মহেশও বলে উঠলো–দাদাবাবু আপনি? আপনি এখানে কী করতে। আমার বাবুর অসুখ তাই আমি বড়দাদাবাবুকে খবর দিতে এসেছি।
এতক্ষণে সমস্ত আবহাওয়াটা কেমন যেন এই সামান্য কথাতেই একেবারে হাল্কা হয়ে উঠলো। সদানন্দর আজো মনে আছে সেদিন সেই মহেশের সেখানে আসার পর যেন নতুন করে সবাইকে চিনতে পারলে সে। এই হলো মহেশের বড়দাদাবাবু। আর ওই যে সামনে দাঁড়িয়ে আছে ওই-ই তাহলে সেই মেয়েটা, যাকে মহেশ রাক্ষুসী বলে বর্ণনা করেছিল। কী বিচিত্র মানুষের নিয়তি আর কী বিচিত্র এই কলকাতা শহর!
জীবনে আরো অনেকবার সদানন্দ কলকাতায় এসেছে, কিন্তু এমন বিচিত্র ঘটনার মুখোমুখি কখনও হয়নি সে। আজও ভাবলে অবাক হতে হয় তার নিজের ভাগ্যের কথা ভেবে।
কিন্তু তখন সেই মুহূর্তে সে-সব কথা অত ভাববার সময় ছিল না তার। বড়দাদাবাবুও যেন তখন সেই ঘটনার পর একটু অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিল। এতগুলো লোকের সামনে বড়দাদাবাবু যে কী করবে তা বুঝতে পারছিল না।
বললে–বাবার অসুখ? কী অসুখ?
সদানন্দও জিজ্ঞেস করলে কখন অসুখ হলো? কাল রাত্তিরেও তো আমার সঙ্গে কাকাবাবুর কথা হয়েছে—
মহেশ বললে–ভোরবেলা তো বাবু চান করতে গেলেন, তারপরে ফিরে আসতেই বুকটা কেমন ব্যথা করতে লাগলো, তারপর শুয়ে পড়লেন–
বড়দাদাবাবু বললে–তা আমাকে খবর দিতে কে বলেছে তোকে?
মহেশ বললে–কেউ বলেনি। আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলুম খুব। তাই ডাক্তারবাবুকে ডেকে দিয়েই এখানে ছুটে এলুম–
সদানন্দ বললে–চলো মহেশ আমি যাই,–
মহেশ বড়দাদাবাবুর দিকে চেয়ে বললে–আপনি যাবেন না বড়দাদাবাবু?
–আমি পরে যাবো, তুই যা—
বাইরে রাস্তায় বেরিয়ে মহেশ বললে–আপনাকে যে আমি এখানে পাবো তা ভাবতে পারিনি, আপনি এখানে কেমন করে এলেন?
সদানন্দ সমস্ত ঘটনাটা বলে গেল মহেশকে। মহেশ শুনে অবাক। বললে–কী আশ্চর্য, আমি যদি না এসে পড়তুম তো কী হতো বলুন তো? দেখলেন তো ওই রাক্ষুসীটাকে? সাধ করে কি বাবু আমার অত রেগে গেছেন ছেলের ওপর? আর আপনিই বা কেন যার তার কথায় সেখানে-সেখানে যান বলুন তো! বাবু কতদিন আপনাকে বারণ করেছেন না!
.
ওদিকে সমরজিৎবাবু তখন বউবাজারের বাড়িতে বিছানায় শুয়ে ছিলেন। একটু আগেই ডাক্তার তাঁকে দেখে বিদায় নিয়ে গেছে। সমস্ত বাড়িটাই তখন থম থম করছে। অন্য দিন একতলার পেছন দিকটা চাকর-ঠাকুর-ঝিদের কথাবার্তা ঝগড়া-ঝাঁটিতে মুখর হয়ে থাকে। কখনও বা ভেতর বাড়ি থেকে রান্নার শব্দও আসে। কিন্তু সেদিন সে-সব কিছুই নেই। দেখে বোঝা যায় কোথায় যেন একটা অঘটন ঘটে গেছে। সুখের সংসারের ভিতে কোথায় যেন একটা সর্বনাশের ফাটল ধরেছে।
মহেশ আগে আগে বাড়িতে ঢুকছিল, সদানন্দও ঢুকলো পেছন পেছন। মহেশ সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতেই সদানন্দ বললে–তুমি ওপরে গিয়ে দেখে এসো মহেশ, আমি পরে যাবো–
মহেশ বললে–না, আপনিও আসুন না দাদাবাবু, আসতে কী হয়েছে?
কথাটা শুনে সদানন্দও ওপরে গেল। তারা ওপরে যেতেই কে যেন মাথায় ঘোমাটা দিয়ে নিঃশব্দে ঘর থেকে অন্য ঘরে অদৃশ্য হয়ে গেল। কাকাবাবু তখন বিছানায় চোখ বুঁজে শুয়ে আছেন। তাঁর পাশে বসে আছে কাকীমা। কাকীমা মহেশকে দেখতে পেলে, সদানন্দকেও দেখলে। কিন্তু মুখে কিছু কথা বললে–না। সমরজিৎবাবু চিৎ হয়ে শুয়ে আছেন। তাঁর দিকে চেয়ে সদানন্দর মনে হচ্ছিল তিনি যেন সমস্ত সমস্যা থেকে মুক্ত হয়ে শান্তির কোলে আশ্রয় পেয়েছেন।
কাকীমা মহেশকে ডেকে গলা নিচু করে কী যেন বললে। মহেশ এসে বললে–দাদাবাবু, মা একবার আপনাকে ডাকছে–
সদানন্দ যেতেই কাকীমা বললে–কোথায় বেরিয়েছিলে তুমি, উনি তোমায় খুঁজছিলেন–এখন ওষুধ খেয়ে একটু ঘুমোচ্ছেন–
মাথার ওপর পাখাটা বন বন করে ঘুরছিল। সমরজিৎবাবু মুখের দিকে চেয়ে চেয়ে অনেক কথা মনে হচ্ছিল সদানন্দর। কোথাকার মানুষ সে, কোন্ চৌধুরী বংশের সন্তান, সেখান থেকে কোন অমোঘ নির্দেশে এ কোথায় এসে আর এক সম্পর্কের জালে জড়িয়ে গেল!
হঠাৎ সদর রাস্তায় একটা গাড়ির শব্দ হতেই মহেশ বললে–এই বড়দাদাবাবু এসেছে–
কাকীমা বুঝতে পারেনি প্রথমে। বললে–কে? খোকা? খোকা এ-সময়ে আসবে কেন? সে তো এ-সময়ে আসে না কখনও–
সদানন্দর কেমন অস্বস্তি হতে লাগলো। আবার সেই লোকটার সঙ্গে এখানে মুখোমুখি দেখা হয়ে যাবে। কথাটা ভাবতেই খারাপ লাগলো তার। বললে–কাকীমা, আমি এখন আসি তাহলে–
কাকীমা বললে–কেন বাবা, ওকে তুমি দেখনি, ও আমার ছেলে আসছে, তুমি থাকো না এখানে—
সদানন্দ বললেন, না আমি যাই–
বলে ঘর থেকে বেরোতে যেতেই আবার সেই বড়বাবুর সঙ্গে মুখোমুখি দেখা। সদানন্দকে দেখেই তার চোখ দুটো যেন কেমন নিষ্ঠুর হয়ে উঠলো। তার কালীঘাটের বাড়িতেও যে-দৃষ্টি দিয়ে সদানন্দকে দেখেছে এখানে তার নিজের পৈতৃক বাড়িতেও সেই একই দৃষ্টি। যেন পারলে সদানন্দকে জেলে পুরে দিয়ে সে বাঁচে।
সদানন্দকে দেখিয়ে বললে–মা, এ কে?
কাকীমা বললে–ও? ও সদানন্দ!
বড়বাবু বললে–সদানন্দ তো বুঝলুম, কিন্তু ও আমাদের বাড়িতে কেন? কে আমাদের বাড়িতে ওকে ঢুকতে দিয়েছে?
কাকীমা বললে–-আঃ, তুই অত চেঁচাচ্ছিস কেন? দেখছিস কর্তার অসুখ–
–অসুখ বলে কি সব সহ্য করতে হবে? আমি তোমার কাছে জানতে চাই কেন তুমি যাকে তাকে এ বাড়িতে ঢুকতে দিয়েছ? কে একে এ বাড়িতে আনলে?
