–কেউ নেই? কেউ নেই মানে? বাব-মা সব কোথায় গেল? সদানন্দ তো বললে–ও বিয়ে করেছে, ওর বউও তো আছে সেখানে, তারা কোথায় গেল? কাউকে জিজ্ঞেস করলি না কেন?
মহেশ বললে–সোজা কথায় কি জিজ্ঞেস করা যায়? আমাকে নতুন লোক দেখেই তো সবাই ছেঁকে ধরলে। সবাই জিজ্ঞেস করে কোথায় বাড়ি তোমার, কে তোমাকে পাঠিয়েছে, এত খবর তোমার জানার দরকারটা কী, হ্যান-ত্যান অনেক কথা জিজ্ঞেস করতে লাগলো গাঁয়ের লোক। আমার নাম-ধাম জানতে চাইলে। মহামুশকিলে পড়েছিলুম। শেষকালে একটা মিছে কথা বলে পার পেয়ে গেলুম–
–কী মিছে কথা?
বললুম আমি ঘটক। পাত্তরের খোঁজে এসেছি। তা শুনে সবাই হেসে অস্থির। সবাই বললে–তার তো বিয়ে হয়ে গেছে মশাই। তার বউকে ছেড়ে সে ছেলেও কোথায় নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে।
সমরজিৎবাবু বললেন–আর অবস্থা কেমন ওদের?
মহেশ বললে–অবস্থা খুব ভালো। জমি-জমার নাকি শেষ নেই। লাখ লাখ টাকার সম্পত্তি। কিন্তু খাবার লোক দ্বিতীয় কেউ নেই।
–তা বাবা-মা কোথায় গেছে কিছু শুনলি?
মহেশ বললে–শুনলুম ঠাকুর্দাদা মারা গেছে, মা-ও ক’মাস আগে নাকি মারা গেছে। বাপ ছিল কিন্তু তিনিও নাকি চলে গেছেন সুলতানপুরে–
–সুলতানপুর? সে কোথায়?
মহেশ বললে–ভাগলপুরে। ভাগলপুরের কাছে সুলতানপুরে নাকি দাদাবাবুর মামার বাড়ি। দাদামশাই-এর কোনও ছেলে নেই, তাই জামাই গেছে সেখানে দেখা-শোনা করতে। তাঁরও নাকি অসুখ। সবাই বললে–দাদামশাই-এর আর বাপের সমস্ত সম্পত্তির একমাত্তোর ওয়ারিশান নাকি একলা দাদাবাবু–
সমরজিৎবাবু সমস্ত শুনলেন। সদানন্দ যা যা বলেছিল তা সবই বর্ণে বর্ণে মিলে গেল। এতটুকু এদিক-ওদিক হলো না।
তারপর গৃহিণীর দিকে চাইলেন। বললেন–দেখলে তো, শুনলে তো সব? আমি বলেছিলুম তোমাকে যে সদানন্দ মিছে কথা বলবার ছেলে নয়।
তারপর মহেশের দিকে চেয়ে বললেন–হ্যাঁ রে, দাদাবাবু এখন কি জেগে আছে, না ঘুমিয়ে পড়েছে?
–আজ্ঞে দেখলুম তো জেগে আছেন।
সমরজিৎবাবু বললেন–তা হলে একবার আমার কাছে ডেকে দে তো। বলবি আমি একবার ডাকছি–
মহেশ চলে গেল।
মহেশ চলে গেলেই গৃহিণী বললে–এত রাত্তিরে আবার ডেকে পাঠাচ্ছ কেন ওকে?
সমরজিৎবাবু বললেন–আমি সব ঠিক করে ফেলেছি।
–কী ঠিক করেছ?
–আমি সদানন্দকে এখানেই রাখবো। অনেক দিন ধরেই ঠিক করেছিলুম। কিন্তু কাউকে বলিনি। যেদিন রাণাঘাট থেকে আসছিলুম সেই দিনই আমার অবাক লেগেছে।
কেউ তো অমন করে কারো জিনিষের জন্য ঝুঁকি নেয় না। আর জিনিসটা ও নিয়ে নিলেই বা আমি কী বলতুম! তা এবার আমি আর কোনও কথা শুনবো না–
গৃহিণী বললে–বামুনের ছেলে তোমার এখানে থাকতে রাজি হবে কেন?
ঠিক সেই সময়েই সদানন্দ এসে ঘরের সামনে দাঁড়ালো। বললে–আমাকে ডেকে ছিলেন কাকাবাবু?
সমরজিৎবাবু বিছানার ওপর বসেছিলেন। বললেন–এসো, এই চেয়ারটায় বসো—
সদানন্দ তখনও কিছু বুঝতে পারেনি। সে সোজা একটা চেয়ারের ওপর গিয়ে বসলো।
সমরজিৎবাবু বললেন–একটা কথা তোমাকে অনেক দিন ধরে বলবো বলবো করছি। কিন্তু বলা হয়নি। তুমি আমার কাছে অনেক দিন চাকরির কথা বলেছ। আমিও তোমাকে কথা দিয়েছিলুম তোমায় একটা চাকরি করে দেব। কিন্তু তুমি তো এ বাড়িতে অনেকদিন আছো বাবা, আর আমাদেরও দেখছে। আমার যা টাকাকড়ি দেশের জমিজমা আছে তাতে চাকরি আমার কোনও দিন করতে হয়নি। শুধু আমার নয়, আমার ছেলেরও চাকরি না করলেও চলতো। কিন্তু আমার অমতেই ও চাকরি নিয়েছে। চাকরি নিয়েছে বলে আমার তত দুঃখ নেই, দুঃখ আমার অন্য কারণে জানো?
বলে সমরজিৎবাবু একটু থামলেন।
সদানন্দ মনে হলো এতদিন যা ভয় করছিল সে সেই কথাগুলোই হয়ত বলবেন কাকাবাবু।
সমরজিৎবাবু তারপর একে একে তাঁর জীবনের চরম দুঃখের কাহিনীগুলো বলতে লাগলেন। সেই পূর্বপুরুষের আদি-পত্তন থেকে শুরু করে একেবারে বর্তমান কাল পর্যন্ত সমস্ত কাহিনী। তাঁদের বংশ-পরিচয় তাঁদের ঐতিহ্য, তাঁদের শিক্ষা-দীক্ষা-চিন্তা-ভাবনার কথাও বাদ দিলেন না। তারপর শুরু করলেন তাঁর নিঃসন্তান জীবনের মর্মান্তিক দিকটার কথা। কেমন করে দত্তক নিলেন খোকাকে। সেই খোকাকে কেমন করে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করলেন। আর তারপর সেই ছেলেই আবার কেমন করে অমানুষ হয়ে গেল তাঁরই চোখের সামনে। তারপর কেমন করে সেই ছেলেকে সৎপথে আনবার জন্যে তার বিয়ে দিলেন। সমস্ত বলে গেলেন গড়গড় করে মুখস্থ পড়ার মতন।
তারপর বললেন–এই দেখ, তোমার কাকীমা রয়েছে, তোমার কাকীমাকেই জিজ্ঞেস করো, আমি একটি কথাও বাড়িয়ে বলছি না, বা অতিরঞ্জিতও করছি না–
সদানন্দ চুপ করে সব শুনছিল। এ আবার কীরকম সংসার! এ আবার মানুষের কী রকম সমস্যা!
সমরজিৎবাবু হঠাৎ বললেন–তোমার নিজেরও বাবা আছেন, তিনি গুরুজন। তাঁদের মনে আমি কোনও আঘাত দিতে চাই না। কিন্তু তুমি তো নিজেই বলেছ যে তুমি আর সেখানে ফিরে যেতে চাও না। বলেছ তো?
সদানন্দ বললো, আমি আর সেখানে ফিরে যেতে চাই না
–কিন্তু তোমার স্ত্রী? তুমি তো বিয়ে করেছ!
–আজ্ঞে হ্যাঁ। আমি আমার স্ত্রীর সঙ্গেও আর কোনও সম্পর্ক রাখতে চাই না।
সমরজিৎবাবু জিজ্ঞেস করলেন–তোমার কি কোনও সন্তান হয়েছে?
সদানন্দ বললে–না, সন্তান যাতে না হয় সেই জন্যেই আমি স্ত্রীর সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করেছি—
উত্তরটা শুনে সমরজিৎবাবু কেমন অবাক হয়ে গেলেন। জিজ্ঞেস করলেন–তার মানে? তুমি সন্তান চাও না?
