–সদানন্দ বললে—না—
সমরজিৎবাবু আরো অবাক হয়ে গেলেন। বললেন–সন্তানের জন্যেই তো মানুষ বিবাহ করে, আমাদের শাস্ত্রের তো তাই-ই বিধান। সন্তানই যদি না চাইবে তো তুমি বিবাহ করলে কেন?
সদানন্দ বললে–আমি বাধ্য হয়ে বিয়ে করেছি–আমি বিয়ে করতে চাইনি।
–বিবাহ করতে যদি না চেয়ে থাকো তো কেউ কি কাউকে বিবাহ করাতে বাধ্য করতে পারে? তোমার তো আর বাল্যবিবাহ হয়নি? তুমি তো উপযুক্ত বয়েসেই বিবাহ করেছ
সদানন্দ বললে–হ্যাঁ, আমি উপযুক্ত বয়েসেই বিয়ে করেছি, তখন আমার সব কিছু বোঝবার বয়েস হয়েছে
–তাহলে? এ তো বড় অদ্ভুত কথা শোনালে তুমি আমাকে সদানন্দ। তাহলে তোমার স্ত্রীর সঙ্গে কি তোমার কোনও মনোমালিন্য হয়েছে?
সদানন্দ বললে–না, তাও না–
–তোমার স্ত্রীর সঙ্গে তোমার মনোমালিন্য হয়নি তবু সন্তান চাও না? আর তোমার স্ত্রী? তোমার স্ত্রীও কি তোমার মত সন্তান কামনা করেন না?
সদানন্দ বললে–তিনি কী চান তা আমি জানি না–
–জানো না মানে?
সদানন্দ বললে–সে-সম্বন্ধে আমার স্ত্রী আমাকে কিছু বলেননি।
সমরজিৎবাবুর কেমন যেন সন্দেহ হলো। জিজ্ঞেস করলেন–তোমার স্ত্রীর স্বাস্থ্য কেমন?
সদানন্দ বললে–মনে হয় ভালো–
–মুখশ্রী?
সদানন্দ বললে–মুখশ্রী সুন্দর। আমার বাবা সুন্দরী দেখেই আমার জন্যে পাত্রী পছন্দ করেছিলেন।
তবু কিছু আন্দাজ করতে পারলেন না সমরজিৎবাবু। বললেন–তোমার স্ত্রীর সঙ্গে তোমার বাক্যালাপ হয়েছে তো?
সদানন্দ বললে–হ্যাঁ।
–কতদিন তোমরা বিবাহিত জীবন যাপন করেছ?
সদানন্দ বললে–একদিনও না—
সমরজিৎবাবু স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। বললেন–আশ্চর্য তো… কিন্তু তার কথা আর শেষ হলো না। কথাটা শেষ হবার আগেই সেই আগের দিনের মতই একটা হট্টগোল-গোলমাল শুরু হয়ে গেল। মহেশ দৌড়তে দৌড়তে এসে বললে–মা, বড়দাদাবাবু এসেছে–
কথাটা শুনেই সমরজিৎবাবু আর তাঁর গৃহিণীর মুখটা যেন কেমন বিস্বাদ হয়ে গেল। একটা যন্ত্রণাকাতর দৃষ্টি দিয়ে সমরজিৎবাবু গৃহিণীর দিকে চাইলেন। বললেন–তুমি বউমাকে বলো দরজায় খিল দিয়ে দিতে, আমি নিচেয় যাচ্ছি–
বলে তিনি শশব্যস্ত হয়ে বিছানা ছেড়ে উঠলেন।
সদানন্দ এর পর আর সেখানে দাঁড়ালো না। সোজা নিজের ঘরে চলে এসে দরজায় খিল দিয়ে দিলে।
.
ক’দিন ধরে সদানন্দর এই সব কথাগুলোই মনের মধ্যে তোলপাড় করে বেড়াচ্ছিল। কোথায় একটা বন্ধন থেকে মুক্তি পাবার জন্যে সে এতদূর এসে আত্মগোপন করে আছে, আর এখানেই কি না তার জন্যে আর একটা বন্ধন প্রস্তুত! কদিন ধরে সর্বক্ষণ সে ছটফট করে ঘুরে বেড়িয়েছে। বাড়িতে থাকতে ভালো লাগেনি। একটু বিশ্রাম করেই আবার সে বাইরে বেরিয়ে পড়েছে। কখনও কখনও ঘুম থেকে উঠেই বেরিয়েছে। সমরজিৎবাবু ভোররাত্রে গঙ্গাস্নান করতে বেরোন। সেই শব্দটা কানে যেতেই সেও বেয়োয়। বেরিয়ে চলতে চলতে অনেক দূর চলে যায়। দরকার হলে কখনও বাসে উঠে পড়ে, আবার কখনও বা উদ্দেশ্যহীন ভাবে হাঁটে।
এমনি সেদিনও হাঁটছিল। সেইদিনই সেই কাণ্ডটা ঘটলো। হাঁটতে হাঁটতে কখন যে সে বাসে উঠে পড়েছিল আবার একসময়ে বাস থেকে নেমেও পড়েছিল সে খেয়াল ছিল না তার। তারপর গঙ্গার ধারে আসতেই এই ঘটনা।
ঘরটার মধ্যে একটা চেয়ারের ওপর সদানন্দ অনেকক্ষণ ধরে বসে ছিল। অনেকক্ষণ কারো কোনও সাড়া-শব্দ নেই। কোথায় যে কার বাড়িতে এসেছে সে তাও জানা ছিল না।
এমন সময় আবার সেই বুড়িটা এসে হাজির হলো। সঙ্গে আর একজন কে একটা লোক। খালি গায়ে খালি পায়ে। গলায় একটা ময়লা পৈতে ঝুলছে। দেখলে মনে হয় যেন পুরুত ঠাকুর। বুড়িটার হাতে একটা রেকাবি। তার ওপর বেলপাতা ধান দুর্বোঘাস, আর চন্দনের ছোট একটা বাটি। আর একপাশে একটা জ্বলন্ত প্রদীপ।
বুড়ি ঘরের ভেতরে এসেই বললে–তোমার খুব দেরি করিয়ে দিলুম বাবা, কিছু মনে করলে না তো?
সদানন্দ কিছু জবাব দিলে না সে-কথার।
বুড়িটা হাতের রেকাবিটা মেঝের ওপর রেখে বললে–এসো বাবা, আমার সঙ্গে এসো, মুখ-হাত-পা ধুয়ে নেবে এসো–
বলে আগে আগে চলতে লাগলো। সদানন্দও চলতে লাগলো তার পেছন-পেছন।
ভেতরে একটা কল-ঘরের ভেতরে ঢুকে সদানন্দ হাত-পা-মুখ ভাল করে ধুয়ে নিয়ে আবার বাইরে বেরিয়ে এল। বললে–শিগগীর শিগগীর করুন, আমি বেশিক্ষণ দেরি করতে পারবো না
হঠাৎ পাশের জানলার দিকে নজর পড়তেই দেখলে এক জোড়া চোখ তার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে চেয়ে দেখছে।
বুড়ি মানুষটা বললে–ও মেয়ে, তুই বাইরে দাঁড়িয়ে কেন, ভেতরে আয় না—
বলতেই একজন মেয়েমানুষ একেবারে ঘরের ভেতরে এসে দাঁড়ালো।
সদানন্দ এদের কাণ্ড দেখে অবাক হয়ে গেছে তখন। এ সব কারা? এ কোন্ বাড়িতে সে এসেছে? এ মহিলাটিই বা কে? তাকে ঘিরে এই উৎসব, এ তার ভালো লাগলো না।
পুরুত-ঠাকুর সদানন্দর দিকে চলে বললে–আপনি এখানে এই মেঝের ওপর একটু দাঁড়ান–
সদানন্দ চেয়ার থেকে উঠে নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে দাঁড়ালো। ততক্ষণে ধূপ জ্বালা হয়ে গেছে। মানদা মাসি আয়োজনের কিছু ত্রুটি রাখেনি। অনেক দিন থেকে আশা ছিল এই টাকাটা পাবার। একশো টাকা আগাম হাতে পাওয়া গেছে। বাকি ন’শো টাকা পাওয়া যাবে তার এই ভাগ্নেকে খুঁজে দিতে পারলে। এতদিনে বুঝি সে-আশা তার মিটবে। তারপর ছেলেটিকে যেমন করে হোক বড়বাবু ফিরে আসা পর্যন্ত আটকে রাখলেই হলো। বড়বাবু এলে একেবারে সরাসরি তার হাতে তুলে দেবে। বাতাসীকেও সেই টাকার কিছু ভাগ দিতে হবে। অবশ্য তা দিতে মানদা মাসির আপত্তি নেই। বড়বাবু না হলে এ-সব কে সামলাবে!
