কাকীমা বললে–তাহলে তো আর কোনও কথাই ছিল না বাবা–তাহলে আর ভেবে ভেবে তোমার কাকাবাবুর এই রকম শরীর খারাপও হতো না। কিন্তু কপাল বাবা, আমাদেরই কপাল, নইলে তোমার মত ছেলে থাকলে কি আমাদের এত কষ্ট!
সমরজিৎবাবু উঠে বসে ছিলেন এতক্ষণ, এবার শুয়ে পড়লেন। কী রকম যেন ছটফট করতে লাগলেন।
কাকীমা কাছে গেল। বললে–কী হলো? তোমার কষ্ট হচ্ছে? বুকে হাত বুলিয়ে দেব?
মহেশ বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল, বাবুর কষ্ট দেখে সে এবার কাছে এগিয়ে এল।
সবাই সমরজিৎবাবুর সামনে গিয়ে মুখের কাছে মুখ নিয়ে গেল। কাকীমা বললে–কিছু খাবে? ওষুধ এনে দেব?
সমরজিৎবাবু মাথা নাড়লেন। অর্থাৎ, না।
–কিছুতেই খাবে না!
সদানন্দ অসহায়ের মত চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল। কাকীমা সদানন্দর দিকে চেয়ে বললে–তুমি একটু বলো না বাবা, তুমি বললেই উনি ওষুধ খাবেন, ডাক্তার অত করে বলে গেছে, তবু উনি কিছু খাননি–ডাক্তার ছানা খেতে বলেছিলেন, তাও তৈরি করিয়েছি, সকাল থেকে বকাবকিতে সে-সব কিছুই মুখে দিলেন না।
সদানন্দ কাকাবাবুর সামনে গিয়ে বললে–কাকাবাবু, ওষুধটা খেয়ে নিন না—
সমরজিৎবাবু আবার মাথা নাড়লেন–না–
সদানন্দ আবার বললে–ডাক্তারবাবুকে কি আবার ডেকে আনা হবে কাকাবাবু? মহেশ যাবে ডাক্তারবাবুকে ডাকতে?
সমরজিৎবাবু তখনও সেই একইভাবে মাথা নাড়তে লাগলেন–না–
কী যে হলো, সেই ভোরবেলা থেকে শুরু করে এই সংসারে যেন ঝড় বয়ে যেতে শুধু করেছিল। কিন্তু তার পরিণতি যে এমন হবে তা কে জানতো!
সদানন্দ কী যে করবে বুঝতে পারলে না। কাকীমার দিকে চেয়ে বললে–আপনি একটু বলুন কাকীমা, আপনার কথা হয়ত কাকাবাবু শুনবেন।
কাকীমা বললে–আমার কথা শুনবেন না, বরং তুমিই বলো। তোমাকে বড্ড ভালোবাসেন উনি, তোমার কথায় আপত্তি করতে পারবেন না–
সদানন্দ বললে–কিন্তু আমি কী বলবো বলুন তো কাকীমা, আমি কি ওঁর কথা রেখেছি যে উনি আমার কথা রাখবেন?
কাকীমা বললে–তা তুমি বলো না যে ওঁর কথায় রাজি, তাহলে আর উনি কিছুতেই খেতে আপত্তি করবেন না–
–বলবো?
–হ্যাঁ, বলো না। মুখের কথা বলতে তোমার ক্ষতিটা কী? তারপর যা ভালো বিবেচনা হয় তাই-ই করবে। বলো বাবা বলো, বুড়ো মানুষ, তোমার মুখের কথা শুনলে তবু ওঁর প্রাণটা ঠাণ্ডা হবে–
সদানন্দ আর দেরি করলে না। সমরজিৎবাবুর মুখের ওপর মুখ নিয়ে গিয়ে বললে– কাকাবাবু, আপনি যা বললেন তাইতেই আমি রাজি–আপনি শান্ত হোন, ওষুধ খেয়ে নিন–
এতক্ষণে সমরজিৎবাবুর মুখটা যেন কেমন উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। সদানন্দর দিকে চেয়ে কী যেন বলতে চাইলেন। কিন্তু বলতে না পেরে স্থির দৃষ্টি দিয়ে শুধুই সদানন্দকে দেখতে লাগলেন।
সদানন্দ বললে–আমি রাজি কাকাবাবু, আমি রাজি–
এবার ঠোঁটটা শুধু একটু নড়ে উঠলো।
–কিছু বলবেন?
সমরজিৎবাবু কী বললেন কেউ বুঝতে পারলে না।
–ডাক্তারবাবুকে ডাকবো?
সমরজিৎবাবুর ঠোঁটটা একটু যেন ফাঁক হলো। অস্পষ্ট গলায় বললেন—উকিল–
এতক্ষণে সবাই বুঝতে পারলে। মহেশ উকিলবাবুকে ডাকতে গেল। তারপর যখন উকিলবাবু এল তখন আরো অনেক বেলা হয়ে গেছে। তখন অনেকটা সামলে নিয়েছেন তিনি। বালিশের তলা থেকে সেই দলিল বেরোল, উইল বেরোল। সমরজিৎবাবুর সই করাই ছিল। সেখানে উকিলবাবুও নিজে সই করলে। সদানন্দকেও একটা সই দিতে হলো। সমরজিৎবাবুর এবং তাঁর স্ত্রীর অবর্তমানে তার যাবতীয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবে শ্রীমান সদানন্দ চৌধুরী। নিবাস নবাবগঞ্জ, স্টেশন রেলবাজার, থানা। হাঁসখালি, জেলা নদীয়া। আর তাঁর পালিত পুত্র শ্রীমান সুশীল সামন্তকে সমস্ত অধিকার হইতে বঞ্চিত করিয়া ইত্যাদি ইত্যাদি..
সমস্ত ঘটনাটা যখন মিটলো তখন বৌবাজারে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে হয়ে গেছে। নবাবগঞ্জে অত সকাল সকাল সন্ধ্যে হয় না। সমরজিৎবাবুকে ওষুধ খাইয়ে সকলে খাওয়া দাওয়া সেরে রান্নাঘরের পাট উঠতে আরো অন্ধকার হয়ে গেল। সমরজিৎবাবু তখন নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছেন।
কাকীমা বললে–তুমি এবার শুতে যাও বাবা, আমি তো আছি, তোমার সারাদিন খাটুনি গেছে খুব–
নিজের ঘরে এসেই সদানন্দ বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছিল। আলোটা নিভিয়ে দেবার কথাও তার খেয়াল হলো না। এ সে কী করলে! নয়নতারার জীবনটা নষ্ট করে দিয়ে সে এখানে এই সমরজিৎবাবুর সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়ে জীবন কাটাবে নাকি! এই নিচিন্ত আরামের মধ্যে এতদিনকার এত বিদ্রোহের পরিসমাপ্তি ঘটবে! তাহলে নবাবগঞ্জ কী দোষ করলে!
কাল সকালে ওই দলিল যথারীতি রেজিষ্ট্রি হয়ে যাবে। আইনকানুন-স্ট্যাম্প-সই-সাবুদ সমেত পাকাপোক্ত দলিল। কারো এক্তিয়ার নেই দলিলের হেরফের করে। তারপর থেকে। এই বাড়ির অকাতর উত্তরাধিকার একমাত্র তার। সমরজিৎবাবুর একমাত্র ওয়ারিশান সদানন্দ চৌধুরী। ও শুধু সম্পত্তির হিসেব। আসল চুক্তিটা আরো কঠিন আরো কঠোর। সদানন্দকে সারা জীবন এই সম্পত্তির দায়ভাগ বয়ে বয়ে বেড়াতে হবে। সমরজিৎ সামন্তর পূর্ব-পুরুষের সমস্ত পাপের বোঝা তার ওপরেই বর্তালো। স্বেচ্ছায় এবং বহালতবিয়তে সে এক মুহূর্তে নিজের পরিচয় আমূল পরিবর্তন করে দিলে! এক কালির আঁচড়ে, এক কলমের খোয়ায়। এ কী বিচিত্র জীবনের গতি তার। তার সৃষ্টিকর্তার এ কী নির্দয় পরিহাস।
হঠাৎ একটা অদ্ভুত জিনিস সদানন্দর নজরে পড়লো। সদানন্দ দেখলে তার ঘরের দরজার তলা দিয়ে কে যেন নিঃশব্দে একটা ভাজ করা কাগজ ঘরের ভেতরে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে সে বিছানা ছেড়ে উঠেছে। উঠেই কাগজটা কুড়িয়ে নিয়ে ভাঁজ খুলে পড়তে লাগলো। ওপরে নিচেয় কারো নাম নেই। তাতে মোটা মোটা মেয়েলী অক্ষরে লেখা রয়েছে–
