“আপনি আমাদের সংসারে আসার পর থেকে আমার জীবনে বিপর্যয় শুরু হয়েছে। আমার অতীত তো ছিলই না, বর্তমানও ছিল না। একমাত্র ভবিষ্যটুকুই টিম-টিম করে প্রদীপের মত জ্বলছিল। আপনি আসার পর আজ তাও হঠাৎ নিভে গেল। আমার অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ সব আজ নিঃশেষ হয়ে গেল। আপনি কেন এলেন? আমার মত হতভাগিনী নারীর এ সর্বনাশ করে আপনার কী লাভ হলো? আপনি কি এ বাড়ি থেকে চলে যেতে পারেন না? আমার মত নিরপরাধ নারীর উপকারের জন্য আপনি কি এই সামান্য কাজটুকুও করতে পারেন না? যদি এই উপকারটুকু করতে পারেন তো আমি আপনার ওপর চিরকৃতজ্ঞ থাকবো। ইতি
.
কীর্তিপদ মুখোপাধ্যায়ের শেষ জীবনটা যে নিঃসঙ্গ অবস্থায় কাটবে তা আগেই তার জানা ছিল। গৃহিণী আগেই গিয়েছিলেন, থাকবার মধ্যে ছিল এক মেয়ে। কিন্তু কন্যা-সন্তান হবার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ ধরে নেয় যে সে পরের ঘরে যাবার জন্যেই জন্মেছে। সুতরাং তার ওপর আশা-ভরসা কেউ করে না। কিন্তু সেই মেয়ের মৃত্যু-সংবাদও যখন কানে এল তখন আর তাঁর বেঁচে থাকবার কোনও অর্থ রইল না। ভেবেছিলেন সকলকে রেখে সকলকে সুস্থ সমর্থ দেখে তিনি পৃথিবী থেকে চলে যেতে পারবেন। তা আর হলো না। আগে মাঝে মাঝে নবাবগঞ্জ থেকে তবু চিঠি আসতো। চিঠির মধ্যে যদি দেখতেন লেখা আছে প্রীতিলতা ভালো আছে, সদানন্দ ভালো আছে, জামাইও সুস্থ আছে তাহলেই তিনি নিশ্চিন্ত হতেন। তাঁর আর কিছু কামনা ছিল না। পৃথিবী ভেসে যাক, ডুকে যাক, তাতে তাঁর কিছু এসে যেত না। শুধু প্রীতিলতা, সদানন্দ আর জামাই ভালো থাকলেই হলো।
আর জমি-জমা? ও তো থাকবেই। জমি-জমা থাকলেই প্রজা-পাঠক থাকবে, আর প্রজাপাঠক থাকলেই তারা খাজনা দেবে। আর যতদিন তারা খাজনা দেবে ততদিন তিনিও খেতে-পরতে পাবেন। তাছাড়া মানুষ আর কী চায়? একটা তো পেট তাঁর, কত আর তিনি খাবেন? জামাইএরও এমন অবস্থা নয় যে তাঁর সম্পত্তিতে ভাগ বসাতে চাইবে। বাকি রইল সদানন্দ। এই যা-কিছু তিনি রেখে গেলেন সবই শেষ পর্যন্ত তার।
এ-সব কথা তিনি অবসর সময়ে ভাবতেন আর ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়তেন। তখন প্রকাশের বউ এসে ডাকতো–পিসেমশাই, উঠুন, আপনার খাবার দেওয়া হয়েছে–
কীর্তিপদবাবু বলতেন–তুমি আমার খাবার ঢাকা দিয়ে চলে যাও, আমি পরে উঠে খাবো–
আসলে প্রকাশকেই দেখতে পারতেন না পিসেমশাই। তাঁর গৃহিণী কবে মারা গেছে তার ঠিক নেই কিন্তু টাকার লোভে গৃহিণীর সম্পর্কিত লোকেরা তাঁর সঙ্গ ছাড়েনি। তারা তখনও পেছনে লেগে রয়েছে, আঠার মত আটকে আছে সারা জীবন।
শেষকালে প্রকাশের বউ একদিন রাত্রে আবার ডাকতে লাগলো–পিসেমশাই উঠুন, আপনার খাবার দেওয়া হয়েছে–
কিন্তু সেদিন আর কেউ সাড়া দিলে না। আরো আনেকবার ডাকাডাকি হলো তবু সাড়া দিলেন না কীর্তিপদবাবু। তখনই চারদিকে খবরটা ছড়িয়ে পড়লো যে সুলতানপুরের কীর্তিপদবাবু মারা গিয়েছেন।
ধ্বংস যখন শুরু হয় তখন বোধ হয় এমনি করেই শুরু হয়। একদিন কালীগঞ্জের হর্ষনাথ চক্রবর্তীর শেষ দেখেছে পৃথিবী, শেষ দেখেছে নবাবগঞ্জের নরনারায়ণ চৌধুরীর, আবার বৌবাজারের সমরজিৎবাবুর শেষ দেখবার জন্যেও পৃথিবী অপেক্ষা করে আছে। আর এবার শেষ দেখলে ভাগলপুরের কীর্তিপদ মুখোপাধ্যায়ের। সে বড় নিঃশব্দ শেষ। আগে বাবার মৃত্যু হয়, তারপরে মৃত্যু হয় সন্তানের। এইটাই স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু কীর্তিপদবাবুর বেলা সে-নিয়ম উল্টে গেল। আগে সন্তান, তার পরে বাবা। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝিতে এসে পৃথিবীর সব নিয়মকানুন বুঝি পালটে গেল।
ছোটমশাই যখন সুলতানপুরে এসে পৌঁছোলেন তখন সব শেষ। নেহাৎ শেষ-কৃত্যটা না করলে নয় তাই করলেন। শ্রাদ্ধ-শান্তি সব কিছু চুকিয়ে আবার তার নবাবগঞ্জে ফিরে যাবার কথা। সেইভাবেই ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন মনে মনে। কিন্তু ফিরেই বা যাবেন কোথায়? সেই নবাবগঞ্জেও যা, এই সুলতানপুরেও তাই। সেখানেও সেই খাঁ-খাঁ বাড়িটার ভেতরে দম আটকে আসা নিঃসঙ্গতা, এখানেও তাই। শ্বশুরমশাই-এর বিরাট বাড়িটার রন্ধ্রে রন্ধ্রে যেন ছোটমশাই তাঁর দীর্ঘশ্বাসের নিঃশব্দ আর্তনাদ শুনতে পেলেন। খাতা-পত্ৰ-দলিল দস্তাবেজ দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। এত সম্পত্তি, এত ঐশ্বর্য, এত জমি-জমার মালিক ছিলেন তাঁর শ্বশুর, এতও বোধ হয় আগে কল্পনা করতে পারেননি তিনি। এ সব কিছুর মালিক তাহলে একলা তিনি।
একজন বৃদ্ধ লোক সেদিন খোঁড়াতে খোঁড়াতে সামনে এল।
–কে? কে তুমি?
–পেন্নাম হই ঠাকুর মশাই। আমি গরীব ব্রাহ্মণ এ-গ্রামের। অধীনের নাম শ্ৰীনিরাপদ চক্রবর্তী, আপনার প্রজা।
–কী চাই তোমার, বলো?
–মুখুজ্জে মশাই-এর কাছে আমার মাসোহারা বরাদ্দ ছিল তিন টাকা করে। তিনি প্রতি মাসে আমাকে টাকাটা দিতেন।
ছোটমশাই রেগে উঠলেন। বললেন–যিনি আপনাকে টাকা দিতেন তিনি তো আর এখন নেই। তিনি থাকলে নিশ্চয়ই আপনাকে মাসোয়ারা দিয়ে যেতেন, কিন্তু আমি এখন আর ওসব দিতে পারবো না।
নিরাপদ চক্রবর্তী বললে–তিনি ছিলেন আমাদের মা বাপ, তিনি নেই, এখন আপনিই আমাদের মা-বাপ, তাই আপনার কাছেই হাত পাতছি। দিলে গরীবের বড় উপকার হতো–
বিরক্ত হয়ে ছোটমশাই বাক্স থেকে একটা টাকা বার করে বৃদ্ধকে দিলেন। বললেন–যান, এর বেশি আর হবে না, এটা নিয়ে খুশী হয়ে চলে যান–
