বড়বাবু বললে–আজ বাইরের ঘরে ঢুকেছে, কাল যদি আবার ভেতরের ঘরে ঢোকে? আজ আমি দেখে ফেললুম তাই, অন্য দিনও কেউ ঢোকে কিনা তা কে জানে! তুমি ওদের বেরিয়ে যেতে বলো–
বাতাসী বললে–ওমা, বেরিয়ে যেতে অমনি বলা যায়?
–তাহলে আমার বাড়িতে কোন্ সাহসে ওরা ঢোকে?
–তা মাসির সঙ্গে আমাদের এতদিনের জানা-শোনা, আমার বাড়িতে এলে তাড়িয়ে দেব?
বড়বাবু বললো, তাড়িয়ে দেবে, তুমি না তাড়িয়ে দিতে পারো, আমি এখুনি গিয়ে ওদের তাড়িয়ে দিচ্ছি
বলে বড়বাবু গটগট করে সোজা বাইরের দিকে যাচ্ছিল, কিন্তু বাতাসী এসে রাস্তা আটকে দিলে। বললে–ওগো, না না, অমন কাজ কোর না, মাসির অনেকগুলো টাকা নষ্ট হবে—
বড়বাবু জ্বলে উঠলো–মাসির টাকা নষ্ট হবে তা আমার কী? মাসি আমার কে? মাসি কেন আমার বাড়ি আসে? তুমি তাকে বারণ করে দিতে পারো না? ওরা এখখুনি চলে যাক, ওরা চলে না গেলে আমি কিন্তু ওদের জুতো মেরে তাড়িয়ে দেব, এই তোমায় বলে রাখছি। ওদের তুমি চলে যেতে বলো গিয়ে–
বাতাসী বললে–সে না হয় আমি চলে যেতে বলছি, কিন্তু ওর কী হবে? ওই লোকটার?
–ও কে?
–ওরই নাম তো সদানন্দ চৌধুরী?
বড়বাবু কী যেন ভাবলে। বললে–দেখি, ও-ঘরে গিয়ে কী করতে পারি—
বলে বড়বাবু পাশের ঘরে গিয়ে ঢুকলো। বাতাসীও গেল সঙ্গে সঙ্গে।
তখনও সদানন্দ হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। বুড়িটার দিকে চেয়ে বলছে–আমি যাই তাহলে এবার, আপনার কাজ তো হয়ে গেছে–আমি এবার চলি
মানদা মাসি অত বিপদের মধ্যেও বড়বাবুর আসার সঙ্গে সঙ্গে একটু আশার আলো দেখতে পেয়েছিল। সে কিছু বলবার আগেই বড়বাবু ঘরে ঢুকে পড়েছে। ঢুকেই সদানন্দর দিকে চেয়ে বললে–আপনি কে? কী নাম আপনার?
সদানন্দ তখন এই আকস্মিক প্রশ্নের জন্যে তৈরী ছিল না। তবু সহজে ঘাবড়ে যাবার মানুষ সে নয়। বললে–আমার নাম সদানন্দ চৌধুরী–
–আপনি বাড়ি থেকে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন?
সদানন্দ জবাবে কী বলবে প্রথমে ভেবে উঠতে পারলে না। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বললে–আমার খুশী পালিয়ে বেড়াচ্ছি। আমার যথেষ্ট বয়েস হয়েছে। আমি যা করেছি, তা খুব বুঝেশুনেই করেছি। তার জন্যে কারো কাছে কৈফিয়ৎ দিতে আমি রাজি নই–
–তার মানে? আপনি জানেন কারো বাড়িতে ঢুকে পড়া একটা ক্রাইম? কার হুকুমে আপনি আমার বাড়িতে ঢুকেছেন? বলুন, এবাড়িতে আপনি কেন ঢুকেছে?
সদানন্দ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চাইলে বড়বাবুর দিকে। বললে–আপনি জানেন না আমি কেন এবাড়িতে এসেছি?
বড়বাবু বললে–না, আমি শুনিনি, আপনি বলুন—
সদানন্দ বললে–যদি এখনও না শুনে থাকেন তো এই বৃদ্ধা মহিলাকে জিজ্ঞেস করুন।
–ওকে জিজ্ঞেস করতে যাবো কেন? ও কে? ও এ বাড়ির কেউ নয়। আপনাকে জিজ্ঞেস করছি আপনিই এর জবাব দিন।
মানদা মাসি কথার মাঝখানে বলে উঠলো–হ্যাঁ, বড়বাবু, আমিই ওকে এ বাড়িতে ডেকে নিয়ে এসেছি। আমার কথাতেই ও এখানে এসেছে–
বড়বাবু ধমকে উঠলো–তুমি চুপ করো, তুমি কেন কথা বলছে? যাকে জিজ্ঞেস করেছি সে জবাব দেবে।
মানদা মাসি বাতাসীর দিকে হতাশ ভাবে চাইলে। বললে–ও বাতাসী, তুই বল্ না মেয়ে, বল না আমিই ওকে ডেকে এনেছি–
বাতাসী কী বলবে! বড়বাবুর মুখের সামনে কথা বলবার সাহস আছে নাকি তার। সেও তখন ভয়ে কাঁপছে। তারও তো দোষ। সে-ই তো বড়বাবুকে না বলে বাইরের লোককে বাড়ির ভেতরে ঢুকতে দিয়েছে।
বড়বাবু আবার চেঁচিয়ে উঠলোবলুন কেন এসেছেন এ বাড়িতে?
সদানন্দ আর থাকতে পারলে না। বললে–দেখুন, আপনি কে আমি জানি না। আমি এখানকার কাউকেই চিনি না। কিন্তু আপনি সব কিছু না জেনে কেন আমার নামে দোষ দিচ্ছেন?
বড়বাবু বললে–আমি নিজের চোখে যা দেখেছি তাই বলছি। আপনি এখানে থাকেন কোথায়?
সদানন্দ বললে–আপনার অত কথা জিজ্ঞেস করার দরকার কী! আপনি যখন এতই রাগ করছেন আমাকে চলে যেতে দিন, আমি চলে যাচ্ছি–
বলে সদানন্দ বাইরের দিকে পা বাড়াচ্ছিল, কিন্তু বড়বাবু যেতে দিলে না। একেবারে বাইরে যাবার পথ আটকে দাঁড়ালো।
বললে–যাচ্ছেন কোথায়? আমার কথার জবাব দিন আগে–
সদানন্দ বললে–আপনি কি ভেবেছেন আপনার চোখরাঙানি দেখে আমি ভয় পাবো? আপনি ভদ্রভাবে কথা বলতে পারেন না?
–কী—
বড়বাবু সদানন্দর গলা টিপে ধরেছে। সদানন্দও বড়বাবুর গলায় হাত দিয়ে টিপে ধরলো। সঙ্গে সঙ্গে একটা হাতাহাতি কাণ্ড হয়ে যেত হয়তো। কিন্তু তার আগেই একটা অঘটন ঘটলো। হঠাৎ সেই নাটকীয় ঘটনার মধ্যে আবির্ভাব হলো মহেশের।
–বড়দাদাবাবু।
মহেশ ঘরে ঢুকেই হতভম্ব হয়ে গেছে। এমন কাণ্ড হবে তা সে আশা করেনি। সে দৌড়তে দৌড়তে আসছিল। তখনও হাঁফাচ্ছে সে। এক ঘরের মধ্যে বড়দাদাবাবু আর দাদাবাবু দুজনকে দেখতে পাবে তা সে কল্পনাও করতে পারেনি। মহেশকে দেখে বড়বাবুও অবাক, সদানন্দও অবাক।
বড়বাবু যেন মিইয়ে গেল মহেশকে দেখে। বললে–তুই?
মহেশ তখনও হাঁফাচ্ছে। কিন্তু এখানে আসবার আগে তার বিশ্বাসই হয়নি যে তার জন্যে এখানে এতখানি বিস্ময় জমা হয়ে আছে। আগেও ঘটনাচক্রে কয়েকবার এখানে আসতে হয়েছে তাকে। কখনও বাবুকে জানিয়ে আবার কখনও না-জানিয়ে। তবে বিশেষ বিপাকে না পড়লে সে কখনও আসেনি। কিন্তু এবার সদানন্দ চৌধুরীকে এখানে দেখে সে আরো অবাক হয়ে গেছে।
সদানন্দর তখনও বিস্ময়ের ঘোর কাটেনি। এই অপরিচয়ের জগতে এতক্ষণে একটা চেনা মুখ দেখে যেন সে বেঁচে গেল। বললে–মহেশ তুমি?
