বলে গৃহিণীর দিকে চেয়ে বললেন–আমার সেই দলিলটা কোথায়?
কাকীমা বললে–তোমার বালিশের তলায় দেখ, ওখানেই রেখে দিয়েছ—
দলিলটা সমরজিৎবাবু নিজেই বালিশের তলা থেকে বার করে সামনে খুললেন। বললেন–এই দেখ, উকিলকে দিয়ে আমি সব কিছু পাকা করিয়ে রেখে দিয়েছি, তোমার নামটাও বসিয়ে দিয়েছি এখানে। তুমি রাজি হলে শুধু তোমার সইটা এখানে নিয়ে নেব, কালই উকিলবাবু এখানে আসবেন, তুমি রাজি তো?
সদানন্দ চুপ করে রইল।
–বলো রাজি কি না?
সদানন্দ বললে–আমাকে ক্ষমা করুন কাকাবাবু, আমি রাজি হতে পারলাম না– সমরজিৎবাবু বিস্ময়ে হতবাক হয়ে খানিকক্ষণ সদানন্দর মুখের দিকে চেয়ে রইলেন। তারপর বললেন–তুমি রাজি নও?
–না।
‘না’ শব্দটা বড় নিষ্ঠুর শোনালো সমরজিৎবাবুর কাছে। তিনি ঠিক এতখানি হয়ত আশঙ্কা করেননি। কিম্বা তাঁর মনে হলো তিনি হয়ত ভুল শুনছেন।
বললেন–সত্যিই তুমি রাজি নও?
সদানন্দ বললে–আমি একজনের সংসার ভাঙতে রাজি নই।
–আমার মনের শান্তির জন্যেও রাজি হতে পারো না? না হয় আমি মারা যাবার পর তুমি এ-সম্পত্তি অন্য কাউকে দিয়ে দিও। তখন তো আমি দেখতে আসছি না। কিন্তু আমি যতদিন বেঁচে আছি ততদিনের জন্যেও তুমি রাজি হতে পারো না সদানন্দ?
সদানন্দ বললে—না–কিছুতেই না, আমাকে আপনি এ ব্যাপারে আর মিছিমিছি পীড়াপীড়ি করবেন না–
বলে আস্তে আস্তে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। তারপর আবার যেমন এসেছিল তেমন নিঃশব্দে সিঁড়ি দিয়ে নিচের দিকে নামতে লাগলো। আসবার সময় তার মনে হলো যেন পেছনে অনেক দীর্ঘশ্বাস অনেক অশ্রুপাতের বোঝা সে কাকাবাবু আর কাকীমার মাথায় চাপিয়ে দিয়ে চলে এল। কিন্তু কাকে সে বোঝাবে যে এ তার ত্যাগ নয়, এ তার যন্ত্রণা। যে যন্ত্রণার হাত থেকে মুক্তি পাবার জন্যে সে এতদূরে এসে পৌঁছিয়েছে, এখানে এসেও কি সে সেই যন্ত্রণার শৃঙ্খল স্বেচ্ছায় নিজের গলায় তুলে নেবে! সদানন্দর মনে হলো তার পায়ের তলার মাটিটা যেন টলছে।
–শোন সদানন্দ; শোন, যেও না–
সমরজিৎবাবুর গলার আওয়াজ শুনে সে থমকে দাঁড়ালো। তারপর পায়ে-পায়ে আবার সে এসে ঘরে ঢুকলো। বললে–আমায় ডাকছিলেন?
–তুমি কী রকম ছেলে আমি বুঝতে পারছি না সদানন্দ! আমি তোমায় টাকা দিতে চাইছি আর তুমি নিচ্ছ না, এ তো বড় তাজ্জব ঘটনা? এমন তো হয় না। তুমি কি জানো আমার এ সম্পত্তির দাম?
সদানন্দ বললে–আমার জেনে কী লাভ?
সমরজিৎবাবু বললেন–কিন্তু একদিন তো তুমি আমার কাছে একটা চাকরিই চেয়ে ছিলে। তা তুমি চাকরি করবে?
–কী চাকরি?
–এই ধরো তুমি আমার কাছে কাছে থাকবে, আমার দেখাশোনা করবে, আমার সম্পত্তির হিসেবপত্র রাখবে। তার বদলে তুমি মাইনে নেবে, থাকবে, আর এখানে দুবেলা খাওয়া পাবে, রাজি?
সদানন্দ বললে–আগে হলে হয়ত রাজি হতুম কাকাবাবু, কিন্তু এত কাণ্ডর পর আর আমার রাজি হওয়া চলে না–
বলে আবার চলে যাচ্ছিল। কিন্তু কাকীমা বললে–তাহলে বাবা তোমার কাকাবাবু তো আজ কিছুই খাবেন না। তুমিও যখন খেলে না–
সদানন্দ বললে–আমার আর এসব কথা নিয়ে আলোচনা করতে ভালোই লাগছে না কাকীমা। কেবল মনে হচ্ছে আপনারা আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখতে চাইছেন। আমি তাহলে কীসের জন্যে বাড়ি থেকে চলে এসেছি, কীসের অভাব ছিল আমার? আমি কি আমার নিজের বাড়িতে নিজের পরিচয়ে নিজের সংসার নিয়ে আরামে থাকতে পারতুম না?
কাকীমা বললে–তা তো সত্যিই, তুমি সে-সব ছেড়েই বা চলে এলে কেন? কীসের জন্যে?
সদানন্দ বললে–সে বললেও আপনি বুঝতে পারবেন না কাকীমা, মানুষ কত নীচ হতে পারে তা কি আপনি জানেন? আপনারা আপনাদের ছেলেকে দেখেছেন, ভাবছেন অত বড় নীচ মানুষ আর নেই, কিন্তু আমার ঠাকুর্দাকে তো দেখেননি, তাহলে বুঝতেন পশুরাও বোধ হয় তার চেয়ে ভালো। আমার ঠাকুর্দার তুলনায় আপনার ছেলে তো দেবতা। তাই আপনারা যখন তার নিন্দে করছিলেন আমি তখন মনে মনে হাসছিলুম। ভাবছিলুম আপনারা যদি আমার ঠাকুর্দাকে দেখতেন, আমার বাবাকে দেখতেন তাহলে কী বলতেন। আমার লজ্জা এই যে আমি সেই বংশের ছেলে।
বলে সদানন্দ দুই হাতে মুখ ঢাকলো।
কাকীমা বললে–কিন্তু বউমাকে যে ছেড়ে চলে এলে, তাকে কে দেখবে? তার কী করে চলবে? কী নিয়ে সে থাকবে?
–ছেড়ে চলে না এসে কী করি বলুন? তার সঙ্গে সংসার করলে আমি শুধু চৌধুরী বংশ বৃদ্ধি করা ছাড়া আর কিছুই যে করতে পারতুম না।
–তা তুমি তো বাপের এক ছেলে?
–আপনারা কেউ বুঝবেন না কাকীমা, আমার যন্ত্রণার কথাটা কেউই কিছুতে বুঝবেন না। আমি কাকাবাবুর সঙ্গে যখন এখানে চলে এসেছিলুম তখন ভেবেছিলুম এখানে এসে অন্তত একটা চাকরি যোগাড় করে নিয়ে সকলের চোখের আড়ালে যে কটা দিন বাঁচি কাটিয়ে দেব, কিন্তু তাও আমার হলো না। আমি এখানে এসেও আবার আর একটা বাঁধনে জড়িয়ে পড়লাম, এখন আমি কী করি বলুন তো? আপনারা এমনভাবে আমাকে ভালবাসবেন এ তো আমি ভাবতে পরিনি। আপনারা কেন আমায় এত ভালবাসলেন? আপনারা কেন আমায় এত আপনার করে নিলেন? আপনারা কেন আমায় আপনাদের নিজের সর্বস্ব দিতে চাইছেন? কেন আমার এই ক্ষতি করছেন?
বলতে বলতে সদানন্দর চোখ দুটো লাল হয়ে উঠলো। যেন জ্বালা করতে লাগলো সে দুটো।
সদানন্দ চোখ দুটো কাপড় দিয়ে মুছে নিয়ে আবার বলতে লাগলো–আমার অনেক দুর্ভাগ্য যে আমি নবাবগঞ্জের চৌধুরী বংশে জন্মেছি, নাহলে আর আমাকে এই এত দুর্ভাগ্য সইতে হতো না। এত পাপ চোখ দিয়ে দেখতে হতো না। তার বদলে যদি আপনাদের এই সংসারে জন্মাতুম তো পৃথিবীতে কার কী ক্ষতিটা হতো? আমি নিজের জন্মের অধিকারেই এই যা-কিছু সব ভোগদখল করতুম। কারো কিছু বলবারও থাকতো না তাহলে–বাড়ি ছেড়ে পালাবারও দরকার হতো না–
