তারপর আর বেশিদিন দেরি করেননি তিনি। তার কিছুদিন পরেই সেই ছেলের বিয়ে দিয়ে ঘরে বউ এনেছিলেন।
কিন্তু যা ভেবেছিলেন তা হয়নি। তার পর যত দিন গেছে, মনে মনে যত দুঃখ পেয়েছেন আর সংসারের ওপর বৈরাগ্য তাঁর তত বেড়েছে। আরো বেশি পূজোপাঠের দিকে মন গেছে। গঙ্গায় ডুব দেবার সময় আরো বেশি করে ভগবানকে ডেকেছেন। একেবারে যখন অনিবার্য হয়েছে তখন ছাড়া আর কখনও দেশে যাননি। যখন গেছেন তখন কলকাতা থেকে দিন কতকের জন্যে মুক্তি পাবার জন্যেই গেছেন। পূর্বপুরুষের বিরাট দালানবাড়িটার ভেতরের ঘরে গিয়ে অনেক দিন চুপ করে খাটের ওপর শুয়ে থেকেছেন। গোমস্তানায়েব এসে জমিজমার ফসলের হিসেব দিয়েছে। ধান-পাট-তরিতরকারি বেচার টাকা দিয়েছে। তিনি যথারীতি তা নিয়েছেন। কিন্তু কখনও হিসেবের চুলচেরা বিচার করে নিজের অবসর যাপনের শান্তি ক্ষুণ্ণ করেননি। তর্ক করে গোমস্তার ভুল ধরতেও চেষ্টা করেননি। কার জন্যেই বা সে-সব করবেন। নিজের একটা তো শরীর। তার ওপর তাঁর জীবনের মেয়াদও প্রায় শেষ হয়ে আসবার দিকে। তিনি জানতেন তাঁর সঙ্গে সঙ্গে এই সব কিছুই একদিন নষ্ট হয়ে যাবে। কেউ আর এখানে আসবে না। তারপর যারা এখানে থাকবে তারাই সব কিছু ভোগ দখল করবে। সুতরাং মায়া বাড়িয়ে লাভ কী?
কিন্তু সদানন্দ আসবার পর থেকেই যেন আবার তাঁর আশা হয়েছিল।
গৃহিণী ঘরে এলে ডাকলেন। বলতেন–শোন—
গৃহিণী কাছে আসতো।
তিনি বলতেন–একটা কথা কাউকে যেন বোল না। সদানন্দ ছেলেটাকে তোমার কেমন লাগে?
গৃহিণী বলতো–ভালোই তো, কেন? ওকথা জিজ্ঞেস করছো কেন?
–না, এমনি তোমায় জিজ্ঞেস করছি। এতকাল এ বাড়িতে তো রয়েছে! তুমিও তো দেখছো। স্বভাব-চরিত্র কেমন মনে হচ্ছে তোমার?
গৃহিণী বলতো–স্বভাব-চরিত্র আমি কেমন করে জানবো, আমি থাকি বাড়ির ভেতরে, সে থাকে বাইরে বাইরে, আমি কি আর দেখতে গেছি সে বাইরে গিয়ে কী করছে না করছে?
সমরজিৎবাবু বলতেন–তা তুমি যা জানো তা জানো, আমার কিন্তু ছেলেটিকে পছন্দ হয়েছে–আমি মহেশকে ওদের দেশে পাঠিয়েছি খবরাখবর আনতে–
–কীসের খবর?
–ওই সদানন্দর দেশে কে আছে না-আছে, এই সব জানতে। কলকাতা থেকে নবাবগঞ্জ তো আর বেশি দূর নয়। রাণাঘাট থেকে আরো কাছে। সকালবেলা গিয়ে আবার রাত্তিরেই ফিরে আসা যায়।
গৃহিণী বললে–সে-খবর নিয়ে তুমি কী করবে?
সমরজিৎবাবু বললেন সদানন্দকে যা-যা জিজ্ঞেস করেছি তার তো সবই ঠিক ঠিকই উত্তর দিয়েছে। এখন মহেশ গিয়ে দেখে এসে কী বলে দেখি, তারপর ভাবছি ও যদি রাজী হয় তো আমি ওকে বরাবর এখানেই রেখে দেব।
–রেখে দেবে মানে? তোমার কি এক ছেলেকে নিয়েও মনের আশ মিটলো না? তার বিয়ে দিয়েছ, তার বউ এখানে রয়েছে। একে বাড়িতে রাখলে তার কী হবে? সে কোথায় যাবে?
সমরজিৎবাবু বললেন–সে সব আমি ভাবিনি ভাবছো? বউমা আমার সঙ্গে থাকে ভালো আর নয়ত খোকার সঙ্গে চলে যাক। আমি কাউকে এ বাড়িতে থাকতেও বলবো না কিম্বা চলে যেতেও বলবো না। কিন্তু আমার এই শেষ বয়সে আর এ-সব সহ্য হচ্ছে না। আমি অন্তত যাবার সময় দেখে যেতে চাই যে আমি বাড়িতে এমন একজনকে রেখে গেলাম যে মানুষের মত মানুষ। আমার পূর্বপুরুষের এই সমস্ত সম্পত্তি একজন অমানুষের হাতে পড়বে এটা ভাবলে আমি পরলোকে গিয়েও শান্তি পাবো না। এ ব্যাপারে তুমি আর কোনও আপত্তি কোর না–
গৃহিণী বললে–তুমি তো বললে, কিন্তু ওর তো বাপ-মা আছে, ভাই-বোন কেউ আছে–তারা যদি অমত করে?
–তাদের সঙ্গে যদি অত সম্পর্ক থাকবে তো কেউ এমন করে বাড়ী ছেড়ে চলে আসতে পারে?
গৃহিণী বললে–কী জন্যে চলে এসেছে তা কি তুমি জানো?
–সে সব আমি এবার জিজ্ঞেস করবো। তাই তো মহেশকে পাঠিয়েছি সেখানে। দেখি মহেশ এসে কী বলে।
তারপর জিজ্ঞেস করলেন–বউমা কোথায়?
–বউমা নিজের ঘরে শুতে গেছে। বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছে।
–তুমি বউমাকে যেন এ-সব কথা আবার বলো না। ভেবো না বউমাকে আমি কোনও রকমে বঞ্চিত করবো। আমি যখন তাঁকে এবাড়িতে বউ করে এনেছি তখন তার ভরণ পোষণের সব রকম ব্যবস্থা করে তবে সব করবো। খোকা থাকুক আর না থাকুক, বউমার কোনও কষ্ট হবে না–
সদানন্দ নিচের ঘরে শুয়ে শুয়ে আকাশ-পাতাল ভাবছিল। তার ধারণাও ছিল না যে তার ভবিষ্যৎ নিয়ে তারই মাথার ওপরকার আর একটা ঘরে তখন দুজন মানুষ দুর্ভাবনার জাল পাততে বসেছে। হঠাৎ সদরে আওয়াজ হতেই কি যেন দরজা খুলে দিলে।
ভেতর থেকে ঠাকুর বললে–কে?
–আমি মহেশ। দরজা খোল ঠাকুর।
সারাদিন মহেশের দেখা পাওয়া যায়নি। এতক্ষণ কোথায় ছিল সে! সদানন্দ বিছানা ছেড়ে উঠলো। দরজার বাইরে বারান্দায় এসে দাঁড়াতেই দেখলে মহেশ। একেবারে ধুলোমাখা চেহারা। সারাদিন রোদে-ধুলোতে ঘুরলে যেমন তামাটে চেহারা হয় মানুষের তেমনি হয়ে গেছে মহেশ।
–কোথায় ছিলে মহেশ? সারাদিন তোমায় দেখতে পাইনি!
মহেশ হাসলো। এক মুখ হাসি। বললে–আপনি এখনও ঘুমোননি? খাওয়া হয়েছে?
সদানন্দ বললে–আমার এত সকাল সকাল ঘুম আসে না। তুমি বুঝি ভোরবেলা বেরিয়েছিলে?
–হ্যাঁ, ভোরের ট্রেন না ধরলে যে বেলা পুইয়ে যায়, মাথায় কড়া রোদ লাগে।
–রাণাঘাটে গিয়েছিলে বুঝি?
–হ্যাঁ, বাবু পাঠিয়েছিলেন। সেই সাতসকালে গিয়েছি, আর এখন আসছি। যাই বাবুর সঙ্গে দেখা করে আসি
