরিত গরল মিশ্রিত
করো মুখে যদি শুনিতাম
কুলবতী বালা হইয়া সরলা
তবে কি ও বিষ ভখিতাম।।
গান শুনে ভেতরবাড়ি থেকে আরো অনেকে দৌড়ে এসেছিল। গৌরী পিসী ছেলের বুদ্ধি দেখে আর থাকতে পারলে না। একেবারে দুই হাতে খোকনকে কোলে তুলে মুখময় চুমু খেতে লাগলো। বললে–ওমা, কী চমৎকার গলা খোকন-মণির, বড় হলে খোকন আমাদের বড় গাইয়ে হবে বউদি–
আরো যারা দেখছিল তারাও সবাই একবাক্যে ধন্য-ধন্য করতে লাগলো!
অহঙ্কারে তখন শালাবাবুর বুক দশ হাত হয়ে গেছে। বললে–এবার সেই গানখানা গাওতো খোকন, সেই যেখানা আমি শিখিয়েছি।
–কোন্ গানটা?
–সেই যে–আর নারীরে করিনে প্রত্যয়—
খোকন গাইতে লাগল–
আর নারীরে করিনে প্রত্যয়
নারীর নাইকো কিছু ধর্মভয়
নারী মিলতে যেমন ভুলতে তেমন
দুই দিকে তৎপর
মজিয়ে পরে চায় না ফিরে
আপনি হয় অন্তর—
শালাবাবু নিজেই গানের তারিফ করতে লাগলো। বললে—বাঃ বাঃ বাঃ—
কিন্তু হঠাৎ হরনারায়ণ ঘরে ঢুকলেন। বললেন–কে গান গাইছিল, খোকা না?
শালাবাবু বললে–হ্যাঁ জামাইবাবু,আপনি আর একবার শুনবেন গানটা?
হরনারায়ণ বললেন–না, ও সব গান ওকে কে শিখিয়েছে?
শালাবাবু বললে–কবির গান শুনতে নিয়ে গিয়েছিলুম, সেখানে শিখেছে। কী ইটেলিজেন্ট হয়েছে খোকন দেখেছেন! একবার মাত্তোর গানটা শুনেছে, আর সঙ্গে সঙ্গে সুরটা মুখস্থ করে ফেলেছে। আমি তো জামাইবাবু আমার বাপের জন্মে এমন ইনটেলিজেন্ট ছেলে দেখি নি, ভেরি ভেরি ইনটেলিজেন্ট বয়–
প্রকাশের সামনে হরনারায়ণ কিছু বললেন না বটে, কিন্তু রাত্রে শোবার ঘরে এসে স্ত্রীর কাছে মুখ খুললেন। বললেন–খোকনকে কি তুমি প্রকাশের সঙ্গে কবির লড়াই শুনতে পাঠিয়েছিলে?
প্রীতিলতা প্রশ্নটা শুনে একটু অবাক হয়ে গেল। বললে–কেন বলো তো?
–না, তাই জিজ্ঞেস করছি। যে-সব গানগুলো খোকন গাইছিল, এগুলো তো খুব ভালো গান নয়। বাবা শুনলে রাগ করবেন। খোকনকে আর যার-তার সঙ্গে যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়াতে দেওয়া ঠিক নয়। অভ্যেস খারাপ হয়ে যাবে–
প্রীতিলতা বললে–কীসের অভ্যেস?
–ওই সব বাজে গান গাওয়ার অভ্যেস।
প্রীতিলতা বললে–ছেলেমানুষ গান শুনেছে আর শিখে ফেলেছে, এতে অভ্যেস খারাপ হবার কী আছে? তোমার সবতাতেই বাড়াবাড়ি। ছেলেমানুষ একটু গান গাইলেই দোষ?
হরনারায়ণ এর পরে আর ও-বিষয়ে কোনও কথা বললেন না। আর তা ছাড়া এ নিয়ে মাথা ঘামানোর মত বেশি সময়ও ছিল না তার। কিন্তু মনে মনে কেমন যেন, চিন্তিত হলেন।
সেদিন খোকনের আর একটা বুদ্ধির অকাট্য প্রমাণ দিলে প্রকাশ। দিদির কাছে খোকনকে নিয়ে এসে বললে–উঃ, তোমায় কী বলবো দিদি! খোকন একটা জিনিয়াস হবে নির্ঘাত, দেখে নিও–
দিদি বুঝতে পারলে না। বললে–জিনিয়াস! তার মানে?
–মানে একটা ধুরন্ধর প্রতিভা।
–কেন, আবার কী করেছে?
–আরে কৈলাস গোমস্তার হুঁকোটো ছিল চণ্ডীমণ্ডপে, কলকেতে তখনও আগুন জ্বলছে। ও একটানে হুঁকো থেকে ধোঁয়া টেনে নাক দিয়ে বার করে ছেড়েছে—
দিদিও অবাক ছেলের বুদ্ধির বহর দেখে। বললে–তাই নাকি?
–হ্যাঁ দিদি, আমি কাণ্ড দেখে তো অবাক। আমি এই বলে দিচ্ছি দিদি, এ ছেলে তোমার বংশের নাম রাখবে, এমন বুদ্ধি আমি বাপের জন্মে কারো দেখি নি, সত্যি–
দিদি খোকনের দিকে চেয়ে বললে–হ্যাঁ রে খোকন, তোর কাশি হলো না?
খোকন ঘাড় নাড়লে। বললে—না–
বলিস কী? একটুও কাশি হলো না?
খোকন গর্বের সঙ্গে ঘাড় নেড়ে আবার বললে—না–
গৌরী পিসীও এসে দাঁড়িয়েছিল। সেও শুনে বললে–না বউদি, আমি তোমাকে বলেছিলুম এ ছেলে তোমার একটা কেষ্ট-বিষ্টু না হয়ে যায় না
রাত্রে হরনারায়ণ ঘরে আসতেই প্রীতি বললে–ওগো, খোকনের কী বুদ্ধি জানো?
হরনারায়ণ বললেন–কী?
–আজকে গোমস্তা মশাইএর হুঁকো টেনে খোকন নাক দিয়ে গল্-গল্ করে ধোঁয়া ছেড়েছে, একটুও কাশে নি!
খোকন পাশেই ছিল। সেও বাবার দিকে চেয়ে বললে–হ্যাঁ বাবা, আমি একটুও কাশি নি–
হরনারায়ণ কথাটা শুনে কিন্তু হাসতে পারলেন না। আরো গম্ভীর হয়ে গেলেন। স্ত্রীর দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করলেন–কে ওকে হুঁকোয় মুখ দিতে বলেছিল?
স্ত্রী বললে–কে আবার বলবে, ও নিজেই মুখ দিয়েছে।
–কিন্তু ওর সঙ্গে কেউ ছিল?
স্ত্রী বললে–হ্যাঁ, প্রকাশ সঙ্গে ছিল, সে সাক্ষী আছে, সে নিজের চোখে দেখেছে–
হরনারায়ণ এ-কথার কোনও উত্তর দেওয়া দরকার মনে করলেন না। তবে আরো যেন চিন্তিত হয়ে পড়লেন। পরের দিনই কেষ্টগঞ্জের স্কুলের হেডমাস্টার মশাইকে বাড়িতে ডেকে পাঠালেন।
এই সেই প্রকাশ রায়। এককালে এই প্রকাশ রায় যখন-তখন হুট করে এই নবাবগঞ্জে আসতো। আসতো আর নবাবগঞ্জের মানুষজনদের কাছে রাজা-উজির মারতো। ভাগ্নেকে নিয়ে যাত্রা শুনতে যেত, কবির গান শুনে তারিফ করতো। ভাগ্নেকে গান শেখাতো, তামাক খেতে তালিম দিত। তা সে-সব অনেক দিন আগেকার কথা। তারপর সেই নরনারায়ণ চৌধুরী মারা গেলেন, সেই দিদিও আর নেই। আর সেই ভাগ্নে সদানন্দও তখন নেই। ছিল মাত্র এক জামাইবাবু, এবার সেই জামাইবাবুও চলে গেল। প্রকাশ রায়ের সময় এখন খারাপ পড়েছে। সেই খারাপ-সময়ের সুরাহা করতেই প্রকাশ রায় আবার এসেছে রেলবাজারে।
