সদানন্দ সেখান থেকে চলে আসতে যাচ্ছিল, কিন্তু আবার দাঁড়িয়ে পড়লো। সেখানে দাঁড়িয়েই দেখলে সমরজিৎবাবুর ছেলে একটা জীপ গাড়ি করে এসে দাঁড়ালো। সেই বড়বাবু। সঙ্গে সঙ্গে আরো কয়েকজন লোক তার দিকে এগিয়ে এল। সকলের মুখই যেন গম্ভীর-গম্ভীর। যেন কী একটা আকস্মিক বিপদপাতে সকলেই হতচকিত। তবে কি জানাজানি হয়ে গিয়েছে যে, সমরজিৎবাবু তাঁর সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি কোন এক সদানন্দ চৌধুরীকে উইল করে দিয়ে দিয়েছে? তাতেই কি এত ভয়? তাতেই কি এত উত্তেজনা?
কিন্তু মহেশকে কোথাও দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। মহেশকে দেখতে পাওয়া গেলে তা জিজ্ঞেস করা যেত। বাড়ির মধ্যে মহেশই একমাত্র লোক যাকে জিজ্ঞেস করলে সমস্ত খবর সঠিক ভাবে পাওয়া যেত।
একজন বাইরের লোক সদানন্দের সামনে এসে দাঁড়ালো। জিজ্ঞেস করলে—
এখানে কী হয়েছে মশাই?
সদানন্দ বললে–আমি কিছু জানি না–
লোকটা কৌতূহলী প্রকৃতির। সে রাস্তার ভেতরের দিকে আরো এগিয়ে গেল। রাস্তায় চলতে চলতে ভিড় দেখে যারা অনাবশ্যক কৌতূহলী হয়ে ওঠে, লোকটা সেই জাতের।
চড়া রোদ মাথার ওপর তখন আরো চড়া হয়ে উঠলো। কিন্তু তবু যেন কারো ভ্রূক্ষেপ নেই। একবার মনে হলো সে-ও কাউকে জিজ্ঞেস করে–ওখানে কী হচ্ছে? কিন্তু যেন কেমন সঙ্কোচ হতে লাগলো। কাকে সে জিজ্ঞেস করবে? কেউ যদি তাকে চিনে ফেলে! এতকাল ধরে এই বাড়িতে সে কাটিয়েছে, এতকাল ধরে এ-পাড়াতে সে বাস করে এসেছে, অনেকেই তার মুখ চেনে। যদি কেউ জিজ্ঞেস করে আপনি এখানে একা দাঁড়িয়ে আছেন কেন?
হঠাৎ একটা চেনা-মুখ ভিড়ের মধ্যে ঢুকলো। সঙ্গে-সঙ্গে আরো একটা চেনা মুখ। সেই মানদা মাসি! আর তার পেছন-পেছ বাতাসী।
ওরা এসেছে কেন? ওরা কী করতে এসেছে?
হঠাৎ সমস্ত চিন্তাশক্তি যেন অসাড় হয়ে এল তার। আগের দিনই যাঁর সঙ্গে এত কথা বলেছে, তাড়াতাড়ি তাঁর এই পরিণতি সে কল্পনা করতে পারেনি। চব্বিশ ঘণ্টা আগেও তাঁর উদ্বেগ ছিল কেমন করে তাঁর পূর্বপুরুষের সমস্ত স্মৃতির পুঁজি সদানন্দ চৌধুরীর ওপর গচ্ছিত রেখে তিনি নিশ্চিন্ত হয়ে বিদায় নেবেন। সে ইচ্ছে তাঁর পূরণ হয়েছে। কিন্তু যাবার আগে তিনি জেনে যেতে পারেননি তাঁর সমস্ত ইচ্ছে বানচাল করে দিয়ে আর একজন অজ্ঞাতে তাঁকে প্রতারিত করেছে! জানতে পারেননি সদানন্দ চৌধুরী তার রেখে যাওয়া সম্পত্তির এক কপর্দকও স্পর্শ করেনি। না জেনেছেন ভালোই হয়েছে, জানতে পারলে তাঁর মৃত্যুও হয়তো শান্তির মৃত্যু হতো না।
হয়ত এই-ই হয়। সংসারে এই জিনিস ঘটে বলেই সংসারকে মানুষ মায়া বলে। সেই জন্যেই হয়ত মানুষ মায়ার বন্ধন কেটে জীবদ্দশাতেই বাণপ্রস্থ অবলম্বন করে মুক্তির সন্ধান খোঁজে।
সামনে দিয়ে সমরজিৎবাবুর মরদেহটা শ্মশানের দিকে চলতে লাগলো।
সদানন্দ সমজিৎবাবুর সেই মরদেহের সামনে মাথা নিচু করে দুই হাত জুড়ে উদ্দেশ্যে প্রণাম জানালো। মনে মনে সেই অদৃশ্য আত্মাকে উদ্দেশ্য করে জানাতে লাগলো–আমি আপনাকে প্রণাম করি, আপনার অনন্ত বেদনা আর অফুরন্ত মমতাকে আমি প্রণাম করি। আপনার দেওয়া সম্পত্তি গ্রহণ না করে আমি যে আপনার অজ্ঞাতসারে চলে যাচ্ছি এর জন্যে আমি দুঃখিত, কিন্তু আপনাকে আমি সম্মান করি বলেই অপরকে বঞ্চিত করার কলুষ থেকে আমি নিজেকে মুক্ত রাখলাম। আমাকে আপনি ক্ষমা করবেন।
মরদেহটা ধীর গতিতে দূরে চলে গেল। মহেশের সঙ্গেও আর দেখা করা হলো না। অথচ মহেশের সঙ্গে দেখা করবার জন্যেই সে এখানে এসেছিল। আর এখানে না এলে কি সে জানতে পারতো যে এ বাড়ির সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক তার চিরকালের মত শেষ হয়ে গেছে।
সদানন্দ রাস্তায় চলতে চলতে ভাবতে লাগলো যে-সম্পত্তির জন্যে সমরজিৎবাবুর এত উদ্বেগ শেষ পর্যন্ত তা কার ভোগে লাগবে কে জানে! আজ রেজিস্ট্রি অফিসে সমরজিৎবাবুর উইল রেজিস্ট্রি হবে কি না তা জানতেও পারবে না সে। আর জানবার দরকারও বোধ হয় হবে না।
হঠাৎ দেখলে সামনে দিয়ে মহেশ দৌড়তে দৌড়তে যাচ্ছে—
সদানন্দ ডেকে উঠলো–মহেশ–মহেশ–
কিন্তু গলা দিয়ে তার একটুকু শব্দ বেরোল না। যে অপ্রত্যাশিত ঘটনা সকাল বেলা ঘটে গেল তা জীবনে, এর পরে মহেশের ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত হয়ে গেল। আর তা ছাড়া মহেশকে ডেকে সে কী প্রশ্নই বা করবে? নয়নতারার কথা জিজ্ঞেস করতেই তো এসেছিল মহেশের কাছে। কিন্তু এই অসময়ে কি কাউকে নয়নতারার কথা জিজ্ঞেস করা যায়?
অনেকক্ষণ পরে হঠাৎ বড়বাজারের সেই ধর্মশালাটার কথা মনে পড়লো।
.
বড়বাজারের ধর্মশালাটা কোনও দানশীল লোক পরলোকে স্বর্গপ্রাপ্তির আশায় একদিন শহরের বুকের ওপর প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছিল। হয়ত কোনও অবাঙালী। ভেবেছিল এই শহর থেকে তো অনেক পয়সাই কামানো গেল। এইবার পুরুষানুক্রমে এই শহরের ঋণ শোধ করা যাক। হয়ত কোনও অবাঙালী কর্তাবাবুরই কীর্তি এটা। তখনকার দিনে এর উপযোগিতা ছিল অনেক। যারা পরেশনাথের মন্দির, হাওড়ার পুল, কি গঙ্গা-মাই, কিম্বা কালীঘাট দর্শন করতে আসতো তাদের এটা কাজে লাগতো। তারপর কলকাতা ধনে-জনে আরো পূর্ণ হয়েছে, কিন্তু এর সমৃদ্ধি ক্রমেই কমে গেছে। ভারতবর্ষে আরো অন্য কয়েকটা শহর কলকাতার চেয়ে সমৃদ্ধতর হয়ে উঠেছে। যারা একদিন কলকাতাকে শোষণ করেছিল তারা আর নেই। কিন্তু তাদের বংশধররা এখন আর সোজা পথে শোষণ করে না। তাদের হাতে আছে দিল্লী। সেই দিল্লীর মসনদে যারা বসে আছে তাদের হাত দিয়ে এমন কলকাঠি নাড়ে যাতে শোষণ বলে মনে হয় না। মনে হয় গণতন্ত্র। গণতন্ত্রের আড়ালে কার কোন্ কারচুপিতে রাতারাতি একটা রাজ্য বড়লোক হয় আবার আর একটা রাজ্য মুমূর্ষ হয়ে ধোঁকে। সেই ব্রিটিশ আমলের শেষ দিক থেকেই এটা চলে আসছে। ১৯১২ সালে যখন রাজধানী চলে গেল দিল্লীতে, তখন থেকেই। কিন্তু যখন কলকাতা থেকে আস্তে আস্তে সবই চলে গেল তখন ইংরেজদেরও বোধ হয় নাভিশ্বাস উঠেছে এখানে। তারা চলে গেল বটে, কিন্তু শোষণ থামলো না। শুধু হাতবদল হলো ১৯৪৭ সালের পর থেকে।
