বাতাসী পাশে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। এবার পুরুত-ঠাকুর বুড়ির দিকে চেয়ে বললে–আপনি আসুন মা এখেনে। এই ঘটিতে জল নিয়ে ছেলের পায়ে ঢালুন–
পুরুত-ঠাকুর যা বললে–বুড়িও তাই করতে লাগলো। একবার জল ঢালে, আর একবার ফুল দেয় পায়ের পাতার ওপর। ফুল-বেলপাতা-গঙ্গাজল পায়ের পাতার ওপর পড়ে জায়গাটা বেশ নোংরা হয়ে গেল। সঙ্গে চলেছে সংস্কৃত শ্লোক। পুরুতটা শ্লোক বলে আর বুড়ি সেটা আওড়ায়। চরণ-পূজো যেন শেষ হতে চায় না।
শেষকালে একটা ছোট পাথরের বাটিতে গঙ্গাজল রাখা হলো। পুরুত-ঠাকুর সদানন্দকে তার বাঁ পায়ের বুড়ো-আঙুলটা সেই জলের ওপর ছোঁয়াতে বললে। সদানন্দও ঠিক তেমনিই করলে। তারপর সেই জলটা বুড়ি চুমুক দিয়ে মুখে ঢেলে দিলে।
সদানন্দ দেখে অবাক হয়ে গেল। তার পায়ের ধুলোসুদ্ধ জলটা বুড়ি নির্বিকার চিত্তে খেয়ে নিলে!
সদানন্দ বললে–এবার তাহলে আমি যাই?
বুড়ি বললে–ওমা কোথায় যাবে? তোমাকে মিষ্টি দেব, আমাকে পেসাদ করে দেবে না?
কিন্তু বুড়ির কথা শেষ হবার আগেই হঠাৎ নিচের সিঁড়িতে দুম দুম করে জুতোর আওয়াজ হতে লাগলো। আওয়াজটা ক্রমেই ওপরের দিকে উঠে আসছে।
বাতাসীর মুখটা তখন শুকিয়ে গেছে। বড়বাবু হঠাৎ আবার ফিরে আসছে নাকি?
বাতাসী বললে–ও মাসি, ওই বোধ হয় বড়বাবু এল?
মাসিও চমকে উঠেছে। বলল–সে কী রে? বড়বাবু? এখন? এই অসময়ে?
বাতাসী যা ভেবেছে তাই-ই। সিঁড়ি দিয়ে আওয়াজটা উঠতে উঠতে একেবারে সশরীরে ঘরের মধ্যে এসে পৌঁছুলো। বড়বাবু সারা রাত এই বাড়িতেই কাটিয়েছে। ভোরবেলার দিকে চলে গিয়েছিল। এখন আর তার আসবার কথা নয়। কিন্তু কী একটা কাজে আবার এসেছে। এসেই এ-সব কাণ্ড দেখে অবাক। সোজা সদানন্দর দিকে চেয়ে দেখলে। সদানন্দও বড়বাবুর দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রইল।
বড়বাবু গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলে–এ কে?
বড়বাবু আসলে বাতাসীর দিকেই প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিয়েছিল, কিন্তু যে-কেউ এর উত্তর দিলেই চলতো। কারণ বড়বাবুর প্রশ্ন করবার অধিকারও ছিল এ-ক্ষেত্রে। এ বাড়ির ভিতরে যদি এমন সব অবাঞ্ছিত লোকের আনাগোনাই হয় তাহলে কীসের জন্যে পকেটের পয়সা খরচ করে বাতাসীকে নিয়ে আলাদা বাড়ি ভাড়া করা! তাহলে সেই আগে যেমন মানদা মাসির টিনের বস্তিবাড়িতে ঘর ভাড়া করেছিল তেমনি সেখানেই তো বাতাসীকে রাখতে পারতো।
–বলো এ কে?
অথচ কয়েক ঘণ্টা আগে যখন বড়বাবু চলে গেছে তখন এখানে কেউই ছিল না।
মানদা মাসির হাতে গঙ্গাজলের খালি পাথরের বাটিটা তখনও ধরা রয়েছে। মানদা মাসি কল্পনা করতেও পারেনি যে এই অসময়ে বড়বাবু এসে হাজির হবে।
পাণ্ডা ঠাকুর বড়বাবুকে চেনে না, সদানন্দকে চেনে না, বাতাসী, মানদা মাসি কাউকেই সে চেনে না। দু’চার আনা পয়সার লোভে সে এই যজমানের বাড়ি এসেছিল। এইটেই তার পেশা। তখনও তার হাতে নৈবেদ্যের রেকাবি আর ঘণ্টা রয়েছে। কিন্তু ঘটনার এত আকস্মিকতায় সেও হতবাক হয়ে গিয়েছিল। এ লোকটাই বা কে? আর যার চরণপূজোর জন্যে তাকে ডেকে আনা হয়েছে সে-ই বা কে? এই নতুন বাবু আসার সঙ্গে সঙ্গে সবাই এমন করে চমকেই বা উঠলো কেন?
মানদা মাসি কৈফিয়তের সুরে বলতে লাগলো–আজ্ঞে বড়বাবু, আমিই একে ডেকে এনেছি, আমারই দোষ হয়েছে, বাতাসীর কোনও দোষ নেই–
বড়বাবু পূজোর আয়োজনের দিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বললে–এসব কী হচ্ছে? এ কীসের পূজো?
এর উত্তর কে কী দিত তা জানবার আগেই বাতাসী বড়বাবুকে পাশের ঘরে ডেকে নিয়ে গেল। বললে–তুমি এদিকে এসো, তোমাকে বলছি সব–
বড়বাবু বললে–কেন ওঘরে যাবো? আমার বাড়িতে এ-সব কী হচ্ছে তা আমাকে জানতে হবে না? আমি কি কেউ নই? আমার বিনা হুকুমে কে কী করছে এ-সব তাও তোমরা বলবে না?
বাতাসী বললে–আঃ তুমি চেঁচাচ্ছ কেন অত? সব বলছি তোমাকে, তুমি ও-ঘরে চলো না?
বড়বাবু হুঙ্কার দিয়ে উঠলো। বললে–কেন ওঘরে যাব? আমাকে এখানে এই ঘরে সকলের সামনেই বলতে হবে। এতো লুকোচুরির কী আছে?
–আছে, লুকোচুরির আছে। কেন আছে তা ও-ঘরে তোমাকে বলবো বলে বাতাসী জোর করে বড়বাবুকে পাশের ঘরে নিয়ে গেল।
পাশের ঘরে নিয়ে গিয়ে বাতাসী বললে–তুমি আবার হঠাৎ ফিরে এলে কেন?
বড়বাবু বললে–আমার অফিসের চাবিটা ফেলে গিয়েছি। তা আমার বাড়িতে আমি ফিরে আসবো তার জন্যে তোমাকে কৈফিয়ৎ দিতে হবে নাকি? ও কে? ও-সব পূজোটুজো করছে কেন তোমার মাসি?
বাতাসী বললে–ওকে তুমি চিনলে না?
বড়বাবু বললে–না, কেন? কে ও?
–ও সেই যার ছবি তোমাকে দিয়েছিলুম, বলেছিলুম ওকে খুঁজে বার করবার জন্যে। ওই লোকটাই সে। ও বাড়ি থেকে নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিল। খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। নাকি খুব বড়লোকের ছেলে, ওর মামা এসে মাসিকে ধরেছিল। বলেছিল কিছু টাকা দেবে। তাই ওকে আজ রাস্তায় ধরেছে মাসি। ধরে আমার এখানে এনেছে তোমাকে দেখাবার জন্যে।
বড়বাবু বললে–তা আমি কী করবো?
বাতাসী বললে–তুমি পুলিসের লোক, ভয় দেখিয়েই ধরে রাখবে, নইলে আবার পালিয়ে যেতে পারে তো।
বড়বাবু তখন আলমারি থেকে ফেলে-যাওয়া চাবিটা নিয়েছে। বললে–এই সব ঝঞ্ঝাট আমার বাড়ির মধ্যে কেন? আমি এ-সব টলারেট করবো না এই তোমায় বলে রাখছি। তুমি ওদের চলে যেতে বলো–
বাতাসী বললে–ওরা তো আজ বাইরের ঘরে বসেছে–তাতে তোমার ক্ষতি কী হচ্ছে?
