তিনি গৃহিণীর দিকে চাইলেন। বললেন–আমি জানতুম সদানন্দ আমার কথা রাখবে। তুমিই কেবল বলছিলে সদানন্দ আর থাকবে না এবাড়িতে, এবাড়ি ছেড়ে চলে যাবে। কেমন, এখন আমার কথাটা বিশ্বাস হলো তো?
কাকীমা বললে–তা আমি কী করে জানবো বলো, মহেশ ওদের দেশের বাড়ি দেখে এসে যা বললে–তাতে মনে হয়েছিল ও কেন এখানে থাকতে যাবে। এ-বাড়ির চেয়ে হাজার গুণ বড় ওদের বাড়ি, এদের জমি-জমা-সম্পত্তির কি শেষ আছে? মহেশ তো সব শুনে এসেছে–
সমরজিৎবাবু বললেন–আমি তোমাকে আজ একটা অনুরোধ করবো বাবা, তোমাকে আজ কথা দিতে হবে। তোমার কাছ থেকে কথা পেলে তবে আমি আজ খাবো।
সদানন্দ বললে–বলুন কী কথা?
সমরজিৎবাবু বলতে লাগলেন–তুমি এতদিন আমার এবাড়ির সব কিছু জেনে গেছ নিশ্চয়ই, আর আমরা যে ব্রাহ্মণ নই তাও তো তুমি জানো।
সদানন্দ বললে–আমি জাত মানি না–
সমরজিৎবাবু বললেন–সেই সাহসেই আমি তোমাকে বলতে সাহস পাচ্ছি বাবা, আমার কেউ নেই, আমার এমন কেউ নেই যে যাকে রেখে যার হাতে সব কিছুর ভার ছেড়ে দিয়ে আমি নিশ্চিন্ত হয়ে চলে যেতে পারি। তবু অন্তত বুঝবো এমন একজনের হাতে সব ভার দিয়ে গেলাম যে আমার পূর্বপুরুষের স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখবে–
বলে একটু দম নিলেন। তারপর বললেন–তুমি হয়ত বলবে আমার তো ছেলে রয়েইছে, তাহলে আর নতুন করে তোমাকে কেন অনুরোধ করছি। করছি এই জন্যে যে তার ওপর আমার আর ভরসা নেই–সে অমানুষ। সেই অমানুষের হাতে সব কিছু দিয়ে চলে গিয়ে আমি নরকে থেকেও শান্তি পাবো না–
সদানন্দ চুপ করে সব শুনছিল। কিছু উত্তর দিলে না।
সমরজিৎবাবু বললেন–তোমাকে আমি সেদিন এই কথাগুলোই বলতে গিয়েছিলাম, কিন্তু বাধা পড়েছিল। এখন আজ তুমি আমার সামনে বলো তুমি রাজি–
সদানন্দ বললে–আপনি কী বলতে চাইছেন আমি বুঝতে পারছি না—
সমরজিৎবাবু গৃহিণীর দিকে চেয়ে বললেন–তুমি বলে দাও আমি কী বলতে চাই—
কাকীমা বললে–আমি আর কী বলবো, তুমিই বলো না–
সমরজিৎবাবু বললেন–ঠিক আছে, তাহলে আমিই বলি। আমি আমার ছেলেকে আমার সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করে তোমাকে আমার সব কিছুর উত্তরাধিকারী করতে চাই–তুমি রাজি?
সদানন্দ কথাটা শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেল। এমন প্রস্তাব যে সমরজিৎবাবু কোনও দিন করতে পারেন তা সে কল্পনাই করতে পারেনি।
তার মুখ দিয়ে খানিকক্ষণ কোনও কথা বেরোল না। তারপর অনেক কষ্টে বললে–কিন্তু এ কথা আমাকে বলবার আগে আপনি কি সব দিক বিবেচনা করে দেখেছেন?
–হ্যাঁ, আমি সব ভেবে দেখেছি। যেদিন থেকে তুমি এখানে এসেছ সেইদিন থেকেই আমি ভেবেছি। ভেবে ভেবে আমি এই সিদ্ধান্তেই পৌঁছিয়েছি শেষ পর্যন্ত। আমি জানি তুমি ব্রাহ্মণ, আর আমি শুদ্র। তুমি বিবাহিত, তোমার অভিভাবকরা আছেন, তাও ভেবেছি। তারপর মহেশকে তোমাদের দেশে পাঠিয়ে অন্যান্য সব খবরও সংগ্রহ করেছি। তার পরেও আমি তোমাকে এই প্রস্তাব করছি–
সদানন্দ বললে–এ সম্বন্ধে আমাকে একটু ভাবতে সময় দিন কাকাবাবু–আমি এখনই এ-সম্বন্ধে কোনও কথা দিতে পারছি না—
সমরজিৎবাবু বললেন– না, তোমাকে আর ভাবতে কোনও সময় দেব না। এখনই তোমায় মত দিতে হবে
সদানন্দ বললে–এখনই মত দিই কী করে বলুন, আপনার ছেলেকেও তো জিজ্ঞেস করতে হবে, তিনি রাজি আছে কি না–
–ছেলে? আমার ছেলে? যার কথা বলছো তুমি সে আমার ছেলে নয়, সে কুলাঙ্গার, তাকে আবার জিজ্ঞেস করবো কী? জানো তুমি সে মদ্যপ, লম্পট, সে চরিত্রহীন। অমন সোনার প্রতিমা দেখে তাকে বিয়ে দিয়েছি, তবু সে রাত্রে বাড়িতেও আসে না, অন্য আর একটা সংসার আছে তার। অমন ছেলেকে জিজ্ঞাসা করবো আমি? সে কী মানুষ যে তাকে আমি জিজ্ঞেস করবো? আমার বউমাকে তুমি দেখনি বাবা, বিয়ে হওয়ার পর থেকে আমার বউমার মুখে কেউ কখনও হাসি দেখেনি, তা জানো? ছেলে শুধু আমাদের জীবনই নষ্ট করেনি, সে বউমার জীবনটাও নষ্ট করে দিয়েছে। আমার বউমার জন্যে আমার বড় কষ্ট হয়, মনে হয় তার কষ্টের জন্যে তো আমিই দায়ী। বউমা সারাদিন কারো সঙ্গে কথা বলে না, কেউ তার মুখও দেখতে পায় না। এ দুঃখ তো আমার জন্যেই, আমিই তো ওই বউকে ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে ঘরে এনেছি–
সদানন্দ বললে–কিন্তু তবু সব শোনার পর আপনার ছেলে যদি আপত্তি করেন?
–আপত্তি করলে করতে পারে। কিন্তু আমার জিনিস আমি যাকে খুশী দিয়ে যাবো তাতে কার কী আপত্তি আছে তা জানবার আমার দরকার নেই; জানতে চাইও না।
–কিন্তু তার সঙ্গে আমার এ বিরোধ বাধিয়ে দরকার কী? আমি তো এ-সব কিছুই চাই না, আমার এসব দরকারও নেই। অথচ এই নিয়ে হয়ত তিনি ঝগড়া বিবাদ-মামলা করবেন, তখন কী হবে? তারপর তিনি বিবাহিত, তাকে যদি আপনি ত্যাগ করেন তাহলে তো এবাড়িও তাঁকে ত্যাগ করতে হবে?
–নিশ্চয় ত্যাগ করতে হবে। তাকে আমি আর এবাড়িতে থাকতে দেব না—
সদানন্দ যেন মহা বিপদে পড়লো। এ কী বিপত্তি!
বললে–কিন্তু তাঁর স্ত্রী? তাঁর সহধর্মিণী?
সমরজিৎবাবু বললেন–তুমি কি ভেবেছ আমি সেকথা ভাবিনি? সে ব্যবস্থাও আমি করে রেখেছি। তার যাবজ্জীবন ভরণ-পোষণের জন্যে যা করা প্রয়োজন তার সমস্ত ব্যবস্থা আমি করে যাবো। তিনি ইচ্ছে করলে এ বাড়ির একটা অংশে থাকতে পারেন আর তাঁর যদি অভিরুচি হয় তিনি তাঁর স্বামীর সঙ্গে চলে যেতেও পারেন–তার ভবিষ্যতের জন্যে আমার একটা দায়িত্ব আছে বলেই আমি এটা করেছি–
