সদানন্দ বললে–তোমার ঘর আছে, জানা রইল, যদি আসি তো আসবো। আমি বাড়ি থেকে চলে এসেছি পাঁড়েজী–
পাঁড়েজী বললে–বাড়িওয়ালা তাড়িয়ে দিয়েছে বুঝি? তা থাকুন না। আমার সঙ্গেই থাকবেন, যেকদিন থাকতে চান থাকবেন–
বলে পাঁড়েজী চলে গেল। সদানন্দ আরো জোরে চলতে লাগলো। আরো আরো জোরে। আশ্চর্য, কলকাতার রাস্তার মত এত লম্বা রাস্তা বোধ হয় পৃথিবীর কোনও দেশে নেই। নবাবগঞ্জের রাস্তা বড় তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে যেত। এখানে কিন্তু তা আর শেষ হয় না, ফুরোয় না, চলে চলে যেন আর তা অতিক্রম করতে পারা যায় না। এদিকে তখন লোকের চলাচল আরো বেড়েছে। ট্রামে বাসে লোকের ভিড় বাড়ছে। ফুটপাথেও ভিড় বাড়লো বেশ। সদানন্দ বড় রাস্তা ছেড়ে এবার পাশের একটা গলিতে ঢুকলো। এতক্ষণ সদানন্দর সেই বাড়ির কথা মনে পড়লো। এতক্ষণে তার চলে আসার খবরটা বোধ হয় কাকাবাবুর কানে গেছে। কাকীমা হয়ত খবরটা পেয়ে কাকাবাবুর কাছে এসেছে। দুজনে মিলে মহেশকে জিজ্ঞেস করছেন–দাদাবাবু কেন গেছে। যাবার সময় কী বলে গিয়েছে। কোথায় গিয়েছে। দুজনের প্রশ্নের হয়ত আর শেষ নেই তাঁদের। এমন করে এত যত্ন কেউ যে পায়ে ঠেলতে পারে এ কথাটা তারা বিশ্বাসই করতে পারছেন না। কিন্তু আর একটা ঘরে? আর একটা মানুষের অন্তরের অন্তঃপুরে?
হঠাৎ একটা আচমকা আনন্দ যেন সদানন্দকে একেবারে বিভ্রান্ত করে দিলে।
হাঁটতে শুরু করে কোথা দিয়ে তখন কোথায় চলে এসেছিল সদানন্দ সেদিকে খেয়াল ছিল না তার। চারদিকে চেয়ে যেন তার চমক ভাঙলো। বড়বাজার থেকে একেবারে শেয়ালদ’ স্টেশনের প্লাটফরম। সমস্ত লোকজন একটা নির্দিষ্ট দিকে লক্ষ্য করে ছুটে চলেছে। পাশেই দাঁড়ানো একটা ট্রেন। ট্রেনটা বুঝি তখনই ছেড়ে দেবে, ইঞ্জিনটা দূরে ফোঁস ফোঁস করে তাই সকলকে জানিয়ে দিচ্ছে, তাই সকলের এত ব্যস্ততা! সবাই ছুটছে।
কিন্তু ও কে? নয়নতারা না! সদানন্দ আরো জোরে পা দুটোকে চালিয়ে দিলে। পাশে ও কে? কার সঙ্গে এত তাড়াতাড়ি ট্রেনে উঠতে যাচ্ছে! না কি ভুল দেখছে সদানন্দ। চোখ দুটো দুই হাত দিয়ে ভাল করে মুছে নিলে সে। নয়নতারাই তো। অন্তত পেছন থেকে ঠিক সেই রকম। পাশ থেকে আধখানা মুখ দেখা যাচ্ছে। মাথায় ঘোমটা নেই। পাশে পাশে যে যাচ্ছিল, তার সঙ্গে খুব কথা বলছে। এখানে নয়নতারা কোত্থেকে এল! এই কলকাতায়!
আশেপাশে সামনে অনেক লোকের আড়াল পড়ছে বার বার। ওগো তোমরা সরে যাও, দেখি আমাকে ভাল করে দেখতে দাও, তোমরা আড়াল কোর না। সদানন্দ আরো জোরে পা চালাতে লাগলো। কিন্তু ওরা তখনও অনেক দূরে। এদিকে ট্রেনের গার্ড বাঁশি বাজিয়ে দিলে। ঢং ঢং করে ঘণ্টা বেজে উঠলো। ইঞ্জিন থেকেও হুইসল বাজলো।
নয়নতারা পেছনে আর সঙ্গের ছেলেটা তখন আরো সামনের দিকে এগিয়ে গেছে। ট্রেনটা চলতে আরম্ভ করতেই ছেলেটা আগে উঠে পড়েছে। উঠেই নয়নতারার একটা হাত ধরে তাকে কামরার ভেতর তুলে নিলে।
এবার পাশ থেকে সদানন্দ নয়নতারার মুখটা স্পষ্ট দেখতে পেলে। একেবারে স্পষ্ট। হ্যাঁ আর কোনও সন্দেহ নেই, একেবারে নয়নতারাই ঠিক।
সদানন্দর কী মতিভ্রম হলো। সে চিৎকার করে ডাকলো—নয়নতারা—নয়নতারা–
সদানন্দর গলার আওয়াজটা প্রথমে নিখেলেশের কানে গেল। বললে–তোমার নাম ধরে কে যেন ডাকলো মনে হচ্ছে?
নয়নতারা বললে–কী যে তুমি বলো? আমার নাম ধরে এখানে আবার কে ডাকবে? এখানে আবার আমাকে কে চেনে?
বলে জানলা দিয়ে বাইরে মুখ বাড়িয়ে দেখবার চেষ্টা করলে।
সদানন্দকে নয়নতারা দেখতে পেলে না, কিন্তু সদানন্দ দেখতে পেলে–সেই নয়নতারা। কোনও ভুল নেই আর। একেবারে অবিকল নয়নতারা। কিন্তু সঙ্গে কে? নয়নতারা কলকাতায় এসেছে কেন?
ট্রেনটি তখন হু-হু শব্দে প্লাটফরম পেরিয়ে দূরের দিকে মিলিয়ে যেতে লাগলো।
.
ট্রেনটা মিলিয়ে গেল বটে কিন্তু সদানন্দ অনেকক্ষণ সেই প্লাটফরমের ওপরেই হতভম্বের মত চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। যেন এতদিন ধরে যে বইটা সে পড়ে আসছিল সেই বইটার পাতাগুলো হঠাৎ ঝড়ো হাওয়া লেগে সব ওলট-পালোট হয়ে গেছে আর তারপর সেই ঝড় একেবারে বইটার প্রথম পৃষ্ঠাটাতেই এসে ঠেকেছে। বইটা যে কতদূর সে পড়েছিল তাও আর তখন তার মনে নেই, শুধু প্রথম শব্দটাই তখন তার চোখের ওপর জ্বলজ্বল করে ভেসে উঠতে লাগলো–নয়নতারা, নয়নতারা—নয়নতারা–
ওই একটা শব্দ! ওই ‘নয়নতারা’ শব্দটা দিয়েই যেন তার জীবনের গ্রন্থ শুরু হয়েছিল। এতদিন পরে যখন শেষের দিকেই তার এগিয়ে যাবার কথা, তখন এ কোন্ ঝড়ের দাপটে আবার সে প্রথম পৃষ্ঠায় শব্দটায় এসে পৌঁছুল!
সত্যিই তো! নয়নতারাই তো! নয়নতারা ছাড়া আর কেউই তো নয় ও। ও যদি নয়নতারাই হয় তো সঙ্গে ও কে?
মহেশের কথাগুলো মনে পড়লো। মহেশ আজ ভোরবেলা তাকে বলেছিল–নবাবগঞ্জের বাড়িতে সে গিয়েছিল, সে দেখে এসেছে সেখানে তারা কেউ নেই। কেউ নেই তো গেল কোথায় তারা। তবে কি নবাবগঞ্জের সেই বাড়ি, সেই বাগান, সেই ক্ষেত-খামার, সব হাত বদল হয়ে গেছে? মা মারা যাবার পর কি তবে তাদের সংসার এমন করে ভেঙে গুঁড়িয়ে চুরমার হয়ে গেল যে কারোর পক্ষেই আর সেখানে থাকা সম্ভব হলো না?
মহেশ যখন তাদের নবাবগঞ্জের বাড়ির কথা বলেছিল তখন সে সম্বন্ধে তার জানবার কোনও আগ্রহ ছিল না। যে-জীবন সে সেচ্ছায় ত্যাগ করে এসেছে সেখানে ফিরে যাবার যখন কোনও প্রশ্ন আর নেই তখন কেনই বা তার আগ্রহ থাকবে! কিন্তু আজ মনে হলো মহেশের সঙ্গে আর একবার দেখা হলে ভাল হয়। আর একবার দেখা হলে সে জিজ্ঞেস করবে কার সঙ্গে তার দেখা হয়েছে, কে কী বললে! নয়নতারা সম্বন্ধে কেউ কিছু বলেছে কিনা, সে কোথায় গেছে তাও কেউ জানে কি না! ইত্যাদি ইত্যাদি অনেক কথা তার হঠাৎ জানতে ইচ্ছে করতে লাগল।
