নিরাপদ চক্রবর্তী টাকাটা হাত পেতে নিয়ে আশীর্বাদ করতে করতে চলে গেল। ছোটমশাই ভাবলেন আপদের শান্তি হলো। কিন্তু বিপদ শুরু হলো পরের দিন থেকেই। পরের দিন সকাল থেকেই দলে দলে লোক আসতে লাগলো। একজন আসে তো পিছু পিছু আসে আর একজন। সকলেরই এক আর্জি। টাকা। মুখুজ্জেমশাই নাকি সবাইকেই জীবদ্দশায় সাহায্য করতেন। সেই সাহায্য তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে যেন বন্ধ না হয়ে যায়। এই তাদের মিনতি।
সুলতানপুরের মানুষ যে এত ভিখিরি তা জানলে বোধ হয় ছোটমশাই আগে থেকেই সাবধান হয়ে যেতেন।
বললেন–আপনারা কি টাকার গাছ পেয়েছেন আমাকে? আমার শ্বশুরমশাই-এর কেউ ছিল না, তাই তিনি দিতে পারতেন, কিন্তু আমার তো তা নয়, আমার নবাবগঞ্জে সংসার রয়েছে–সেখানে খরচ করতে হয়–
একজন বললে–তাহলে নিরাপদ চক্রবর্তী মশাইকে কালকে দিলেন কেন?
হঠাৎ কোথা থেকে একজন ষণ্ডামার্কা লোক এসে হাজির হলো। হাজির হয়েই সকলকে তাড়া করলে–যান যান, আপনারা যান এখান থেকে, ঠাকুরমশাই এসেছেন এখানে, শোকে দুঃখে এখন কাতর হয়ে রয়েছেন, আর এই সময়ে কিনা তাঁকে বিরক্ত করা—যান–
বলতে গেলে সে-ই সকলকে তাড়িয়ে দিতে তবে ঠাণ্ডা হলো। একান্তে অত্যন্ত শুভাকাঙ্ক্ষীর মত কাছে এসে বললে–শুনুন ঠাকুরমশাই, এই সুলতানপুরের লোকগুলো বড় নচ্ছার পাজি, কাউকে একটা পয়সা দেবেন না, দেখেছে আপনি ভালো লোক, তাই একেবারে পেয়ে বসেছে। আপনি এখেনে নতুন লোক, কাউকে চেনেন না। আপনি যদি এমনি করে দান-খয়রাত শুরু করেন তো বিপদে-পড়বেন, আপনার জীবন একেবারে অতিষ্ঠ করে তুলবে এরা। আমি যাকে যাকে দিতে বলবো কেবল তাকে তাকে দেবেন–
ছোটমশাই হঠাৎ অতি-আত্মীয়তার সাবধানবাণীতে অবাক হয়ে গেলেন। বললেন–আপনি কে? আপনাকে তো আমি চিনতে পারছিনে–
লোকটা বললে–চিনবেন চিনবেন, আপনার শ্বশুরমশাই আমার পরামর্শ ছাড়া এক-পা নড়তেন না। হঠাৎ দরকার হলে রাত-বিরেতেও আমাকে ডাকতেন। বলতেন–অশ্বিনী, একবার আমার কাছে এসো তো একটা পরামর্শ আছে। তা তিনি তো এখন স্বর্গে চলে গিয়েছেন, এবার থেকে আপনিও ডাকবেন। তা খাওয়া-দাওয়ার কী ব্যবস্থা হয়েছে আপনার?
ছোটমশাই বললেন–আমার শালার পরিবার আছে। তারাই দু’বেলা যা’হোক দুমুঠো ফুটিয়ে দিচ্ছে–
–তা সে-খাবার আপনার মুখে রুচছে তো?
–কেন, ওকথা বলছেন কেন?
–না–না, মানে প্রকাশকে তো অমি চিনি। সে তো বরাবর বাউণ্ডুলে মানুষ ছিল। জানি না, এখন কেমন আছে। সে তা বউ ছেলে মেয়ে এখানে রেখে চিরকাল আপনার ঘাড়ে বসে খেয়েছে। তা এখন কোথায় আছে সে?
ছোটমশাই বললেন–কলকাতায়
–তা সে কলকাতায় থাকুক আর যেখানেই থাকুক, আপনার ও-সব-যা-তা খাওয়ার দরকারটা কী! এই মুখুজ্জেমশাই যে অকালে মারা গেলেন, তা কেন মারা গেলেন তা জানেন? কারণ ভালো যত্ন-আত্তি তো হতো না। আমায় একবার আড়ালে ডেকে বলেছিলেন–অশ্বিনী, আমি-আর এ সব ছাইপাঁশ খেতে পারছিনে, এই রকম খাওয়া খেলে আমি আর বেশি দিন বাঁচবো না। তুমি আমাকে ওদের হাত থেকে বাঁচাও। আমি বললুম ঠিক আছে, এবার থেকে আপনার বউমা রান্না করে দেবে, আপনি তাই-ই খাবেন, কিন্তু হলে হবে কী, দুদিন যেতে না-যেতেই গাঁয়ে কথা উঠলো। লোকে বলাবলি করতে লাগলো, আমি নাকি সম্পত্তি লিখিয়ে নেবার জন্যেই মুখজ্জেমশাইকে তোয়াজ করছি। এ রকম ছ্যাঁচড়া জায়গা তো আর পৃথিবীতে নেই ঠাকুরমশাই, তা শেষ পর্যন্ত যা হবার তা হলো, মুখুজ্জেমশাইকে মেরে তবে সবাই ঠাণ্ডা হলো।
লোকটার নাম অশ্বিনী ভট্টাচার্য। পর পর কদিন সকালে-বিকেলে আসতে লাগলো। এসেই জিজ্ঞেস করতো-খাওয়া হয়েছে?
ছোটমশাই বলতেন—হ্যাঁ–
–পেট ভরেছে তো?
–হ্যাঁ হ্যাঁ পেট ভরেছে
অশ্বিনী ভট্টাচার্য বললে–দেখবেন, এখানে লজ্জা করলে ঠকবেন। এমনি সবাই আপনাকে খাওয়ানোর জন্যে খুব আগ্রহ দেখাবে, বুঝলেন। প্রথম প্রথম আপনাকে সবাই অমন খোসামোদ করতে চাইবে, কিন্তু আপনি যেন কারো খোসামোদে ভুলবেন না, খোসামোদে ভুললেই একেবারে সব্বোনাশ–
–কেন আমাকে খোসামোদ করবে কেন সবাই?
অশ্বিনী ভট্টাচার্য বললে–খোসামোদ করবে না? কী বলছেন? আমার মতন কী নিঃস্বার্থ মানুষ সবাই? এখানকার সব মানুষ যে আপনার টাকার গন্ধ পেয়েছে। আপনার নিজের টাকা তো আছেই, তার ওপর মুখুজ্জে মশাই-এর টাকা, সবই যে আপনি একলা পেয়েছেন সেটা জানতে তো কারোর বাকি নেই। আমি নিজে ঠাকুরমশাই এই টাকা জিনিসটাকে বড্ড ঘেন্না করি। এই যে আপনার কাছে আমি আসি, কেন এত ঘন ঘন আসি বলুন তো? কেন?
ছোটমশাই বুঝতে পারলেন না। বললেন–কেন?
–কেন আসি শুনবেন? আসি, কারণ আপনাকে ভালোমানুষ পেয়ে সবাই যাতে ঠকিয়ে নিতে না পারে তাই। সুলতানপুরের লোক তো কেউ ভাল নয় ঠাকুরমশাই। মুখুজ্জেমশাইকেও ঠিক এই রকম ঠকাতো, আমি ছিলুম বলে তাই তিনি বেঁচে গেছেন, নইলে ভাবছেন এ-সব কিছু থাকতো, সব দশভূতে লুঠে-পুটে চেটে খেয়ে নিত–
অশ্বিনী ভট্টাচার্যি রোজ সকাল বেলা এসেই জিজ্ঞেস করতো–কেমন আছেন ঠাকুর মশাই আজ?
সেদিন ছোটমশাই-এর শরীর ভালো ছিল না। বললেন–তেমন ভালো নয়–
অশ্বিনী ভট্টাচার্য চিন্তিত হয়ে উঠলো–কেন? ভালো নয় কেন? খাওয়া-দাওয়া ভালো হচ্ছে না নিশ্চয়ই! এই জোয়ান বয়েসে ভালো করে না খেলে শরীর ভালো থাকবে কেমন করে? দুধ খাচ্ছেন?
