–কাকীমা বললে–আমাকে কেন ও-সব কথা জিজ্ঞেস করছিস? আমি কি কোনও ব্যাপারে থাকি? যে বাড়ির মালিক তার অসুখ ভালো হলে তাকে জিজ্ঞেস করিসখ, এখন ও-মানুষ ঘুমোচ্ছেন, এখন চেঁচামেচি করছিস কেন?
বড়বাবু বললে–তা যতদিন কর্তার অসুখ থাকবে ততদিন ওকে এ বাড়িতে রাখবে নাকি তোমরা?
কাকীমা বললে–ওরে খোকা, তুই চুপ কর, একটু আস্তে কথা বলতে পারিস নে?
–আমি যা বলছি আগে সেই কথার জবাব দাও। এ কতদিন আমাদের এখানে আছে? কী করতে আছে? এর সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা কী? আমি তোমার কাছে সেই কথাটা আগে জানতে চাই–
কাকীমা বললে–ওরে তুই কেন এখন আসতে গেলি? কে তোকে এখন আসতে বললে? আমি সকাল থেকে ওই মানুষকে নিয়ে পড়েছি, বিপদের ওপর বিপদ চলছে আমার, আর তার ওপর তুই এখন এলি জ্বালাতে? তোর এত বয়েস হলো, একটা আক্কেল-জ্ঞান বলে কিছু থাকতে নেই?
বড়বাবু বলে উঠলো–আমার আক্কেলের কথা আমি বুঝবো, কিন্তু তোমাদের আক্কেলটাই বা কী রকম? একটা চোর-ডাকাত কি না ঠিক নেই, তাকে তোমরা একেবারে অন্দরমহলে এনে ঢোকালে!
কাকীমা বলে উঠলো–তোর সঙ্গে আমি এখন কথা বলতে পারি নে, তুই যা, তুই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যা এখন–
–কেন বেরিয়ে যাব? আমার নিজের বাড়ি থেকে কেন বেরিয়ে যাবো?
কাকীমা মহেশকে ডাকলে–ওরে মহেশ, তোর বড়দাদাবাবুকে বাইরে বার করে দিয়ে আয় না, আমি যে আর পারছি না-রে–
বড়বাবু বললে–দেখ, অনেকদিন তোমরা আমাকে বার করে দিয়েছ বাড়ি থেকে। কিন্তু ভেবো না আজকে আমি নেশা করেছি। আমি যা বলছি সব ভেবেচিন্তেই বলছি, আমি আজ আর বেরিয়ে যাবো না।
মহেশ তখন কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল।
কাকীমা তাকে লক্ষ্য করে বললে–কী রে, কথা কানে যাচ্ছে না তোর?
মহেশের তবু সাহস হচ্ছিল না। সে যেমন দাঁড়িয়ে ছিল তেমনি দাঁড়িয়েই রইল।
বড়বাবু এবার সদানন্দের দিকে এগিয়ে এল। বললে–আপনি দাঁড়িয়ে কী দেখছেন, বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান
সদানন্দ যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। এতটুকু নড়লো না। যেন কারোর কোনও কথা তার কানে ঢোকেনি।
কাকীমা নিজেই এবার ছেলে আর সদানন্দর মাঝখানে এসে দাঁড়ালো। বললে–কেন ওকে যেতে বলছিস তুই? কর্তা ওকে নিজে এখানে এনে তুলেছেন, চলে যেতে বললে–কর্তা নিজেই বলবেন—
বড়বাবু বললে–আমিও এ বাড়ির মালিক, আমারও ওকে চলে যেতে বলবার অধিকার আছে। আমিই ওকে চলে যেতে বলছি, ও যাক–
এতক্ষণে কর্তার বোধ হয় একটু তন্দ্রা ভাঙলো। চেঁচামেচিতে তিনি চাইলেন এদিকে। দুর্বল গলায় বললেন–কে? কী হয়েছে?
কাকীমা সঙ্গে সঙ্গে কাকাবাবুর কাছে গিয়ে বললেন তুমি কেমন আছো? বুকের ব্যথাটা আছে এখনও?
সে কথার উত্তর না দিয়ে সমরজিৎবাবু বললেন–ও কে এসেছে?
কাকীমা বললে–খোকা তোমার অসুখের খবর পেয়ে এসেছে–
–ও চেঁচাচ্ছে কেন?
বড়বাবু বললে–আমি বলছি এ আমাদের বাড়িতে আছে কেন? একে আপনি আমাদের বাড়িতে কেন থাকতে দিয়েছেন?
–কার কথা বলছিস তুই?
কাকীমা বললে–খোকা সদানন্দকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিচ্ছে–
–কেন?
সমরজিৎবাবু সামান্য কথা বলতে গিয়ে হাঁফাচ্ছিলেন। যেন মনে হলো তিনি উত্তেজিত হয়ে উঠেছেন।
বড়বাবু বললে–আপনি কেন যেখান থেকে যাকে-তাকে বাড়িতে এনে ঢুকিয়েছেন? যাকে চেনেন না তাকে কী বলে বাড়িতে তুলেছেন?
সমরজিৎবাবু সেই অসুস্থ শরীর নিয়েই ছেলের দিকে খানিকক্ষণ চেয়ে রইলেন। তারপর উঠে বসলেন। ক্লান্ত শরীরটা যেন তিনি আর বইতে পারছে না। বললেন–কী করে তুমি জানলে যে আমি ওকে চিনি না, জানি না? আমি না জেনে ওকে আমার বাড়িতে এনেছি, কে তোমাকে বললে?
কাকীমা কাছে গিয়ে বললে–ওগো তুমি উঠে বসলে কেন, শোও, শুয়ে পড়ো–
সমরজিৎবাবু কাকীমার কথায় কান না দিয়ে বললেন–বলো কে তোমাকে বললে।
বড়বাবু বললে–কেউ আমাকে বলেনি, আমি নিজে জানি। আমাদের পুলিস রিপোর্ট আছে–
–রেখে দাও তোমাদের পুলিস রিপোর্ট! আজ তোমাকে একটা কথা বলে রাখছি শুনে নাও, আজ থেকে তুমি আমার ছেলে নও–
কাকীমা বলে উঠলো–ওগো তুমি চুপ করো, তোমার শরীর খারাপ, শুয়ে পড়ো তুমি–
–না, আমি শোব না, এ ভেবেছে কী? ভেবেছে ও যা করবে আমি তাই সহ্য করবো? ও পুলিসের চাকরি করে বলে আমি ওকে ভয় পাবো? ও জানে না যে এ বাড়ির ছেলে নয় ও! আমি এ বাড়িতে ওকে ঠাঁই না দিলে ও এই লেখাপড়া শিখতো, না খেতে পেত? ওকে মানুষ করেছে কে? ওর বাবা না আমি? কে ওকে ছোটবেলা থেকে খাইয়ে-পরিয়ে বড় করেছে? ও আজ এত বড় লায়েক হয়েছে যে আমারই খেয়ে-পরে আবার আমার ওপরেই চোটপাট করে? এত বড় নির্লজ্জ যে মদ খেয়ে মাতাল হয়ে আমার বাড়িয়ে ঢোকে। বাড়িতে বউমা থাকতে বাইরে রাত কাটায়?
বড়বাবুও গলা চড়ালো। বললে–যা করি বেশ করি, যা করি আমি আমার নিজের উপায় করা পয়সায় করি। আপনার কাছ থেকে তো আমি একটা পয়সাও নিই না–
–ঠিক আছে, আমার-পয়সার ওপরে যদি তোমার এতই অশ্রদ্ধা তবে এবার থেকে আমার টাকা-পয়সা আর একটাও পাবে না তুমি। আমার সব টাকা-পয়সা জমি-জমা সব আমি ওই সদানন্দকেই দিয়ে যাবো–আমি সদানন্দকেই এবার উইল করে সব দিয়ে যাবো।
বড়বাবু বললে–আপনার টাকা-পয়সা আমি চাইও না। কিন্তু যাকে আপনার টাকা-পয়সা দিয়ে যাবেন বলছেন জানেন সে একটা স্কাউন্ড্রেল? আজকে তাকে কোন্ পাড়ায় আমি দেখেছি তা জানেন?
