ট্রেন চলে যাবার সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত প্লাটফরমের ভিড় তখন পাতলা হয়ে গেছে।
সদানন্দ আবার ফেরবার জন্যে উল্টোদিকে চলতে লাগলো। কিন্তু কোথায়ই বা যাবে সে! যে-মানুষ নিজের বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছে, পৃথিবীর আদর-যত্নে যার কোন স্পৃহা নেই, সারা পৃথিবীটাই তো তার ঘর হওয়া উচিত। এখানে এই ফাঁকা প্লাটফরমের ওপরেই সে বসে পড়তে পারে, এটাকেই তার বাড়ি মনে করতে পারে সে। মাথার ওপরের আকাশটাই তার বাড়ির ছাদ, আর এই চারদিকের লোকজন-চিৎকার-রোদ-আলো-অন্ধকার, স্নেহ-ভালবাসা, ঘৃণা–এই-গুলোই তার ঘরের চারটে দেয়াল। এককথায় এই পৃথিবীটাই তার সংসার।
কিন্তু না, সংসারী লোকের পক্ষে এ রকম সংসার তো হতে পারে না। সংসারী লোকের জন্যে চাই খানিকটা আড়াল, চাই একটুখানি আব্রু। সদানন্দ নিজের মনেই বিচার করতে লাগলো। সে সংসারী লোক, না সংসার ছাড়া? সংসার-ছাড়া লোককেই তো লোকে লক্ষ্মীছাড়া বলে। লক্ষ্মীকে তো পায়ে ঠেলেছে সে। যে-লক্ষ্মী নিজে তার কাছে এসেছিল সে লক্ষ্মীকেই সে ইচ্ছে করে বিদায় দিয়েছে। লক্ষ্মীকে সে চায়নি। তার মনে হয়েছে যারা লক্ষ্মীকে ঘরে বন্দী করেছে তারা লক্ষ্মীর আশীর্বাদই পায়নি। লক্ষ্মীকে সকলের মধ্যে বিতরণ করে দিতে হবে। এমন করে বিতরণ করতে হবে যাতে সবাই লক্ষ্মীর ভাগ পায়। কিন্তু কোথায় তা ঘটছে? কালীগঞ্জের হর্ষনাথ চক্রবর্তীও তা করেননি, নবাবগঞ্জের নরনারায়ণ চৌধুরীও তা করেননি। এমন কি বউবাজরের সমরজিৎবাবুও লক্ষ্মীর প্রসাদ পাননি। সবাই শুধু লক্ষ্মীর অপমানই করেছে। কিন্তু এই সকলের সঙ্গে অসহযোগিতা করেই কি সে লক্ষ্মীর অপমানের প্রায়শ্চিত্ত করতে চায়?
হঠাৎ তার খেয়াল হলো যে নিজের অজ্ঞাতসারে কখন সে আবার বউবাজারের সেই গলিটার কাছেই এসে দাঁড়িয়েছে। ভোররাত্রে যে বউবাজারের বাড়িটা থেকে সে নিঃশব্দে বেরিয়ে এসেছিল আবার কেন সে সেখানেই এসে দাঁড়ালো? কার আশায়? তবে কি সে সত্যি-সত্যিই নয়নতারার খবর নেবার জন্যে এত আগ্রহী!
কিন্তু যে বাড়ি থেকে সে চলে আসতে বাধ্য হয়েছে, সে বাড়িতে সে আবার কেমন করে ঢুকবে? কেমন করে সেখানে গিয়ে বলবে যে সে এসেছে!
সমরজিৎবাবুর কাছে তার আসার খবরটা পৌঁছলেই তিনি হয়ত তাকে ডেকে পাঠাবেন।
জিজ্ঞেস করবেন কী হলো, শুনলুম তুমি আমার বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলে?
সদানন্দ বলবে–হ্যাঁ, চলে গিয়েছিলুম–
–কিন্তু কেন? কেন তুমি চলে গিয়েছিলে?
সদানন্দ বলবে–চলে গিয়েছিলুম, কারণ এখানে আপনার বাড়ির লক্ষ্মীর অপমান হয়েছে–
–লক্ষ্মীর অপমান? সে আবার কী? আমি তো তোমার কথার মানে বুঝতে পারছি না! সদানন্দ তখন নিজের কথাই ভালো করে বুঝিয়ে বলবে–একদিন আমি যেকারণে বাড়ি থেকে চলে এসেছিলুম, সেই দুর্যোগ আপনার এবাড়িতেও ঘটেছে কাকাবাবু। আপনার অনেক অর্থ আছে, সেই অর্থ আপনার পূর্বপুরুষ কী করে উপার্জন করেছেন তা আমি জানি না, যদি সৎ পথে সে অর্থ না এসে থাকে তো আমি সে অর্থ নিজের ব্যবহারের জন্যে নিতে পারি না–
সমরজিৎবাবু হয়ত সদানন্দর কথা শুনে অবাক হয়ে যাবেন। বলবেন–তুমি কি পাগল হয়ে গেছ সদানন্দ? এসব কথা তো পাগলে বলে! তোমার মত কথা বললে কি সংসার চলতো?
সদানন্দ বলবে–আপনার ছেলে মাতাল, আপনার ছেলে চরিত্রহীন, এটা দেখে যেমন আপনার খারাপ লাগছে তেমনি আপনার পূর্বপুরুষদের সম্বন্ধেও তো তাই ভাবা উচিত। তাঁরা মাতাল ছিলেন কিনা, তাঁরা চরিত্রহীন ছিলেন কিনা তা নিয়ে কি আপনি কখনও ভেবেছেন? তাঁরা তেমনি প্রজাদের ওপর অত্যাচার করেছেন কিনা তারও কি বিচার করেছেন? তাঁরাও তেমনি খারাপ ছিলেন কিনা তাও তো ভাবতে হবে। তাঁদের কোনও পাপ থাকলে আপনাকে তো তার প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে!
সমরজিৎবাবু সদানন্দের এই যুক্তি শুনে হয়ত আবাকই হয়ে যাবেন।
সদানন্দ আবার বলবে–আমি জানি কাকাবাবু, আপনি আমাকে পাগল বলবেন, আপনি আমার কথা শুনে হাসবেন। শুধু আপনি কেন পৃথিবীর সব লোকই আমার কথা শুনে বলবে আমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। কিন্তু লোকের কথা শুনে আমি চলবো, না লোকে আমার কথা শুনে চলবে? কোনটা ভাল আপনিই বলুন?
কিন্তু কথাবার্তাগুলো সবই আনুমানিক। এ-সব কথাবার্তা হয়ত হবেও না। হয়ত তাঁর কাছে তার আসার খববটাও পৌঁছবে না। শুধু মহেশকে ডেকে সদানন্দ তার প্রশ্নগুলো করেই আবার চলে আসবে।
–আচ্ছা মহেশ, তুমি তো নবাবগঞ্জে গিয়েছিলে, তা সেখানে কী কী দেখে শুনে এলে?
মহেশ বলবে–আমি তো বলেছি আপনাকে সেখানে আপনাদের বাড়ির কেউই নেই। আপনার ঠাকুর্দাদা মারা গেছেন, আপনার মা মারা গেছেন। আপনার বাবা…….
–আমি তাদের কথা বলছি না, নয়নতারা কোথায় আছে কিছু শুনেছ?
–নয়নতারা? নয়নতারা কে?
সদানন্দ বলবে–আমার স্ত্রী—
মহেশ হয়ত কিছু একটা উত্তর দিত, কিন্তু তার আগেই সদানন্দ একেবারে কল্পনার জগৎ থেকে বাস্তবে ফিরে এসেছে। যে বাড়িটা থেকে ঘণ্টা কয়েক আগে সে চলে এসেছিল সেই বাড়িটার সামনেই তখন বেশ চড়া রোদ উঠেছে। আর তার সামনে অনেক লোকও জড়ো হয়েছে। অত লোক কেন ওখানে? কিসের ভিড় ওদের ওখানে? ওরা কী করছে?
দূরে রাস্তার এক কোণে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে সদানন্দ দেখতে লাগলো। আস্তে আস্তে যেন লোকের ভিড় বাড়তে লাগলো সেই বাড়িটার সামনে।
