কলকাতা একটার পর একটা অনেক বিপর্যয় দেখেছে। কিন্তু ১৯৪৭ সালের পর থেকে যে-বিপর্যয় দেখতে শুরু করলো তার বুঝি আর তুলনা নেই। তখন কেবল শুরু হলো ভাঙার ইতিহাস। রাস্তায় তখন একবার গর্ত হলে আর সে গর্ত মেরামত হয় না। ভিড়ের জ্বালায় তখন মানুষ আর নড়তে পারে না। দেশ ভাগ করে দুঃখ ভোগ করার দায় কেবল বাঙালীদের ঘাড়েই যেন বেশি করে চাপলো। তখন কলকাতার গর্ব করার মত সব কিছুই চলে গেছে। থাকবার মধ্যে রইলো কেবল গোটাকতক ধর্মশালা এখানে ওখানে ছড়িয়ে। সেগুলো অন্য শহরে কাঁধে করে তুলে নিয়ে যায় না বলেই রয়ে গেল।
–পাঁড়েজী!
ধর্মশালার সামনে গিয়ে সদানন্দ দেখলে সেখানেও ভিড়। রাজ্যের ভিখিরি এসে সদরের সামনে জটলা করে দাঁড়িয়ে আছে। সকলের হাতেই থালা-গেলাস মগ, একটা-না-একটা কিছু রয়েছে।
একেবারে গেটের সামনেই একজন কে দাঁড়িয়ে ছিল। সদানন্দ তাকেই জিজ্ঞেস করলে– পাঁড়েজি, পাঁড়েজী নেই?
লোকটা বললে–পাঁড়েজি বাইরে গেছে, কোঠিমে নেই হ্যায়–
সদানন্দ আবার ফিরে এল। অথচ পাঁড়েজীই তাকে আসতে বলেছিল। পাঁড়েজীকে কথা দিয়েছিল সে এখানে এসে উঠবে। মাঝরাত থেকেই এমনি করে ঘুরে বেড়াচ্ছে সে। ভেবেছিল এখানে এসে সে জিরিয়ে নেবে। কিন্তু এখন আবার অন্য ব্যবস্থা করতে হবে তাকে।
কিন্তু ভাগ্য ভালো, বড়রাস্তার মোড়ে আসতেই পাঁড়েজীর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল।
–এ কি বাবুজী, আপনি চলে যাচ্ছেন? আমি একটু বাইরে গিয়েছিলুম, আসুন, আসুন–
বলে টানতে টানতে ভেতরে নিয়ে গেল পাঁড়েজি। বিরাট উঠোন ভেতরে। পাথরের তৈরি বিরাট চক্-মিলান বাড়ি। চারদিকে সার-সার ঘর। চারতলা বাড়ি। সব ঘরে লোক গিশ-গিশ করছে। অনেক মানুষের ভিড় ভেতরে। যেন কোনও বিশেষ উৎসব হচ্ছে।
কোণের দিকে একটা ঘরের দরজার তালা খুলে পাঁড়েজী বললে–আসুন ভেতরে আসুন। আমি তো সকাল থেকেই আপনার জন্যে বসে ছিলুম, আপনি এত দেরি করলেন, আমি ভাবলুম আপনি বুঝি ভুলে গেলেন–
সদানন্দ বললে–না, ভুলবো কী করে? আমি তো বলেই ছিলুম আজকে এখানে থাকবো
পাঁড়েজী বললে–আজকে কেন বাবুজী, যত দিন ইচ্ছে থাকুন না, কলকাতার বাড়িওয়ালারা বড় বসমাইশ হুজুর, ভাড়া বাকি ফেললেই তাড়িয়ে দেবে। তা আপনার বাক্স প্যাটরা সব কি সেখানেই পড়ে আছে? আপনি ছেড়ে কথা বলবেন না বাবুজী, আপনিও মামলা জুড়ে দিন। আমার জানাশোনা ভালো ভকিলসাহাব আছে, বড় জাঁদরেল ভকিল সাহেব–
পাঁড়েজী খুব কথা কইয়ে লোক। চোদ্দ বছর বয়েস থেকে এই ধর্মশালার তদারকি করে আসছে। লেখাপড়া কিছুই জানে না। পুরোন আমলের লোক। বহুদিন কলকাতায় থেকে থেকে ভালো বাঙলা বলতে শিখেছে।
হঠাৎ বললে–বাবুজী আপনি সেই আংরেজি চিঠি পড়ে দিয়েছিলেন, মনে আছে? সেই চিঠিতে আমার অনেক লাভ হয়েছে। আমি চল্লিশ বিঘে জমির মালিক হয়েছি এখন–সব আপনার কিরপায় হলো বাবুজী–
সদানন্দ তখন একটা খাটিয়ার ওপর বসে পড়েছিল। সারাদিন হাঁটার পর এই তার প্রথম বসা। এত লোক দেখেছে সদানন্দ, এত জাগয়ায় গেছে, এত লোকের সঙ্গে মিশেছে, কিন্তু এখানে এই পাঁড়েজীর অন্ধকার ঘরখানার ভেতরে বসে যে-আরাম পেলে সে তার যেন তুলনা নেই।
বললে–তোমার এই ঘরখানা বেশ পাঁড়েজী–আমি একটু শুয়ে পড়ি, কেমন?
–শুয়ে পড়ুন না, তা জামাকাপড় বদলাবেন না?
সদানন্দ বললে–যা পরে আছি এ ছাড়া আর জামা কাপড় নেই আমার
–সব বুঝি বাক্সের মধ্যে পড়ে আছে? তা থাক, কাজ চলাবার মত জামাকাপড় পরে কিনে নেবেন। পয়সা লাগবে না–
–পয়সা লাগবে না কেন?
পাঁড়েজী বললে–-পয়সা লাগবে, কিন্তু নগদ পয়সা লাগবে না। আমাদের এই ধর্মশালার মালিকের কাপড়ের ব্যাওসা। কাপড়ের কারবার করে মালিকের অনেক টাকা। বোম্বাইতে কাপড়ের মিল আছে, আমার কাপড় কিনতে হয় না– আমি আপনাকে কাপড় এনে দেব।
সদানন্দ বললে–তার চেয়ে তুমি বরং আমাকে একটা চাকড়ি যোগাড় করে দিতে পারো পাঁড়েজী?
–চাকরি? কীসের চাকরি?
সদানন্দ বললে–যে-কোনও চাকরি, যে-কোনও মাইনে। চাকরি না করলে খাবো কী? যদি কারো ছেলে পড়াবার দরকার হয় তো তাও করতে পারি, আমি বি-এ পাস, যে-কোনও ক্লাসের ছেলেকে পড়াতে পারবো–
পাঁড়েজী বললে–আমার মালিকের অনেক ছেলে আছে বাবুজী, মালিককে আমি একদিন আপনার কথা বলবো। এখন মালিকের মেয়ের বিয়ে চলছে তো–
–মালিকের মেয়ের বিয়ে?
–হ্যাঁ, দেখেছেন না ধর্মশালায় কত ভিড়। সব বরযাত্রী, কাল বিয়ে হয়ে গেছে। এখন পনেরো দিন ধরে খাওয়া-দাওয়া চলবে। সব পাটনা থেকে এসেছে–
তারপর যেন হঠাৎ মনে পড়ে গেল। বললে–বাড়িওয়ালা তো আপনাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে, তা খেলেন কোথায়?
সদানন্দ বললে–খাই নি কিছু–
–সে কী, দিনভর কিচ্ছু খান নি? তা এতক্ষণ আমাকে বলেন নি কেন? দাঁড়ান আমি আসছি
বলে চট করে কোথায় বাইরে বেরিয়ে গেল। তারপর একটা মস্ত বড় শালপাতায় করে অনেকগুলো পুরি তরকারি নিয়ে এসে হাজির।
বললে–নিন্ বাবুজী, খেয়ে নিন–
সদানন্দ খাটিয়া থেকে উঠলো। শালপাতা-শুদ্ধ পুরি-তরকারিটা নিলে। সেই সময়ে ভেতর থেকে কে যেন ডেকে উঠলো–পাঁড়েজী—পাঁড়েজী–
পাঁড়েজী বললে–ওই মালিক ডাকছে, আমি আসছি বাবুজী, এখুনি আসছি—
বলে পাঁড়েজী তাড়াতাড়ি বাইরে চলে গেল।
