ছোটমশাই বললেন–দুধ? দুধ এখানে কে দেবে?
–কেন? দুধ এখেনে কে দেবে মানে? ছিঃ ছিঃ লজ্জার কথা, আপনি গাঁয়ের জমিদারও বটে, আবার জামাইও বটেন, আপনি দুধ খেতে পাবেন না? ক’টা গরু আপনি চান বলুন? আমি গরু যোগাড় করে দেব। গরুর অভাব সুলতানপুরে? টাকা ফেললে এখানে কী না পাওয়া যায়?
ছোটমশাই বললেন–না না, গরু-টরু আমার দরকার নেই, আমি তো আর সুলতান পুরে থাকতে আসিনি, নবাবগঞ্জেই আমার নিজের কত গরু রয়েছে–
–দাঁড়ান, কাল থেকে আপনার দুধের ব্যবস্থা করছি আমি—
বলেই উঠে চলে গেল। পরদিন সকালেই আবার এসে হাজির। সঙ্গে একটি মেয়ে। মেয়েটির হাতে একটি দুধের গেলাস।
ছোটমশাই চমকে উঠলেন। এ আবার কে?
–পেন্নাম কর, পেন্নাম কর। দুধের গেলাসটা রেখে আগে ঠাকুরমশাইকে পেন্নাম কর।
মোটা আটপৌরে একটা তাঁতের শাড়ি গায়ে জড়িয়ে দুধের গেলাস নিয়ে মেয়েটা একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল। গেলাসটা তক্তপোশের ওপর রেখে ছোট মশাইকে গড় হয়ে প্রণাম করতে যাচ্ছিল, কিন্তু ছোটমশাই দু’হাত বাড়িয়ে বাধা দিতে গেলেন। বললেন—থাক্।
অশ্বিনী ধমকে উঠলো-–কেন, থাকবে কেন ঠাকুরমশাই? কর পুঁটি, পেন্নাম কর। পেন্নাম করলে তোর সাত-জন্ম সার্থক হয়ে যাবে, এমন বামুনঠাকুর এ তল্লাটে আর পাবিনে–
বাপের কথায় পুঁটি ছোটমশাই-এর পায়ের বুড়ো আঙ্গুল ছুঁয়ে প্রণাম করলে। ছোটমশাই ভালো করে দেখলেন মেয়েটাকে। বেশ আঁটসাঁট করে খোঁপা বাঁধা। দেহটাও তার খোঁপার মত বেশ আঁটসাঁট। গড়ন-পেটনও বেশ। সকাল বেলাই বেশ সেজেছে-গুঁজেছে। বললেন–এ কে তোমার অশ্বিনী?
–আজ্ঞে এ হলো পুঁটি। আমার মেয়ে। ওর ভালো নাম একটা আছে, সেটা ওর গর্ভধারিণী জানতো। হ্যাঁ রে, তোর ভালো নামটা কী রে?
মেয়েটা জড়োসড়ো হয়ে বললে–নলিনী!
–হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে পড়েছে, নলিনী। আমরা পুঁটি বলেই ডাকি। নে, এইবার দুধের গেলাসটা এগিয়ে দে, নিন ঠাকুরমশাই, দুধটা খেয়ে নিন–পুঁটি রোজ ভোরে আপনাকে দুধ দিয়ে যাবে। দুধ না খেলে শরীর টিকবে কেন?
ছোটমশাই দুধের গেলাসটা নিয়ে বললেন–আবার দুধ কেন কষ্ট করে আনতে গেলে অশ্বিনী, দুধ খাইয়ে আমাকে বাঁচিয়ে রেখে কার কী লাভ বলো দিকিনি? আর কার জন্যেই বা বেঁচে থাকবো? কেন বেঁচে থাকবো বলতে পারো? এত টাকা-কড়ি কাকে দিয়ে যাবো? কে আছে আমার?
অশ্বিনী রেগে গেল। বললে–ও-সব অলক্ষুণে কথা বলবেন না ঠাকুরমশাই, আপনার সম্পত্তি আপনার বংশধররাই ভোগ-দখল করবে–
–আমার বংশধর? আমার বংশধর আবার কোথায়?
অশ্বিনী ভট্টচার্য বললে–সে কী, বংশধর নেই বলে আপনি শরীরটা ঠিক রাখবেন না? আপনি বলছেন কী? বংশধর না-হয় এখন নেই, কিন্তু বংশধর হতে কতক্ষণ? আবার একটা বিয়ে করে ফেলুন, তখন আবার বংশধর হবে!
এবার আর হাসি চাপতে পারলেন না ছোটমশাই। বললেন–কী যে তুমি বলো অশ্বিনী, তার ঠিক নেই। এই বয়েসে আবার বিয়ে?
–কেন? আপনার আবার বয়েসটা এমন কী শুনি!
ততক্ষণে দুধ খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। গেলাসটা নিয়ে পুঁটি চলে যাচ্ছিল। অশ্বিনী মেয়ের দিকে চেয়ে বললে–রোজ ভোরে এমনি করে দুধ নিয়ে আসবি, বুঝলি? মনে থাকে যেন। ভুলিসনে—যা–
পুঁটি চলে গেল। কিন্তু অশ্বিনী গেল না। এই এত টাকার সম্পত্তির লোভটা সে মন থেকে দূর করতে পারলে না। সেই দিন থেকেই পুঁটি রোজ ভোরবেলা এসে দুধ দিয়ে যেতে লাগলো। একেবারে টাটকা গরুর দুধ। সেই গরম দুধ খেয়েই ছোটমশাই-এর শরীরটা বেশ ক’দিনের মধ্যেই চাঙ্গা হয়ে উঠতে লাগলো আবার। বেশ কাজ করতে ইচ্ছে হলো। মনেও বল পেলেন। এত শোক-দুঃখ সব ভুলে যেতে লাগলেন। গরম দুধ খাইয়ে পুঁটি চলে যেতেই অশ্বিনী এসে হাজির হতো। অশ্বিনী ভট্টাচার্য আসার পর থেকে বাজে লোকদের আনাগোনা একেবারে বন্ধ হয়ে গেল। বাজে লোকরা বাজে কথা বলে আর ছোটমশাই এর কাজ থেকে কিছু খসাতে পারতো না। অশ্বিনী ভট্টাচার্য একাই তখন মালিক, একাই তখন মালিকের রক্ষাকর্তা।
কিন্তু সব পণ্ড করে দিলে প্রকাশ। অশ্বিনী ভট্টাচার্য তখন কিছুই জানে না। বড় আনন্দে তখন দিন কাটছে তার। একবার যদি কোনও রকমে মেয়েটাকে ছোটমশাই-এর গলায় ঝুলিয়ে দিতে পারে তো বাস্। তখন আর কে তাকে পায়। তখন এই সুলতান-পুরের আর নবাবগঞ্জের বুকের ওপর বসে সকলের দাড়ি ওড়াবে সে, এইটেই তার জীবনের বড় জয়।
সেদিনও ভাগলপুরে সকাল হয়েছে, অন্য দিনকার মত সেদিনও অশ্বিনী ভট্টাচার্য পুঁটিকে সকাল-সকাল ঘুম থেকে উঠিয়ে দুধ আনতে পাঠিয়েছে। তারপর সেই দুধ উনুনে জ্বাল দেওয়া হয়েছে। তারপর সেজে-গুজে ছোটমশাইকে সেই দুধ আবার খাওয়াতে গেছে।
প্রকাশ রায় তখন ট্রেন থেকে নামলো। নেমে আর বেশি দেরি করেনি। সেখান থেকে সোজা একেবারে সুলতানপুর। তাড়াতাড়ি রিকশা থেকে নেমেই বাড়িটাতে ঢুকে পড়েছে। কতদিন সুলতানপুরে আসেনি সে। আগে বউ-ছেলে-মেয়ের কাছেই যাওয়া উচিত ছিল, কিন্তু তা তো রইলই। সে তো আর ফসকে যাচ্ছে না। আগে জামাইবাবুর সঙ্গে দেখা না করলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। দিদি নেই যে শুধু দিদিকে খাতির করলেই চলবে। এখন প্রকাশ রায়ের ভগবান বলো, আল্লা বলো, সব কিছুই ওই জামাইবাবু। জামাইবাবু রাখলে রাখবে মারলে মারবে।
কিন্তু জামাইবাবুর শোবার ঘরে গিয়ে দেখে অবাক কাণ্ড! এমন কাণ্ড যে দেখতে হবে তা প্রকাশ আশা করেনি। দেখে, জামাইবাবু একটা ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে দুধ খাচ্ছে, আর একটা মেয়ে পায়ের কাছে বসে জামাইবাবুর পা টিপে দিচ্ছে!
