ওই অবস্থায় জামাইবাবুকে দেখে, প্রকাশ যেন এক মুহূর্তের জন্যে আড়ষ্ট হয়ে রইলো। জামাইবাবুও তেমনি, আর পুঁটির তো কথাই নেই। ছোটমশাই সোজা হয়ে বসে পুঁটিকে বললেন–থাক, থাক, আর পা টিপতে হবে না
পুঁটি পা ছেড়ে দিয়ে গেলাসটা নিয়ে চলে যেতে চাইছিল, কিন্তু প্রকাশ তখন পথ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে পড়েছে। ঘরের বাইরে যাবার রাস্তা নেই।
জিজ্ঞেস করলে–এ কে জামাইবাবু?
ছোটমশাই বললেন–এ হলো অশ্বিনী ভট্টাচার্যির মেয়ে–তা তুমি কখন এলে?
–অশ্বিনী ভট্টাচার্যির মেয়ে? তা এখানে কেন?
–ও দুধ দিতে এসেছে, পা’টা কামড়াচ্ছিল কিনা তাই….
প্রকাশ বললে–তা পায়ের আর দোষ কি? পা তো কামড়াবেই, কিন্তু তা বলে অশ্বিনী ভট্টাচার্যের মেয়ে এসে আপনার পা টিপে দেবে? পা টেপবার আর কোনও লোক পেলেন না আপনি?
–এই সুলতানপুরে আমার কে আর আছে বলো! আর তো কেউ নেই—
–আর কেউ না থাকে, আমি তো আছি।
বলে পুঁটিকে তাড়া করলে। বললে–যা, তুই বাড়ি যা–
পুঁটি তখন পালাতে পারলে বাঁচে। কিন্তু প্রকাশ আর দেরি করলে না। জামাই বাবুর পায়ের কাছে বসে দু’হাতে তাঁর পা দুটো কোলে তুলে নিয়ে টিপতে লাগলো।
ছোটমশাই ব্যস্ত হয়ে বললেন–তুমি আবার কেন পা টিপতে বসলে?
–তা আপনার পা কামড়াচ্ছে,আমি টিপবো না? কোথাকার কোন্ অশ্বিনী ভট্টাচার্যর মেয়েকে দিয়ে কী বলে আপনি পা টেপাতে গেলেন? ওর গায়ে কি জোর আছে আমার মত?
ছোটমশাই বললেন–না না, থাক্ থাক্, আর টিপতে হবে না, আমার পা আর কামড়াচ্ছে না তুমি পা ছাড়ো–
বলে ছোটমশাই নিজের পা দুটো প্রকাশের কোল থেকে টেনে নিলেন। তারপরে বললেন–তুমি তো ট্রেন থেকে নেমে সোজা এসেছ, এখন যাও, বউমার সঙ্গে দেখা করে এস, আমি এখানেই আছি–
প্রকাশ উঠলো। বললে–ঠিক আছে, আপনি যেন কোথাও বেরোবেন না, আমি এখুনি আসছি–
বলে বেরোল। কিন্তু বাড়ির দিকে নয় একেবারে সোজা চলে গেল অশ্বিনী ভট্টাচার্যির বাড়ি। আগে জিনিসটার ফয়শালা হয়ে যাক, তারপর নিজের বাড়িতে যাবে সে।
অশ্বিনী ভট্টাচার্যির বাড়ির সামনে গিয়ে চেঁচিয়ে ডাকতে লাগলো–অশ্বিনী–অশ্বিনী—
অশ্বিনী বেরিয়ে আসতেই প্রকাশ বলে উঠলো–বলি ভেবেছিস কী তুই? নিজের আইবুড়ো মেয়ে পাঠিয়ে দিয়ে ভেবেছিস আমার ভগ্নিপতির ঘাড়ে চাপিয়ে দিবি? আমি তোর মতলব বুঝি না ভেবেছিস? খবরদার বলছি তোর মেয়ে যদি ও-মুখো হয় তো ওর ঠ্যাং খোঁড়া করে দেব, এই তোকে বলে রাখছি–
অশ্বিনীও কম যায় না। বললে–কী, এত বড় আস্পর্ধা তোর, আমার বাড়ি বয়ে তুই গালাগালি দিতে আসিস–
ততক্ষণে আশেপাশে লোকজন জমে গিয়েছিল। একজন তেড়ে যায় তো ও-দিক থেকে আর একজন তেড়ে আসে।
সব লোক তখন প্রকাশ রায়ের দলে ভিড়ে গেছে। প্রকাশ চেঁচিয়ে উঠলো–আয় দেখি তোর কত তেজ, আমার ভগ্নিপতিকে তোর জামাই করা বার করছি। ভেবেছিস আমি মরে গেছি?
নিরাপদ চক্রবর্তী বললে–-দেখ না বাবা, অশ্বিনী তোমার ভগ্নিপতির কাছে আমাদের কাউকে ঘেঁষতে দেয় না। ভেবেছে মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে সব সম্পত্তি নিয়ে গ্রাস করবে!
প্রকাশ বললে–গ্রাস করা দেখাচ্ছি, আমি ছিলুম না বলে তলে তলে এত মতলব। আমি এসে দেখি ওর মেয়েটা আমার ভগ্নিপতির পা দুটো কোলে নিয়ে টিপে দিচ্ছে। তার চেয়ে তোর মেয়েকে বাজারের বস্তিতে ভাড়া খাটাতে পাঠালি না কেন? তাতে মেয়ের রোজগারে আরো বেশি করে পেট ভরতো—
এতক্ষণে অশ্বিনী তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলো। প্রকাশের দিকে ছুটে আসতে আসতে বললে–তবে রে শালা, আমার মেয়ের নামে বদনাম দেওয়া, তোকে আজ মেরেই ফেলবো–
শেষ পর্যন্ত হয়তো সেইখানেই একটা রক্তারক্তি কাণ্ড বেধে যেত কিন্তু তার আগেই বাড়ির ভেতর থেকে পুঁটি এসে বাবাকে জড়িয়ে ধরেছে বাবা, তুমি ওদের কাছে যেও না, ওরা তোমাকে একলা পেয়ে মেরে ফেলবে—
জিনিসটা এর পরে আর আর বেশি দূর গড়ালো না। অশ্বিনী ভট্টাচার্যিও রাগে গজ গজ করতে লাগলো, প্রকাশও তাই। মাঝখানে নিরাপদ চক্রবর্তীরা শুধু একটু হতাশ হলো। একটা গুরুতর কিছু ঘটলে যেন তাদের ভালো লাগতো।
প্রকাশ চলে আসার সময় শুধু বলে এলো–ঠিক আছে, আজ কিছু বললুম না, কিন্তু সাবধান, আর কখনও এ-মুখো হলে তোরই একদিন কি আমারই একদিন—হ্যাঁ—
৩.৪ নিয়তির অন্ধ আঘাত
যে-জীবনকে কেন্দ্র করে এতগুলো চরিত্র একদিন আবর্তিত হতে শুরু করেছিল, তারা যে কে কোথায় জড়িয়ে পড়লো, নিয়তির অন্ধ আঘাতে কে কোথায় নিঃশেষে মিলিয়ে গেল তা নিয়ে যেন সদানন্দর ভাবনার কোনও দায় নেই। সে যেন পৃথিবীতে শুধু নির্বিকার নির্বিকল্প নিরঙ্কুশ আর নিঃসঙ্গ হয়ে বাঁচবার জন্যেই জন্মেছে। অথচ তাকে জড়িয়েই লোকের যত স্বপ্ন যত সাধ, যত সাধনা। সে নবাবগঞ্জ ছেড়ে চলে আসবার সঙ্গে সঙ্গে বুঝি তাই সব কিছু ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে গেল। কালীগঞ্জের বউএর অপঘাতে মৃত আত্মা যেন তার সঙ্গে জড়িত সবগুলো মানুষকে পেছন থেকে তাড়া করে চলছিল তখনও।
বউবাজারের একতলার ঘরখানার বিছানার ওপর শুয়ে শুয়ে সদানন্দ সেই কথাই ভাবছিল। রাত তখন কত কে জানে। হয়ত শেষ রাতই হবে। কিংবা হয়ত মাঝরাত। জামার পকেটে তখনো সেই চিঠিখানা রয়েছে। সেখানা বার করে আবার সে পড়তে লাগলো। নিজে কাউকে সুখ দিতে পারেনি সে। সুখ দিতে হয়ত চেষ্টা করেও সুখ দিতে পারেনি। হয়ত চেষ্টা করে কোনও মানুষকে সুখ দেওয়া যায় না। কিন্তু দুঃখ দেওয়া তো সহজ। দুঃখ যে-কোনও মানুষ যে-কোনও মানুষকে দিতে পারে। তার জন্যে কষ্ট করার দরকার হয় না। আমাকে দুঃখ দিয়েছে আমার পূর্ব-পুরুষ, আমি তার দায়ভাগ নিয়ে দুঃখ দিয়েছি নয়নতারাকে। এমনি করে মানুষে মানুষে বংশপরম্পরায় সুখ-দুঃখের শৃঙ্খলে বাঁধা পড়ে আছি। এই-ই আমার দুঃখ। এর থেকে আমি মুক্তি চাই। আমি সমস্ত শৃঙ্খল থেকে অব্যাহতি চাই। আমি নিজের মুক্তি চাই, সব মানুষকেও সুখ-দুঃখের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি দিতে চাই। তা হলে কেন আমি আবার এখানে এই সমরজিৎবাবুর পরিবারের সঙ্গে শৃঙ্খলিত হতে রাজি হলুম। কেন দাসখতে সই দিতে গেলুম।
