সদানন্দ এবার স্থির সিদ্ধান্ত করে নিলে। সে বিছানা ছেড়ে উঠলো। আলনা থেকে নিজের জামাটা গায়ে গলিয়ে নিলে। তারপর আস্তে আস্তে দরজার খিলটা খুললে। না, আমি এখানে থাকবো না। তুমি সম্মতি দিলেও থাকবো না, অসম্মতি দিলেও থাকবো না। আমি কোথাও থাকবার জন্যে জন্মাইনি। চলাই আমার নিয়তি। সুতরাং তুমি ভয় পেও না। কারো ভবিষ্যৎ নষ্ট করার কাজ আমার নয়। নয়নতারার ভবিষ্যৎ হয়ত আমি নষ্ট করেছি, কিন্তু তার দায়িত্ব তো আমার নয়। সে দায় আমার পূর্বপুরুষের। কিন্তু তুমি আমার কে? কেউই নও। তোমাকে আমি চাক্ষুষ কখনও দেখিইনি। আমাকে এ চিঠি না লিখলেও আমি এখানে থাকতুম না। একজনের ভবিষ্যৎও নষ্ট করেছি বলে তোমার ভবিষ্যৎ আমি নষ্ট করবো এমন পাষণ্ড আমি নই।
–কে? দাদাবাবু? কোথায় যাচ্ছেন?
অত রাত্রেও মহেশ ঠিক টের পেয়েছে।
সদানন্দ থমকে দাঁড়ালো! মহেশ কাছে এসে আলোটা জ্বালিয়ে দিলে।
–কোথায় যাচ্ছেন এত রাত্তিরে?
–আমি চলে যাচ্ছি মহেশ
–চলে যাচ্ছেন? কেন? কোথায়?
–তা জানি না। তুমি কাউকে বোল না। আর বলে দিলেও আমাকে কেউ আটকে রাখতে পারবে না।
বলে সদানন্দ সদর-দরজার বাইরে এসে দাঁড়ালো। অন্য দিন এই সময়েই সমরজিৎবাবু গঙ্গাস্নান করতে বেরোন। রাস্তার আলোগুলো বেশ ফিকে হয়ে এসেছে।
মহেশ পেছন থেকে বললে–আপনি দেশে ফিরে যাচ্ছেন কিন্তু সেখানে তো কেউ নেই আপনাদের। আমি তো গিয়ে দেখে এসেছি। আপনাদের বাড়ি ফাঁকা পড়ে আছে।
–কেন? তারা সব কোথায় গেল?
–আপনার মা মাস কয়েক আগে মারা গেছে—
–তাই নাকি? তা হবে!
–আপনাকে বলিনি, বাবু বলতে মানা করে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন মায়ের মারা যাবার খবর শুনে আপনি কষ্ট পাবেন।
সদানন্দ কিছু বললে না। শুধু হাসলো একটু। মহেশ চেনে না সদানন্দকে, তাই ও কথা বললে। সমরজিৎবাবুই কি তাকে চিনতে পেরেছেন। নইলে তিনিই বা ও কথা বললেন কেন?
বললে–তুমি কাকাবাবুকে কিছু বোল না।
–তা না-হয় বলবো না, কিন্তু আপনি চলে যাচ্ছেনই বা কেন?
সদানন্দ এর উত্তর কি দেবে। আর দিলেই কি মহেশ বুঝতে পারবে? শুধু বললে– যাচ্ছি আমার আর থাকতে ভালো লাগছে না এখানে তাই। যাই–
মহেশ আরো একটু এগিয়ে এল। বললে–বাবু যদি আপনার কথা জিজ্ঞেস করেন তো কী বলবো?
সদানন্দ বললে–কেন, আমি যে কথাগুলো বলছি এই কথাগুলোই বোল। তোমাকে মিথ্যে কথা বলতে হবে না–
–তা আবার আসবেন তো?
সদানন্দ বললে–না মহেশ, আমাকে আর আসতে বোল না, এখানে যেন আর আমাকে আসতে না হয়।
–আপনি এ বাড়িতে যতদিন ছিলেন বাবুর মনে তবু একটু সুখ ছিল। বাবুর মুখে হাসি বেরিয়েছিল
সদানন্দ বললে–বাবুর মনে হয়ত সুখ ছিল, কিন্তু তোমার বড়দাদাবাবুর মনে হয়ত কষ্ট হচ্ছিল।
এ কথার উত্তর মহেশ আর কিছু বলতে পারলে না। সদানন্দ আর না দাঁড়িয়ে সোজা হন হন করে হাঁটতে লাগলো। কিন্তু কোথায় যাবে সে? কোন দিকে?
রাস্তায় তখন অল্প লোক চলাচল শুরু হয়েছে। কেউ যাচ্ছে শেয়ালদা স্টেশনের দিকে। কেউ বা গঙ্গাস্নান করতে। হ্যারিসন রোড ধরে সোজা চলতে চলতে একেবারে বড়বাজারের ধার পর্যন্ত একটানা চলে এল। বেশ সোজা মসৃণ রাস্তা। সদানন্দর জীবনের মত সর্পিল নয়, জটিলও নয়। কতদিন সমরজিৎবাবুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে এ সব রাস্তায় বেড়িয়েছে সে। কতদিন হাওড়া স্টেশনের প্লাটফরমের বেঞ্চিতে গিয়ে বসেছে, আবার হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি ফিরে এসেছে। কতদিন রাস্তার ধারে ফেরিওয়ালার বেচা-কেনা দেখেছে, ফেরিওয়ালার হারমোনিয়াম বাজিয়ে পায়ে ঘুঙুর পরে নেচে নেচে টোটকা ওষুধ দাঁতের মাজন বিক্রি করার কৌশল লক্ষ্য করেছে। এবার শুধু যাওয়ারই পালা, ফেরবার পালা নয়। আজও সে প্লাটফরমের বেঞ্চিতে গিয়ে বসতে পারে, কিন্তু যে বাড়ি থেকে সে বেরিয়ে এসেছে, সে বাড়িতে আর সে ফিরতে পারে না।
–বাবুজী!
হঠাৎ ডাক শুনে সদানন্দ পেছনে ফিরে তাকালো। আরে, এ যে সেই পাঁড়ে পাঁড়েজী।
পাঁড়েজীর সঙ্গে অনেকদিন আগে ঘটনাচক্রে আলাপ হয়ে গিয়েছিল একদিন। এই রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে একদিন একটা ধর্মশালার সামনে পাঁড়েজী তাকে ধরেছিল। ভদ্রলোকের মত চেহারা দেখে বলেছিল বাবুজী একটা আংরেজী চিঠি পড়ে দেবেন হুজুর?
সদানন্দ বলেছিল—দাও—
বিরাট পাথরের তৈরি ধর্মশালা। পাঁড়েজী সেইখানকার খাস দারোয়ান। ভেতরে পাথর বাঁধানো উঠোন। সামনে বিরাট গেট। সেইখানে একটা কোণের দিকে পাঁড়েজীর থাকবার ঘর। চিঠিখানা তার মালিককে দেখাতে চায়নি। সেটা এসেছিল তার দেশের কাছারি থেকে। কে একজন আত্মীয় মারা গেছে। তার সম্পত্তির ভাগীদার ছিল পাঁড়েজী। চিঠিটা সেই সংক্রান্ত। চিঠিটা পড়ে দিয়ে চারিদিকে চেয়ে চেয়ে দেখছিল সদানন্দ। থাকবার বেশ ভালো বন্দোবস্ত। তারপর আরো কয়েক দিন দেখা হয়ে গিয়েছিল পাঁড়েজীর সঙ্গে। সে-সব পুরোনো কাহিনী। আজ এতদিন পরে হঠাৎ আবার তার সঙ্গে দেখা।
জিজ্ঞেস করলে–কোথায় যাচ্ছো পাঁড়েজী?
পাঁড়েজী বললে–-গঙ্গায় গিয়েছিলুম নাইতে। আপনি কোথায় যাচ্ছেন?
হঠাৎ সদানন্দ বললে–তোমার ধর্মশালায় থাকা যায় পাঁড়েজী? ঘর খালি আছে নাকি?
পাঁড়েজী বললে–আপনি থাকবেন? না আউর কোই থাকবে?
সদানন্দ বললে–আমিই থাকবো, আবার কে থাকবে?
–তা হলে আসুন আমার সঙ্গে–আমি তো এখন ধর্মশালায় যাচ্ছি।
