–ও তুমি পাশেই রয়েছ, তা আমি যে এত চেঁচিয়ে মরছি তুমি রা কাড়ছো না কেন? তোমরা কি সব কানে তুলে দিয়ে রেখেছ? তোমাদের কি সব সময় কেবল ফাঁকি! ফাঁকি দেওয়া তোমাদের স্বভাব হয়ে গিয়েছে–
একগাদা নথিপত্র নিয়ে কৈলাস তখন হিমসিম খেয়ে যাচ্ছিল। তিন দিন তিন রাত ধরে সেই সব নথিপত্র নিয়েই কেটেছে সকলের। একবার কাছারি আর একবার কোর্ট করেছে। জমিদারী-সেরেস্তার কাজে তার মত বিশ্বস্ত লোক পাওয়াও কর্তামশাই-এর একটা ভাগ্য। কিন্তু তবু তার বকুনি খাওয়ার কপাল।
কর্তামশাই বললেন–ওসব নথিপত্র এখন রাখো,–
কৈলাস গোমস্তা বললে–আজ্ঞে, কাল যে মুনসিফের কোর্টে এ-মামলার শুনানী আছে– কর্তামশাই বললেন–রাখো তোমার শুনানী। জীবনে অনেক মামলা করেছি, তুমি আমাকে আর কোর্ট দেখিও না। আমি কি কোর্ট-এর নাম শুনলে ভয় পাবো? না-হয় ও বিল্টা যাবে। জীবনে অনেক বিল্ দেখেছি, আবার অনেক সম্পত্তি চলেও গিয়েছে আমার। আর আমি যদি বেঁচে থাকি অমন বিল্ আমি আরো দশটা নীলামে ডেকে নেব। এখন ও সব থাক্, শুনছো নাতি হয়েছে আমার, তুমি এখন আমাকে কোর্ট শোনাচ্ছো। যাও, ও সব রাখো। আমি আজকেই নবাবগঞ্জে ফিরে যাবো, তার ব্যবস্থা করো–
–এখুনি যাবেন?
–এখুনি যাবো না তো কি একদিন পরে যাবো? পরে গেলে দেরি হবে না? এ কি দেরি করার কাজ? যাও, গাড়ির বন্দোবস্ত করো, আর আমার বাক্স-বিছানা সব দীনুকে দিয়ে গুছিয়ে ফেল। রজব আলীকে ডেকে গাড়িতে গরু জুততে বলো–
এর ওপর আর কথা বলা চলে না। কৈলাস গোমস্তা বাইরে যাচ্ছিল সব বন্দোবস্ত করতে।
কর্তামশাই আবার ডাকলেন–হ্যাঁ, ভালো কথা, তার আগে আর একটা কাজ করো দিকিনি। বাজারের সনাতন স্যাকরাকে চেনো তো, তাকে গিয়ে বলো দশ ভরির সোনার হার যদি একটা তৈরি থাকে তো সেটা নিয়ে যেন এখুনি একবার আমার কাছে আসে–
তা সেইদিনই কর্তামশাই সেই দশভরি সোনার হার নিয়ে রজব আলীর গাড়িতে চড়ে গ্রামের দিকে রওনা দিয়েছিলেন। খাওয়া-ঘুমনো মামলা সব কিছু মাথায় রইলো। সব কিছু ফেলে কর্তামশাই নবাবগঞ্জে এসে ওই দশ ভরির সোনার হার দিয়ে নাতির মুখ দেখেছিলেন। এ নাতি যে তার কত আদিখ্যেতার নাতি তা আর কেউ না জানুক, কর্তামশাইএর অজানা ছিল না। ছেলের বিয়ে তিনি অল্প বয়েসেই দিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল তার বাড়ি নাতি নাতনীতে ভরে যাবে। তার সংসার বিলাস-বৈভবে ঐশ্বর্যে জাঁক-জমকে জমাট হয়ে উঠবে। কিন্তু তা হয় নি। তিনি অনেক খুঁজে-পেতে সুলতানপুরের জমিদার কীর্তিপদ মুখুজ্যের একমাত্র সন্তানকে নিজের ছেলের পাত্রী হিসেবে পছন্দ করে বউ করে নিজের বাড়িতে এনেছিলেন।
কিন্তু বিয়ের পর বহুদিন কেটে গেল, তবু সন্তানাদি কিছু হলো না দেখে বড় মুষড়ে পড়েছিলেন।
এই প্রকাশ তখন সবে হয়েছে। বাপ-মা মারা যাবার পর পিসীমার কাছেই থাকতো। পিসেমশাই কীর্তিপদ মুখুজ্জের ছেলে ছিল না বলে আদর-যত্ন পেত ছেলের মত। তারপর যখন প্রীতিলতার বিয়ে হয়ে সে নবাবগঞ্জে চলে গেল তখন ছোট ছেলের মত প্রকাশও দিদির সঙ্গে দিদির শ্বশুরবাড়িতে এল।
কিন্তু এ-সব জটিলকুটিল বংশতালিকার শুকনো বর্ণনা না দেওয়াই ভালো। তাতে গল্প দানা বাঁধতে পারে না। গল্প আত্মীয়স্বজনের ডালপালার ঘা লেগে হোঁচট খেয়ে খুঁড়িয়ে চলে। তার চেয়ে প্রকাশের যে পরিচয় দিচ্ছিলাম তাই দেওয়াই ভালো। কারণ এ উপন্যাস যাঁরা পড়ছেন তাদের এখন থেকেই জানিয়ে দেওয়া ভালো যে প্রকাশ রায় ভবিষ্যতে এ উপন্যাসে আরো অনেকবার উদয় হবে। পাঠক-পাঠিকারা এই চরিত্রটির সম্বন্ধে যেন একটু বিশেষ অবহিত থাকেন।
এদিকে সদানন্দ যখন বড় হলো তখন প্রকাশ রায় এ বাড়িতে রীতিমত আসর জমিয়ে বসেছে। এখানে একবার আসে একমাস দুমাস থাকে, আর দিদির কাছ থেকে কিছু টাকা হাতিয়ে নিয়ে আবার কিছুদিনের জন্যে অদৃশ্য হয়ে যায়।
যখন নবাবগঞ্জে থাকে তখন সদানন্দকে নিয়ে ঘোরে। কোথায় যাত্রা হচ্ছে, কোথায় কবির লড়াই হচ্ছে, পাঁচালী হচ্ছে, সেখানে ভাগ্নেকে সঙ্গে করে তার নিয়ে যাওয়া চাই।
নরনারায়ণ চৌধুরী হাজার কাজের মধ্যেও নাতির খবর নেন। বলেন–খোকা কোথায় গেল, খোকা? খোকাকে দেখছি নে যে?
কৈলাস গোমস্তা বলে–আজ্ঞে, খোকাবাবু শালাবাবুর সঙ্গে বেরিয়েছে–
জিনিসটা কর্তামশাইএর পছন্দ হয় না। কিন্তু কিছু বলতেও পারেন না। বউমার ভাই। কুটুম সম্পর্ক। শুধু বলেন–তোমাদের শালাবাবু লোকটা সুবিধের নয়, সিগ্রেট-টিগ্রেট খেতে দেখেছি–
কিন্তু প্রকাশের সে-দিকে ভ্রূক্ষেপ নেই। স্টেশন থেকে সোজা এসেই একেবারে কর্তামশাইএর পায়ের ধুলো নিয়ে মাথায় ঠেকায়।
কর্তামশাই প্রত্যেকবারই হচকিয়ে যান।
বলেন–কে?
–আজ্ঞে আমি প্রকাশ।
–প্রকাশ! নামটা যেন অনেকক্ষণ চিনতে পারেন না। তারপর একেবারে না চিনলে খারাপ দেখায় তাই বলেন–বেয়াই মশাই কেমন আছেন? বেয়ান? সবাই ভালো আছেন তো?
তারপরে আর কর্তামশাইএর সঙ্গে দেখা করা দরকার মনে করে না সে। সোজা চলে যায় দিদির কাছে। একেবারে অন্দর মহলে গিয়ে বলে–দিদি এলুম—
এক একদিন হাসতে হাসতে ঢোকে দিদির ঘরে। বলে–জানো দিদি, তোমার ছেলে খুব ইনটেলিজেন্ট হয়েছে—
দিদি বলে–কি রকম?
প্রকাশ বলে–ওকেই জিজ্ঞেস করো না—
দিদি খোকার দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করে কী হয়েছে খোকন?
