শেষকালে সদানন্দ আর থাকতে পারলো না। কাকীমার গলার আওয়াজ এল বাইরে থেকে–হ্যাঁ বাবা সদানন্দ, তুমি না খেলে যে আমরাও কেউ খেতে পারছি না, আমরাও তোমার মত সারাদিন উপোস করে থাকবো বলতে চাও?
সদানন্দ তাড়াতাড়ি দরজা খুলে দিলে। খুলতেই দেখলে মহেশ দাঁড়িয়ে আছে। পাশে কাকীমা।
কাকীমা বললে–কী বাবা, তুমি কি চাও আমরাও তোমার মত সারা দিন উপোস করি?
সদানন্দ অপরাধীর মত চুপ করে রইল।
কাকীমা আবার বললে–তোমার কাকাবাবু রোগী মানুষ, জানো তুমি খাওনি শুনে তিনিও জলস্পর্শ করেননি। বউমাও এতক্ষণ খায়নি, আমি এখুনি তাকে খাইয়ে দিলুম। কত বেলা হলো তা জানোনা। বিকেল তিনটে বেজে গেছে যে ঘড়িতে–
সদানন্দ বললে–কিন্তু আপনি আর কাকাবাবু আপনারা খেয়ে নিলেন না কেন?
কাকামী বললে–তুমি তো বেশ কথা বললে–বাবা, তুমি বাড়ির ছেলে হয়ে না-খেয়ে রইলে আর আমরা বুড়োবুড়ি খেয়ে নেব? তা কখনও কেউ পারে?
সদানন্দ বললে–কিন্তু কাকাবাবু তো রোগী মানুষ, তাঁকে যা খাওয়ার খেতে দিলেন না কেন?
কাকীমা বললে–আমি তো অনেক বলেছি, এখন তুমি বলে কয়ে যদি তাঁকে খাওয়াতে পারো তো দেখ, আমার কথা তিনি শুনবেন না–
সদানন্দ আর কী করবে। বললে–চলুন দেখি, আমি বুঝিয়ে বলছি–
বলে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে কাকাবাবুর ঘরে গেল। সমরজিৎবাবু তখন ক্লান্ত হয়ে বিছানায় শুয়ে ছিলেন। সকাল থেকে অনেক উত্তেজনা গেছে। অসুস্থ শরীর নিয়ে অনেক তর্ক-বিতর্ক করেছেন ছেলের সঙ্গে। জীবনে তিনি কখনও কষ্ট পাননি। অনায়াস-লব্ধ অর্থ তাঁকে কেবল আরামই দিয়েছে, কিন্তু সে-অর্থের অসদ্ব্যয় করবার দুর্মতি তাঁর কখনও হয়নি। তিনি জানতেন তার অনুপার্জিত অর্থের ওপর তাঁর নিজস্ব কোনও অধিকার নেই। তাই নিজের ভরণ-পোষণের জন্যে যেটুকু দরকার সেটুকু রেখে বাকিটুকু তিনি দান-ধ্যান ব্যয় করেছেন। তারপরে আছে পরলোকের চিত্তা। পূর্বপুরুষের স্মৃতিটুকুই ছিল তাঁর একমাত্র পুঁজি। ওই পুঁজিটুকু তিনি কার কাছে গচ্ছিত রেখে যাবেন এই চিন্তাই মাঝে-মাঝে তাঁকে পীড়িত করত। যাকে তিনি দত্তক নিয়েছিলেন তার ওপরেই তার ভরসা ছিল। কিন্তু দিনে দিনে যখন তাঁর ছেলের উদ্ধৃঙ্খলতা তাঁকে উৎপীড়নের শেষ সীমায় নিয়ে গিয়ে পৌঁছিয়েছিল ঠিক তখনই এই সদানন্দের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। তারপর যত দিন যেতে লাগলো ততই তিনি সদানন্দের দিকে আকৃষ্ট হতে লাগলেন। স্থির করলেন এই সদানন্দের হাতেই তিনি পূর্বপুরুষের সমস্ত স্মৃতির পুঁজি গচ্ছিত রেখে দিয়ে শেষ নিঃশ্বাস ফেলবেন।
কিন্তু সদানন্দ নিজেই সে-সাধে বাধ সাধলো সেদিন।
কেন যে সদানন্দ সমস্ত কিছু অস্বীকার করলে তার কিছু যুক্তিসঙ্গত কারণ তিনি খুঁজে পেলেন না। তবে কি সদানন্দ এ-সব কিছুই পছন্দ করছে না? তাহলে তিনি কী করবেন? কার হাতে সব কিছু তুলে দিয়ে তিনি নিজের শেষ-জীবনের পরিত্রাণ খুঁজবেন?
–ওগো, এই তোমার সদানন্দ এসেছে।
সমরজিৎবাবু চোখ খুললেন। খুলে সামনেই সদানন্দকে দেখে তাঁর ঠোঁটের ফাঁকে একটা ম্লান হাসি ফুটে উঠলো।
সদানন্দ বললে–কাকাবাবু, আপনি কিছু খাচ্ছেন না কেন?
সমরজিৎবাবু বললেন–তুমি না খেলে কি আমি খেতে পারি? আমিও ঠিক করেছি খাবো না কিছু–
–কিন্তু কেন? কেন আপনি খাবেন না? আমার না খাওয়ার কারণ তো আপনি জানেন! চোখের সামনে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যে অভিযোগগুলোর প্রতিবাদ করতেও আমার ঘেন্না হলো। অথচ সেই কথাগুলোই দেখলুম আপনারা নির্বিবাদে বিশ্বাস করে গেলেন–
সমরজিৎবাবু বললেন–তা বলে কোনও অবস্থাতেই কি অত রাগ করতে আছে সদানন্দ। আমি তোমাকে সুস্থ মানুষ বলেই জানতুম। তোমার কাছে আমি এরকম ব্যবহার আশা করিনি। তুমি কি জানো না যে বিশ্বাস করার মধ্যেই মনের উদারতা প্রকাশ পায়?
সদানন্দ বললে–তা বলে কারো মুখের কথায় কালোটাকে সাদা বলে বিশ্বাস করতে হবে?
সমরজিৎবাবু বললেন–তুমি এতদিনেও আমার ছেলেকে চিনলে না? তা যদি না চিনে থাকো তো তুমি আমাকেও চেনোনি। আমাকে যদি ভালো করে চিনতে তাহলে আর এমন করে আমার ওপর রাগ করে নিজেও কষ্ট পেতে না, আমাকেও কষ্ট দিতে না–
কাকীমা হঠাৎ বলে উঠলো–কিন্তু বাবা, তুমি করেছিলে কী যে তোমার ছবি খোকাদের অফিসে চলে গেল?
সদানন্দ বললে–আমার কাছে এর উত্তর চাইবেন না কাকীমা। যদি উত্তরের জন্যে বেশি পীড়াপীড়ি করেন তো আমাকে এবাড়ি থেকে চলে যেতে হবে। এর চেয়ে ঘৃণ্য জিনিস আর কিছুই নেই–
–তা তোমার নামে কি কোনও পুলিস-কেস হয়েছিল কখনও?
সমরজিৎবাবু মাঝখানে বাধা দিয়ে উঠলেন। গৃহিণীর দিকে চেয়ে বললেন–তোমার ছেলেই ভালো আর সদানন্দ খারাপ এই-ই কি তোমার কথা?
সদানন্দ বলে উঠলো–আত্মসমর্থনে কোনও কথা বলাই আমার কাছে ঘেন্নার জিনিস। তার জন্যে আমি কারো কাছে কোনও কৈফিয়ৎ দিতে রাজি নই, এমন কি তার চেয়ে এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়াও আমার পক্ষে সোজা–
কাকীমা বললে–না বাবা, তাহলে তোমাকে বলতে হবে না। বরং তুমি খেয়ে নাও, আমরাও দুটি মুখে দিই–
বলে ডাকলে–মহেশ, দাদাবাবুর খাওয়ার ব্যবস্থা করে দে–
সদানন্দ বললে–আমি খাবো, কথা দিচ্ছি আমি খাবো, কিন্তু কাকাবাবু অসুস্থ মানুষ, আগে কাকাবাবু খান–
কথাটা শুনে সমরজিৎবাবু হাসলেন। হাসি ঠিক নয় সেটা, যেন কান্নারই তা আর এক রূপ।
