শালাবাবু বললে–আমিও তো তাই জিজ্ঞেস করলুম, আবার চাঁদা কীসের? তা ওরা বললে–এবার বারোয়ারিতলায় কবির গান লাগাবে–
–কবির গান? ওদের বুঝি কাজকম্ম কিছু নেই, কেবল যাত্রা থিয়েটার আর গান!
শালাবাবু বললে–দিয়ে দাও দশটা টাকা। দশটা টাকা তোমার কাছে কিছু না, কিন্তু ওরা আমাকে শালাবাবু বলে এখনও মান্যগণ্য করে তো, টাকা না দিলে সেটাও আর করবে না, তখন তোমারও ইজ্জৎ নষ্ট, বলবে চৌধুরীমশাই কিটে লোক–চৌধুরীমশাই-এর বউও কিপটে, তার শালাটাও কিপটে।
দিদি ভাই-এর কথায় হেসে ফেলতো। বলতো–তোর বুদ্ধি তো খুব প্রকাশ–
প্রকাশ দিদির কাছে তারিফ পেয়ে অহঙ্কারে আরো ফুলে উঠতো। বলতো–তুমি আর আমার বুদ্ধির কতটুকু দেখলে দিদি। জানো, এই যে এতবার ভাগলপুর থেকে এখানে আসি, তুমি কি ভেবেছো আমি রেলের টিকিট কাটি নাকি?
–টিকিট কাটিস না!
প্রকাশ গর্বে বুক ফুলিয়ে দিদির দিকে চেয়ে বলে–না। টিকিট কাটতে যাবো কোন্ দুঃখে বল তো! আমি গাড়িতে চড়লেও রেল চলবে, না-চড়লেও চলবে। আমি চড়ি বলে কি আর রেলের ইঞ্জিনের কয়লা বেশি পোড়ে?
দিদি অবাক। বলে–তাহলে তুই যে আমার কাছ থেকে টিকিটের টাকা নিস?
প্রকাশ বলে–তোমার দেখছি বুদ্ধিসুদ্ধি কিছু নেই দিদি। তোমার কাছ থেকে টিকিটের টাকা নিই বলে সত্যি সত্যি রেলের টিকিট কাটতে হবে? তুমি বলছো কী? ওই রকম বোকা হলেই হয়েছে আর কী! পৃথিবীতে লোকের সঙ্গে একটু ভালোমানুষি করেছ কি সবাই তোমায় পিষে গুঁড়িয়ে চেপটে মেরে ফেলে দেবে। তুমি তো দেশের মানুষগুলোকে এখনও চিনলে না, তাই ওই কথা বলছো! খবরদার খবরদার, ওই বোকামিটি কখখনো কোর না দিদি, রেলে চড়লে কখনো টিকিট কাটবে না। রেলগাড়ি মানে কী জানো তো?
–কী?
–জোচ্চোরের বাড়ির ফলার। পেলে ছাড়তে নেই।
–তা তুই সে টাকাগুলো নিয়ে কী করিস?
প্রকাশ বলে—খাওয়াই–
–খাওয়াই মানে? কাকে খাওয়াস?
প্রকাশ বলে–ওই টিকিট চেকারদের। এক-একদিন যখন ধরে ফেলে তখন চা-সিগ্রেট খাওয়াতে হবে না? সবাই তো আর আমার বউ-এর ভাই নয় যে আমার মুখ দেখে ছেড়ে দেবে! দু’একটা আবার ধর্মপুত্তুর যুধিষ্টির আছে, জানো, তারা মিষ্টি কথাতেও ভুলবে না, চা-সিগ্রেটও খাবে না, আবার ঘুষও নেবে না। সেই সব বেয়াড়া লোকগুলোকে নিয়েই হয় মুশকিল।
–তখন কী করিস?
–তখন কী আর করবো? গাঁট-গচ্চা দিতে হয়—
কথাগুলো বলবার সময় দিদিও যত হাসে, প্রকাশও তত হাসে। ভাইএর বাহাদুরিতে দিদি অবাকও হয়ে যায়। যখন প্রকাশ নবাবগঞ্জে আসে তখন অনেক সময় রেলবাজারের মিষ্টির দোকান থেকে এক হাঁড়ি কাঁচাগোল্লা নিয়ে আসে। দিদি বলে–এ কী রে, তুই আবার কুটুম লোকের মত মিষ্টি নিয়ে আসিস কেন? তুই কি কুটুমবাড়ি আসছিস নাকি?
প্রকাশ বলতো–না দিদি, তুমি কাঁচাগোল্লা খেতে ভালবাসো তাই আনলুম। তিন টাকা সের, বেটারা গলা কাটা দাম রেখেছে–
দিদি সন্দেশটা নেয় বটে, কিন্তু ভাই-এর দেওয়া জিনিসের দামও সঙ্গে সঙ্গে শোধ করে দেয়। আর তা ছাড়া প্রকাশ টাকা পাবেই বা কোথায়? তার তো আর ভগ্নীপতির মত নিজের ঢালাও জমিদারি নেই যে দিদিকে রোজ-রোজ এক সের করে কাঁচাগোল্লা খাওয়াবে! আর প্রকাশও জানতো যে সেই কাঁচাগোল্লা দিদি নিজে যতখানি খাবে, তার চেয়ে বেশি খাবে প্রকাশ নিজে।
ওই সদা যখন হলো তখন ওর ভাতের সময় করা-কর্মা যা কিছু সবই করেছিল ওই প্রকাশ। অবশ্য তখন প্রকাশ নিজেও ছোট। সদানন্দর সেই ছোটবেলা থেকে তার বিয়ে দেওয়া পর্যন্ত সব কাজেই প্রকাশ। জমিদারবাড়ির একমাত্র ছেলে। আদর করবার লোকেরও অভাব যেমন নেই, ছেলের সাধ-আহ্লাদ-শখ মেটাবার জন্যে টাকারও তেমনি অভাব নেই। যত ইচ্ছে খরচ করো না তুমি, ছেলে যদি তাতে সুখী হয় তো আমার কোনও আপত্তি নেই। আরো টাকা নাও নবাবগঞ্জের চৌধুরী বংশের কুল-তিলক সদানন্দ, তার জন্যে নরনারায়ণ চৌধুরীর কোনও কার্পণ্য নেই।
যেদিন সদানন্দ জন্মালো নরনারায়ণ চৌধুরী তখন রাণাঘাটের সদরে মামলার তদ্বির করতে গেছেন। সদরে তার নিজের বাড়ি ছিল। মামলা-মকর্দমার জন্যে তাকে যেতেই হতো। ওখানে গেলে কিছুদিন ওই বাড়িতেই কাটাতেন। লোকজন ছিল তাঁর। কাছারি বাড়ির কাজ হতো ওইখানে। তার জন্যে লোক-লস্কর সব কিছুর ব্যবস্থা ছিল।
সেদিন উকিল-মুহুরি নিয়ে কাছারি-ঘরে তিনি খুবই ব্যতিব্যস্ত। নব্বই হাজার টাকার একটা বিলের মামলার ডিক্রী হয়েছে। তাই নিয়ে সাক্ষী-সাবুদের ঝামেলায় একেবারে নাজেহাল, তখন হঠাৎ নবাবগঞ্জ থেকে দীনু দৌড়তে দৌড়তে গিয়ে খবর দিলে–বউমার ছেলে হয়েছে–
প্রথমটায় যেন মনে হলো ভুল শুনছেন। তারপর উকিল-মুহুরির দিক থেকে মুখ তুলে জিজ্ঞেস করলেন–কী বললি?
–আজ্ঞে বউমার ছেলে হয়েছে।
তবু যেন কর্তামশাইএর বিশ্বাস হলো না। বললেন–ছেলে, না মেয়ে?
–আজ্ঞে ছেলে।
–তুই ঠিক জানিস–ছেলে?
দীনু বললে–আজ্ঞে হ্যাঁ, মঙ্গলা দাই নিজে আমাকে বলেছে। ছোট-মশাই তাই আমাকে এখানে পাঠিয়ে দিলে।
কথাটা শুনে কর্তামশাই প্রথমে কী করবেন বুঝতে পারলেন না। তারপর কৈলাসকে ডাকলেন। কৈলাস গোমস্তা যে তার পাশেই বসে আছে, উত্তেজনায় সে-খেয়ালও তার ছিল না। আবার ডাকলেন–কৈলাস, কৈলাসের টিকি দেখতে পাচ্ছি নে কেন, সে যায় কোথায়?
পাশ থেকে কৈলাস বলে উঠলো–আজ্ঞে এই তো আমি।
