সদানন্দ শালপাতাটার খাবারটা নিয়ে তখনও বসে ছিল। খুব ক্ষিদে পেয়েছিল তার। কিন্তু মুখ-হাত-পা ধোওয়া হয় নি। মুখে-হাতে-পায়ে জল দিতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু জল কোন্ দিকে? উঠোনের মধ্যে কোথাও নিশ্চয় কল আছে।
বাইরে উঠোনে বেরিয়ে সদানন্দ কল খুঁজতে লাগলো। অনেক শালপাতার খালি ঠোঙা উঠোনে ছড়ানো রয়েছে। একজন লোককে দেখে সদানন্দ জিজ্ঞেস করলে জলের কলটা কোন্ দিকে?
–ওই যে ওদিকে—
বলে লোকটা বাইরের দিকে দেখিয়ে দিলে।
ধর্মশালা বাড়িটা অদ্ভুত। কত রকমের লোক আসছে, আবার ভেতরে থেকে বাইরে যাচ্ছে। কেউ যেন কাউকে চেনে না, চেনবার চেষ্টাও করে না। সে যে একজন অচেনা লোক এখানে এসেছে তাতেও কারো যেন মাথাব্যথা নেই। উঠোনের মধ্যে দিয়ে পার হয়ে সদানন্দ একেবারে সদরের মস্ত বড় গেটটার কাছে এসে দাঁড়ালো। কোথায়? এদিকে কল চৌবাচ্চা কোথায়? কোন্ দিকে?
হঠাৎ সামনের দিকে নজর পড়তেই সদানন্দ দেখলে একজন মেয়ে-ভিখিরি কোলে একটা ঘুমন্ত ছেলে নিয়ে তার হাতের শালপাতাটার দিকে হাঁ করে একদৃষ্টে চেয়ে আছে।
কেমন এক রকমের একটা অদ্ভুত অনুভূতি হলো সদানন্দর। মেয়ে-ভিখিরিটার পাশে আরো অনেকে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের দৃষ্টিও ওই শালপাতাটার দিকে।
–বাবুজী–
একটা কাতর অস্পষ্ট শব্দ। কিন্তু সামান্য শব্দটা যেন আর্তনাদ হয়ে সদানন্দর কানে এসে বাজলো। আর সঙ্গে সঙ্গে সদানন্দ শালপাতাটা তার দিকে এগিয়ে দিলে। মেয়ে-ভিখিরিটা তার ছেঁড়া শাড়ির আঁচলটা পাততেই সদানন্দ তার ভেতরে পুরি-তরকারি সুদ্ধ ফেলে দিলে।
.
কিন্তু নবাবগঞ্জ তো আর কলকাতা নয়। আর কলকাতা যেমন নয় তেমনি আবার সুলতানপুরও নয়। সদানন্দর জীবনে একদিন এই কলকাতা, নবাবগঞ্জ আর সুলতানপুর যেন একাকার হয়ে গিয়েছিল। এতদিন পরে এই বয়েসে ভাবতে গিয়ে বড় অবাক লাগতে লাগলো তার। সেদিন কি সদানন্দ ভাবতে পেরেছিল তার একটা জীবন এতগুলো জায়গা আর এতগুলো মানুষকে ঘিরে গড়ে উঠবে! যে-সমরজিৎবাবুকে দেখে সে অবাক হয়ে গিয়েছিল, তার চেয়েও অবাক হবার মত মানুষ যে তাকে ভবিষ্যতে আরো দেখতে হবে তাই কি সে জানতো!
কতদিন ওই শেয়ালদা স্টেশন থেকে সে ট্রেনে উঠে সুলতানপুরে গেছে। কতদিন নৈহাটি গেছে, কতদিন আবার নবাবগঞ্জে গিয়েছে। একটা জীবনে সে কত অসংখ্য মানুষের জীবন দেখতে পেয়েছে। তার একটা জীবনে কত অসংখ্য মানুষের জীবনের ছায়া পড়েছে তারই কি কোনও সীমা-পরিসীমা আছে। এক-এক সময় ভাবলে অবাক হয়ে যেতে হয়, যে-উদ্দেশ্য নিয়ে সে নিজের জন্মভূমি পরিত্যাগ করেছিল, যে-স্বপ্ন নিয়ে সে নয়নতারাকেও ত্যাগ করেছিল, সে-উদ্দেশ্য কি তার সার্থক হয়েছে? এই চৌবেড়িয়ার রসিক-পাল মশাই এর অতিথিশালায় পড়ে থাকবার জন্যেই কি সে এত কষ্ট স্বীকার করেছে? পৃথিবী কি তার কথা শুনেছে? পৃথিবীর মানুষ কি তার মনের মত মানুষ হয়েছে? নবাবগঞ্জের মানুষের জন্যে যে সে এত কিছু করেছে তা কি সার্থক হয়েছে? সদানন্দর জন্যেই নবাবগঞ্জের লোক হাসপাতাল পেয়েছে, স্কুল পেয়েছে, তা কি কিছুই নয়? সদানন্দর জন্যেই যে নয়নতারার সংসারের দারিদ্র ঘুচেছে সেটাও কি কিছু নয়?
আর তার বাবা, নবাবগঞ্জের চৌধুরী মশাই?
শেষজীবনে যে তাঁর কষ্টভোগ হয়েছিল তার জন্যেও কি সদানন্দ দায়ী?
একদিন নবাবগঞ্জের সবাই দেখলে চৌধুরী মশাই আবার এসে হাজির। তাঁর আগেকার সে চেহারা আর নেই। সাইকেল-রিকশাটা আবার বারোয়ারিতলা দিয়ে এসে বাড়ির ভেতরে ঢুকলো। সঙ্গে প্রকাশ মামা।
প্রকাশ বাড়ির ভেতরে নেমে দরজার চাবিগুলো একে-একে খুলতে লাগলো। তারপর দোতলার সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে দোতলার ঘরের চাবিটাও খুলে ফেললে। ধুলোয় ঘর ভর্তি হয়ে গিয়েছিল। ঘর ঝাঁট দিয়ে তবে বসবাসের যোগ্য হলো।
খবর পেয়ে বেহারি পাল মশাই এল। মুখোমুখি দেখা প্রকাশের সঙ্গে।
–কে? পাল মশাই না? কেমন আছেন সব আপনারা?
বেহারি পাল বললে–চৌধুরী মশাই এসেছেন শুনলাম—
প্রকাশ বললে–হ্যাঁ জামাইবাবু এসেছে–
–তা খবর সব ভালো তো?
একে-একে আরো সবাই এল। বুড়ো তারক চক্রবর্তীর কাছেও খবরটা গিয়েছিল। তিনিও খোঁড়াতে খোঁড়াতে এলেন। বহুকালের পুরোন সব লোক। সকলের বয়েস হয়েছে। পুরোন লোক দেখলেই পুরোন স্মৃতি সব মনে পড়ে যায়। একদিন এই বাড়িতেই চৌধুরী মশাই-এর ছেলে সদানন্দর বিয়েতে সবাই দল বেঁধে নেমন্তন্ন খেয়ে গেছে। কর্তাবাবুর শ্রাদ্ধেও খাওয়া-দাওয়া করেছে। চৌধুরী গিন্নী এখানেই মারা গিয়েছে। তাতে অবশ্য তেমন ঘটা হয় নি। কিন্তু সব চেয়ে যে-ঘটনাটা সকলের মনে দাগ কেটে আছে সেই নয়নতারার ব্যাপার। এতদিন পরে ছোটমশাই-এর আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে যেন আবার সবাই-এর পুরোন কথাগুলো নতুন করে মনে পড়তে লাগলো।
ক’দিন ধরেই নানা লোক আসা-যাওয়া করতে লাগলো। কিন্তু চৌধুরীমশাই কারো সঙ্গেই দেখা করলেন না। প্রকাশ মামাও জামাইবাবুর সঙ্গে কাউকে দেখা করতে দিলে না।
সে সকলকেই বললে–না, দেখা হবে না। জামাইবাবুর শরীর খারাপ।
একজন বললে–তা এতদিন পরে চৌধুরী মশাই এলেন, একবার চোখের দেখাও দেখতে পাবো না শালাবাবু?
প্রকাশ বললে–না, আমি সকলের মতলব বুঝতে পেরেছি–
–মতলব আবার কী থাকতে পারে শালাবাবু! গাঁয়ের জমিদার গাঁয়ে এসেছে। তাঁকে একবার পেন্নাম করে চলে যাবো, তাও হবে না?
