সমরজিৎবাবু বললেন–সে যাই হোক, তোমার চেয়ে সদানন্দ ভালো তার প্রমাণ আমার আছে–সে প্রমাণ নিয়ে তবে আমি কথা বলছি–
বড়বাবু বললে–আমার কাছেও প্রমাণ আছে–
সদানন্দ এবার আর পারলে না। সে সমরজিৎবাবুর কাছে গিয়ে বললে–কাকাবাবু আপনি চুপ করুন, আপনার শরীর খারাপ, আমি আর এ সমস্তর মধ্যে থাকতে চাই না। আমাকে আপনি মুক্তি দিন, আমি চলে যাই–আপনাদের সংসারে আমি কেন মিছিমিছি অশান্তির সৃষ্টি করি মাঝখান থেকে–
সমরজিৎবাবু বললেন–কেন তুমি চলে যাবে? তুমি কি ওকে ভয় পাচ্ছ নাকি? ও পুলিসের চাকরি করে বলে ভেবেছে ওর যা ইচ্ছে তাই করবে?
সদানন্দ বললে–না, সেজন্যে নয়, আমার টাকা-পয়সা-জমি-জমার কিছুতেই দরকার নেই–ওসব আমি অনেক দেখেছি–
সমরজিৎবাবু বললেন–তোমাকে কিছু বলতে হবে না, আমি তোমার সম্বন্ধে সব খবর পেয়ে গেছি, মহেশকে নবাবগঞ্জে পাঠিয়ে আমি সমস্ত খবর এনেছি। আমি তোমাকে আমার বাড়িতে রাখবো। তোমার টাকার অভাব নেই তাও আমি জানি। কিন্তু আমার অভাব আছে তোমার মত ছেলের–
বড়বাবু বললে–কিন্তু যদি প্রমাণ করতে পারি ও একটা ইমপসটার, একটা স্কাউন্ড্রেল–
সমরজিৎবাবু বললেন–স্কাউন্ড্রেল ও নয়, তুমি! আমি অনেক পাপ করেছিলুম তাই তোমার মত স্কাউন্ড্রেলকে আমি নিজের ছেলের মতন মানুষ করতে চেয়েছিলুম–
কাকীমার আবার ভয় হয়ে গেল। কাছে গিয়ে বললে–ওগো তুমি চুপ করো, চুপ করে শুয়ে পড়ো–তোমার শরীর খারাপ–
সমরজিৎবাবু বললেন–আমায় তুমি চুপ করতে বোল না, আমার যদি আজ শক্তি থাকতো তো আমি অমন ছেলের গলা টিপে মেরে ফেলতুম, তবে চুপ করতুম–সদানন্দকে বলে কিনা স্কাউন্ড্রেল, বলে কিনা সদানন্দের পুলিস-রিপোর্ট আছে–
–হ্যাঁ আছে, আমি আপনাকে প্রমাণ দেখাচ্ছি এক্ষুনি–প্রমাণ আমার ব্যাগের মধ্যেই আছে–
বলে বড়বাবু হঠাৎ ঘর থেকে বেরিয়ে তার পাশের ঘরে চলে গেল। আর তার খানিকক্ষণ পরেই একটা ছবি নিয়ে ফিরে এল। বললে–এই দেখুন, এটা ফোটোগ্রাফ কিনা। আপনারা দেখুন, মিলিয়ে দেখে নিন–
কাকীমা দেখলে, সমরজিৎবাবুও দেখলেন–হ্যাঁ, সদানন্দেরই ফোটোগ্রাফ সেটা। কোনও সন্দেহ নেই।
বড়বাবু বললে–এতক্ষণ আমার কথা বিশ্বাস হচ্ছিল না, এখন বিশ্বাস হলো তো?
সবাই তখন বিস্ময় বিমূঢ়।
বড়বাবু আবার জিজ্ঞেস করলে–বলো, বলো কার ছবি এটা?
কারোর মুখেই কোনও কথা নেই। সকলের মনের এতদিনকার বিশ্বাসের ভিত্তিভূমি যেন একটা প্রচণ্ড নাড়া খেয়ে একেবারে অসাড় হয়ে গেছে।
–বলো তোমরা, চুপ করে রইলে কেন, বলো?
কাকীমা আর থাকতে পারলে না। খোকাকে জিজ্ঞেস করলে–তা ওর ছবি তোর কাছে এলো কী করে?
বড়বাবু বললে–যার ছবি তাকেই জিজ্ঞেস করো না! সে তো তোমার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে!
সদানন্দ আর দাঁড়ালা না সেখানে। সকলের বিমূঢ় দৃষ্টির সামনে থেকে নিজেকে আড়াল করবার জন্যে সে ঘরের বাইরে চলে এলো। তারপর সোজা সিঁড়ি দিয়ে একেবারে তার নিজের ঘরে। আর তারপর ঘরের ভেতরে ঢুকে ভেতর থেকে দরজায় খিল তুলে দিলে।
.
কিন্তু সেইভাবে কতক্ষণ কেটেছিল কে জানে, হঠাৎ বাইরে থেকে মহেশ দরজায় ধাক্কা দিতে লাগেলো–দাদাবাবু, দরজা খুলুন, দাদাবাবু–
সেদিন সেই কতকাল আগে বৌবাজারের একটা বাড়ির একখানা দরজা বন্ধ ঘরের ভেতরে সদানন্দর মনে যে-প্রতিক্রিয়া হয়েছিল তা আজও মনে আছে। তারপরে এতদিন কেটে গেছে, এত বিপর্যয় আর এত বিশৃঙ্খলার মধ্যেও তার স্মৃতি এতটুকু ম্লান হয়নি।
মনে আছে সারাদিন সে সেই ঘরের মধ্যেই কাটিয়ে দেবে ঠিক করেছিল। তার মনে হয়েছিল কী হবে তার সেখানে থেকে। ভাগ্যের কোন্ এক অমোঘ তাড়নায় যখন সে নিজের ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে তখন সারা পৃথিবীটাই তো তার ঘর। তবে আর কেন সে ঘরের মায়া করছে। এই চারটে দেয়াল ঘেরা আশ্রয়ে এসে সে কি আর একটা বন্ধনের মধ্যে আটকে থাকবে?
মাঝখানে কতবার মহেশ দরজায় ধাক্কা দিয়েছে–দাদাবাবু দরজা খুলুন–দরজা খুলুন–
কিন্তু যে স্থির-প্রতিজ্ঞ মানুষ একদিন সহস্র মায়ার আকর্ষণকে উপেক্ষা করে আসতে পেরেছে, সে কি আর এই সামান্য সমরজিৎবাবুর ক’টা টাকার আকর্ষণে ভুলবে। একদিন কর্তাবাবুর কথায় ভুলেছে সে, একদিন কর্তাবাবুর কথায় নয়নতারার মত একটা নির্দোষ মেয়ের জীবন সে নষ্ট করে দিয়েছে। নয়নতারা তার স্বামীকে হারিয়েছে, নয়নতারার মা হবার সম্ভাবনাও সে নষ্ট করে দিয়েছে, এর পরও যদি এখানে এই সমরজিৎবাবুর আশ্রয়কেই সে আঁকড়ে ধরে থাকে তাহলে তার বিধাতাপুরুষের কাছে সে কোন্ কৈফিয়ৎ দেবে? নিজের জীবনে তার কি আরাম করবার কোনও অধিকার আছে? তার শরীরের আর মনের সুখভোগ করবার সমস্ত মালিকানা স্বত্বই তো সে স্বেচ্ছায় পরিত্যাগ করে চলে এসেছে। এই ত্যাগ আর কৃচ্ছসাধনের মধ্যে দিয়েই তো তাকে সারাজীবন পূর্বপুরুষের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করে যেতে হবে। এর থেকে তো তার আর মুক্তি নেই। অন্যের জীবন নষ্ট করে দিয়ে নিজের আরাম-ভোগের মধ্যে যে নীচতা তা যেন তাকে কখনও স্পর্শ না করে। সেই নীচতা থেকে যেন সে পরিত্রাণ পায়।
আবার দরজায় ধাক্কা দিতে লাগলো মহেশ।
ডাকতে লাগলো–দাদাবাবু, দরজা খুলবেন না? দরজা না খুললে কিন্তু আমি দরজা ভেঙে ফেলবো–
কিন্তু এততেও সদানন্দ অচল-অটল-প্রতিজ্ঞ হয়ে দাঁতে দাঁত চেপে যেমন শুয়ে ছিল তেমনিই শুয়ে রইল।
