–আপনার বাড়ি এখান থেকে কতদূর?
–এই তো কাছেই বাবা, বেশি দূর নয়।
সদানন্দ কী ভেবে বললে–আচ্ছা চলুন–
তার সামান্য চরণ-পূজোয় যদি বুড়ির ওবাতের ব্যথা সারে তো কী এমন তার ক্ষতি। সদানন্দ বুড়ির পেছন-পেছন চলতে লাগলো। একটা গলি দিয়ে ঢুকে আর একটা গলির ভেতরে কিছুক্ষণ গিয়ে বুড়ি বললে–এই আমার বাড়ি, এসো বাবা, আমার সঙ্গে এসো–
বলে সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠলো। তারপর একটা দরজার সামনে গিয়ে কড়া নাড়তে লাগলো। কে একজন এসে দরজা খুলে দিলে। পাশেই একটা ঘর। সেই ঘরের মধ্যে সদানন্দকে নিয়ে গিয়ে বললে–তুমি এখেনে একটু বোস বাবা
সদানন্দকে ঘরে বসিয়ে তারপর বুড়ি ভেতরের দিকে কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল।
তারপর ভেতরে গিয়ে গলা নামিয়ে ডাকতে লাগলো–কই রে বাতাসী, কোথায়? ও বাতাসী
বাতাসী ভেতরে কী করছিল কে জানে! মাসির ডাকে সামনে এসে বললে–কী মাসি?
মাসি বললে–ওলো, সেই ছেলেটাকে এতদিনে পেয়েছি রে?
–কোন্ ছেলেটাকে?
মাসি বললে–সেই যে, সেবার খোঁজখবর করবার জন্যে তোকে দিয়ে বড়বাবুকে একটা ছবি দিয়েছিলাম, সেই যে আমার প্রকাশ ছেলের কাছ থেকে আগাম একশো টাকা নিইছিলুম। পরে আরো ন’শো টাকা দেবার কথা আছে? তোর মনে পড়ছে না?
–তা কী করে তাকে চিনতে পারলে?
মানদা মাসি বললে–চিনতে পারবো না বাছা? তার ছবি তো তোর কাছে দিইছিলুম বড়বাবুকে দেবার জন্যে। বড়বাবুকে ছবিটা দিয়েছিলি তুই?
বাতাসী বললে–সে তো আমি সেই দিনই দিয়েছিলুম—
মানদা মাসি বললে–তা সে ছবিটা এখন কোথায়? বড়বাবুর কাছে না তোর কাছে?
–সে তো বড়বাবুর কাছে দিইছিলুম, বড়বাবুর কাছেই আছে।
–তা বড়বাবু আজকে আসবে তো?
বাতাসী বললে–এই তো ভোর বেলাই বাড়ি চলে গেল, বড়বাবুর বাড়িতে এখন আবার গণ্ডগোল চলছে কিনা, কলকাতায় থাকলে আপিস থেকে সোজা এখেনেই চলে আসবে
মানদা মাসি বললে–এখন ছেলেটাকে তো ভুজুং দিয়ে তোর বাইরের ঘরে এনে বসিয়ে রেখে এসেছি। যতক্ষণ না বড়বাবু আসে ততক্ষণে তোর এখানে আটকে রাখতে পারবি নে? তুই খাবার-দাবারের কিছু বন্দোবস্ত কর। আমি যাই অনেকক্ষণ ছেলেকে বসিয়ে রেখে দিয়ে এসেছি—
.
সমরজিৎবাবুর পূর্বপুরুষ যেমন গ্রামের জমি-জমা করেছিলেন, তেমনি বুঝেছিলেন যে গ্রামে যত জমিজমাই থাক, কলকাতায় একটা সম্পত্তি করতেই হবে। ভাঁড়ার যখন উপচে পড়ে তখন বাড়তি সম্পত্তি কোথায় লগ্নী করবো তার সমস্যা উদয় হয়। সেই আদিকালে এই বউবাজার অঞ্চলের বাড়িটার উদ্ভব হয় সেই কারণেই। তখন কর্তারা থাকতেন গ্রামে। গ্রামের জমিজমা থেকে গ্রাসাচ্ছাদন আসতো। কিন্তু ছেলেদের লেখা-পড়া করতে থাকতে হতো কলকাতায়। তখন এই আজকালকার মতন হোস্টেল বোর্ডিং এসব থাকলেও কর্তাব্যক্তিরা সেখানে ছেলেদের পাঠিয়ে নিশ্চিন্ত হতে পারতেন না। খাওয়ার কষ্ট থাকার কষ্ট ছাড়াও আরো ছিল একটা ভয় সেটা হচ্ছে কুসঙ্গে পড়ে খৃষ্টান বা বাহ্ম হয়ে যাবার ভয়! তারপরে আছে চরিত্রহানির আশঙ্কা।
সমরজিৎবাবুর পূর্বপুরুষরা তাই কেউ এখানে থেকে লেখা-পড়া করবার সময় অন্য ছেলেদের মত কুসঙ্গে পড়ে মদ্যপান যেমন করেননি, তেমনি খৃষ্টানও হননি কিম্বা ব্রাহ্মও হননি। বরং দেব-দ্বিজে ভক্তি আর পূজো-পার্বণের প্রতি আসক্তিই তাঁদের উত্তরোত্তর বেড়ে এসেছে। সেই বংশের শেষ পুরুষ হচ্ছেন সমরজিৎবাবু। আর সেই সমরজিৎবাবু একাই তখনও অতি কষ্টে বংশের ঐতিহ্যটা টানতে টানতে এত দূর টেনে নিয়ে এসেছিলেন। কোথাও বন্যা কিম্বা দুর্ভিক্ষ হলে মনে কষ্ট হতো। বাপ-পিতামহের টাকা এই সব কাজে ব্যয় করতে পারলে মনে হতো তিনি টাকা সদ্ব্যয় করছেন। এ ছাড়া ছিল দান। সৎ-উদ্দেশ্য দাতব্য করতে তাঁর আপত্তি হতো না। রামকৃষ্ণ মিশনের যতগুলো শাখা আছে সবগুলোতে মাঝে-মাঝে টাকা পাঠাতেন। টাকা পাঠিয়ে মনের কষ্ট লাঘব করতে পেরে যেন মনে মনে পরিত্রাণ পেতেন।
কিন্তু উদ্বেগ ছিল ওই একটা বিষয়েই। ছেলে ফুটবল খেলতে পারে ভালো এ-খবরটা শুনে তাঁর ভালো লেগেছিল। খেলার জন্যে স্কুল থেকে পাওয়া অনেক মেডেল দেখে তিনি তাকে বরাবর উৎসাহই দিয়েছিলেন। কিন্তু যেদিন সেই ছেলেই আবার প্রথম মাতাল হয়ে বাড়িতে ঢুকলো সেই দিনই তাঁর টনক নড়লো।
ছেলের সামনে গিয়ে তিনি মুখোমুখি দাঁড়ালেন। খোকা তখন টলছে। জিজ্ঞেস করলেন–তুমি মদ খেয়েছ?
খোকা লজ্জায় মাথা নিচু করলো।
সমরজিৎবাবু আবার গলা চড়ালেন কথা বলছো না কেন? তুমি মদ খেয়েছ?
খোকা অনেক পীড়াপীড়ির পর উত্তর দিলে–দেখতে তো পাচ্ছো মদ খেয়েছি, আবার জিজ্ঞেস করছো কেন মিছিমিছি?
সমরজিৎবাবু রাগতে যাচ্ছিলেন। রেগে গিয়ে হয়ত একটা অশালীন কাণ্ড করেও ফেলতেন, কিন্তু গৃহিণী এসে বাধা দিলে। সমরজিৎবাবুকে ধরে ফেললে। বললে–করছ কী তুমি?
বলে খোকাকে নিয়ে গিয়ে ঘরে শুইয়ে দিলে। তারপর কর্তার কাছে এসে বললে–তুমি করছিলে কী? ওর সঙ্গে অমন কথা বলতে আছে? তুমি জানো ও রাগী ছেলে!
ততক্ষণে সমরজিৎবাবুও নিজেকে সামলে নিয়েছিলেন। সাধারণত তিনি মেজাজ কখনও গরম করেন না। কিন্তু তাঁর সাধের সংসারের ভিতের ওপরেই বুঝি আঘাত লেগেছিল সেদিন। এত সাধ করে তিনি যে ছেলেকে নিজের করে নিয়েছিলেন তার কাছ থেকে আঘাত আসাতেই সেটা এত বেশি করে লেগেছিল তাঁর বুকে।
