বলে মহেশ সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে গেল। সদানন্দ আবার নিজের ঘরের মধ্যে এসে বিছানায় শুয়ে পড়লো। কিন্তু ঘুম এলো না। রাণাঘাট! মহেশ রাণাঘাটে গিয়েছিল। রাণাঘাটের আর চারটে স্টেশনের পরেই রেলবাজার। রেলবাজারে নেমে পাঁচ মাইল হেঁটে পার হলেই তো নবাবগঞ্জ। নবাবগঞ্জের কথাটা মনে পড়তেই সদানন্দ যেন একেবারে সশরীরে সেখানে চলে গেছে। মনে হলো বাড়িটার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে সে। বিরাট সমারোহ চারিদিকে। কীসের উৎসব চলেছে যেন ভেতরে। সে যে বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছে তার জন্যে সেখানে যেন কোথাও তো কোনও দুঃখ নেই, অনুতাপ-অনুশোচনা কিছুই নেই। বেশ সুখে আছে সবাই। বারোয়ারিতলার সেই মঙ্গলচণ্ডীর মন্দিরের পাশে নিতাই হালদারের দোকানের মাচার ওপর বসে তখনও সবাই তাস খেলছে। এ কী হলো? এমন তো হবার কথা নয়। এত বড় আঘাত সে নিজের মাথায় তুলে নিলে, এত বড় আঘাত সে সকলকে দিতে চাইলে, অথচ কারোর মনে কোনও দাগ তো লাগলো না? সে তো সকলের ভালোর জন্যেই, সকলের মঙ্গলের জন্যেই এই আচরণ করেছিল।
হঠাৎ নজরে পড়লো নয়নতারা দাঁড়িয়ে আছে।
নয়নতারার পরনে একখানা বেনারসী শাড়ি। বিয়ের সময় যে-বেনারসীটা সে পরেছিল সেইটে। সিঁথির সামনে জ্বলজ্বল করছে সিঁদুর।
সদানন্দ নয়নতারার দৃষ্টি এড়িয়ে চলে আসছিল, কিন্তু নয়নতারা দেখতে পেয়ে গেছে। একেবারে সামনে এসে পথ আটকে দাঁড়ালো সে।
বললে–তুমি?
সদানন্দ কোনও জবাব দিলে না তার কথার।
–তুমি তো চলে গিয়েছিলে। আবার এলে যে?
সদানন্দ চারিদিকে চেয়ে বললে–এখন দেখছি না-এলেই হয়ত ভালো হতো!
–কেন?
–আমি চলে গেলুম বলে কোথাও কোনও ব্যতিক্রম নেই। কোনও দুঃখ, কোনও ফাঁক কিছুই নেই। তুমিও তো আর সেরকম নেই।
নয়নতারা বললে–কেন সেরকম থাকবো? তুমি কি ভেবেছিলে তুমি না থাকলে পৃথিবীর চলা বন্ধ হয়ে যাবে? আকাশে চন্দ্র-সূর্য উঠবে না? না আমিও আর সিঁথিতে সিঁদুর দেব না, আমিও বেনারসী শাড়ি আর পরবো না। তুমি ভেবেছিলেটা কী? ভেবেছিলে তুমি চলে যাবার সঙ্গে সঙ্গে সব ওলোট-পালট হয়ে যাবে!
সদানন্দ বললো–আমারই ভুল হয়েছিল।
নয়নতারা বললে–শুধু ভুল নয়, তোমার অন্যায়ও হয়েছিল। কিন্তু তোমার ভুলের জন্য আমি ভুগতে রাজি নই, তোমার অন্যায়ের ভাগ আমি নিতে রাজি নই, এটা জেনে রেখো। তুমি ভেবেছিলে সকলের তালে তাল না দিয়ে তুমি অক্ষয় কীর্তি রেখে যাবে। তা হবে না। পৃথিবী তোমাকে তা হতে দেবে না। আমিও তোমাকে তথাগত বুদ্ধদেব হতে দেব না, শ্রীচৈতন্যদেবও হতে দেব না। সেই জন্যেই আজ এত ঘটা করে বেনারসী পরেছি, এত জাঁক করে সিঁথিতে সিঁদুর পরেছি–এ বাড়িতেও তাই এত বেশি ঘটা করে আজ লক্ষ্মীপূজো হচ্ছে–দেখছো তো, তুমি থাকবার সময় যত ঘটা হতো তার চেয়েও বেশ ঘটা হচ্ছে তুমি চলে যাবার পর–
–দাদাবাবু, দাদাবাবু!
হঠাৎ ঘরের দরজায় ধাক্কার শব্দে সদানন্দর তন্দ্রা ভেঙে গেল। তবে কী স্বপ্ন দেখছিল সে এতক্ষণ! এইটুকুর মধ্যেই এতখানি স্বপ্ন দেখে ফেললে সে! আর যাদের চিরকালের মত সে ত্যাগ করে এসেছে, যাকে ত্যাগ করে সে চরম আঘাত দিয়েছে, যার জীবন নষ্ট করে দিয়ে সে নিরুদ্দেশের অনিশ্চয়তার মধ্যে নিজের পরিত্রাণ খুঁজেছে, তাদের স্বপ্নই কি দেখতে হয় এই সময়ে?
–দাদাবাবু, দাদাবাবু—
সদানন্দ বিছানা ছেড়ে উঠে দরজার খিলটা খুলে দিতেই দেখলে মহেশ দাঁড়িয়ে আছে।
মহেশ সারাদিন রাণাঘাটে কাটিয়ে এসেছে। ট্রেনে গেছে এসেছে। মুখ-হাত-পা তখনও ধোওয়া হয়নি। সেই অবস্থাতেই ওপরে বাবুর সঙ্গে কথা বলেছে। তারপর সেখান থেকে আবার তাকে ডাকতে এসেছে।
বললে–আপনি ঘুমিয়ে পড়েছিলেন নাকি! আমি যে বাবুকে বললুম আপনি জেগে আছেন
–তোমার বাবুও কি এখনও জেগে আছেন?
–হ্যাঁ, বাবুর রাত্তিরে ভালো ঘুম হয় না। বাবুও জেগে আছেন, মাও জেগে আছেন। আপনি যদি পারেন তো একবার ওপরে যান–তিনি একবার ডাকছে আপনাকে–
সদানন্দ বললে–যাচ্ছি, এখুনি যাচ্ছি। কিন্তু কী এত জরুরী কাজ যে এখুনি ডাকছেন।
বলে গেঞ্জিটা গায়ে দিয়ে নিলে। তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে লাগলো।
.
সেদিন সকাল থেকেই মনের ভেতরে বড় অস্থিরতা ভোগ করছিলেন সমরজিৎবাবু। মহেশকে পাঠিয়েছিলেন নবাবগঞ্জে। সারাদিনের পর যখন সন্ধ্যে হলো তখন একবার ঘড়ি দেখলেন। তারপর যখন রাত আটটা বাজলো তখন আর একবার ঘড়ি দেখলেন। তারপর রাত ন’টা বাজলো, দশটা বাজলো। খাওয়া-দাওয়ার পর সবাই শুয়ে পড়লো। গৃহিণী ঘরে আসতেই জিজ্ঞেস করলেন–মহেশ এখনও এল না কেন?
তা ভাবলেন হয়ত ট্রেন লেট আছে। তারপর যখন অনেক রাত্রে মহেশ এল তখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লেন।
বললেন কী রে, কী হলো? নবাবগঞ্জে গিয়েছিলি?
মহেশ বললে–হ্যাঁ বাবু গিয়েছিলুম। নবাবগঞ্জ কি এখেনে? রেলবাজারে নেমে পাঁচ ক্রোশ রাস্তা, গিয়ে পৌঁছুতেই তো দু ঘন্টা গেল।
–তারপর গিয়ে কি দেখলি তাই বল্! দাদাবাবু যা বলেছে সব সত্যি? হরনারায়ণ চৌধুরী বলে কেউ আছে সেখানে? কত বড় বাড়ি দেখলি? জমিদার তারা?
মহেশ বললে–না বাবু, তারা ওখানে কেউ নেই।
–কেউ নেই মানে? সব মিথ্যে কথা বলেছে নাকি তবে?
মহেশ বললে–আজ্ঞে না বাবু, মিথ্যে কথা নয়। দাদাবাবু যা বলেছে সব সত্যি। সেই বাড়িও দেখে এলুম, বাড়িটাও আজ্ঞে খুব বড়। কিন্তু বাড়িতে কেউ লোক নেই–
