প্রথম দিকে সমরজিৎবাবু বলেছিলেন–তুমি চাকরি ছেড়ে দাও–তোমার চেয়ে যাদের অবস্থা খারাপ তারা এ চাকরি পেলে বেঁচে যাবে–
কিন্তু খোকার মনে তখন ক্ষমতার লোভ। বাড়িতে বসে বসে খাওয়ার মধ্যে আরাম থাকলেও ক্ষমতা নেই। চাকরিতে ক্ষমতা আছে। দশজনকে হুকুম করতে পারবে। দশজনে ভয়-ভক্তি করবে। চোর-গুণ্ডা বদমায়েরাও খাতির করবে।
তখন একদিন সমরজিৎবাবু দেখলেন ছেলে রাত করে বাড়ি ফিরছে। আবার কোনও দিন রাত্রে বাড়িতে ফিরছেও না। জিজ্ঞেস করলে বলে–ডিউটি ছিল। তারপরে একদিন দেখলেন মুখ দিয়ে মদের গন্ধ বেরোচ্ছে। সেদিন আর দেরি করলেন না। একটা সুন্দরী মেয়ে দেখে শুভদিনে খোকার বিয়ে দিয়ে দিলেন।
এসব ঘটনা সদানন্দ এবাড়িতে আসার অনেক আগেকার ঘটনা। কিন্তু ক দিন এখানে থাকতে থাকতে সদানন্দ সব জেনে ফেললে! যেদিন অনেক রাত্রে প্রথম কাকাবাবুর সঙ্গে তার ছেলের কথা কাটাকাটি হয়েছিল, যেদিন মহেশ তার বড় দাদাবাবুকে বাড়ি থেকে রাস্তায় বার করে দিয়েছিল, সেইদিন থেকেই সন্দেহটা গাঢ় হয়েছিল তার। তারপর থেকে আরো অনেকবার ওই ঘটনারই পুনরাবৃত্তি হলো। সমরজিৎবাবু ক্রমেই যেন কেমন অস্থির হয়ে উঠছিলেন। ভালো করে আগেকার মত আর কথা বলতেন না সদানন্দের সঙ্গে। কিন্তু সদানন্দও ক্রমে অতিষ্ঠ হয়ে উঠছিল। সময় পেলেই রাস্তায় বেরিয়ে পড়তো। কোথায় সেই নবাবগঞ্জের ফাঁকা অবহাওয়া আর কোথায় এই ঘিঞ্জি শহরের গোলমাল। ক’দিন আগেই এখানে দাঙ্গা হয়ে গিয়েছে, চলতে ফিরতে ভয় করে সকলের। তবু বাড়ি থেকে না বেরিয়েও কেউ থাকতে পারে না। কিন্তু এই শহর ছাড়া কোথায়ই বা সে যাবে! বাড়ি থেকে যখন বেরিয়েছিল তখন কিছুই ঠিক ছিল না কোথায় সে যাবে। কিন্তু ঘটনাচক্রে যখন সে এখানে এসে পড়েছে তখন কী কাজই বা সে এখানে করবে! এ পৃথিবীটাই হয়ত এমনি। এখানে পরস্পরের সঙ্গে পরস্পরের কেবল প্রয়োজনের সম্পর্ক ছাড়া আর কোনও সম্পর্ক নেই। প্রয়োজন থাকলে তোমার সঙ্গে আমি কথা বলবো, তোমার সঙ্গে আমি এক বিছানায় শোব, প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলেই আমি আবার তোমাকে দূর করে দেব। কিন্তু কেন ভালবাসার সম্পর্ক থাকবে না তোমার সঙ্গে? কেন প্রয়োজনের বদলে প্রীতি দিয়ে তুমি আমাকে আকর্ষণ করবে না?
সেদিন রাস্তায় চলতে চলতে দেখলে বুড়ি মতন একজন মেয়েমানুষ তার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে দেখছে। সদানন্দ অবাক হয়ে গেল! তার দিকে এমন করে চেয়ে দেখছে। কেন?
মনে হলো বুড়িটা যেন গঙ্গাস্নান করে বাড়ি যাচ্ছে। যেতে যেতে তাকে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে গেছে।
সদানন্দ জিজ্ঞেস করলে–আপনি আমায় কিছু বলবেন?
বুড়িটা বললে–তোমার বাড়ি কোথায় বাবা?
সদানন্দ বললে–আমি বউবাজারে থাকি।
–বউবাজারে! বউবাজারে থাকো বাবা তুমি তা এদিকে এসেছে কেন? কোনও কাজ আছে বুঝি?
সদানন্দ বললে–না এমনি বেড়াচ্ছি–কেন? আপনার কিছু দরকার আছে?
বুড়িটা বললে–দরকার তো ছিল বাবা, কিন্তু তোমাকে তা বলি কী করে তাই ভাবছি। তুমি বামুন তো?
সদানন্দ বললে–হ্যাঁ, আমি ব্রাহ্মণ! কেন?
–আমি বললে কি আর তা বিশ্বাস করবে বাবা? তোমরা তো আজকালকার ছেলে, ঠাকুর-দেবতাতে তো তোমাদের বিশ্বাস নেই। তাই বলবো কি না ভাবছি।
সদানন্দ বললে–বলুন না কী বলবেন?
বুড়ি বললে–আমি একটা স্বপ্ন দেখেছিলুম বাবা।
স্বপ্ন?
–হ্যাঁ বাবা স্বপ্ন। ঠাকুর স্বপ্ন দিয়েছিল যে সকাল বেলা চান করে আসার পথে যদি কোনও বামুনের ছেলেকে দেখতে পাস তা তাকে বাড়িতে এনে তার চরণ পুজো করিস!
সদানন্দ অবাক হয়ে গেল। এ আবার কী কথা! চরণ-পুজো।
বললে–আপনি আমার চরণ-পূজো করবেন? কেন?
বুড়ি বললে–ওই যে বললুম বাবা ঠাকুরের স্বপ্ন। তা আমার সঙ্গে একবার আমার বাড়িতে যাবে? আমি তোমার চরণ-পূজো করবো!
সদানন্দর কেমন সন্দেহ হলো। চেনা নেই শোনা নেই যার-তার বাড়িতেই বা যাবে কেন সে?
বললে–দেখুন, আমি আপনাকে চিনি না আর আপনি আমার চরণ-পূজো করবেন কেন তাও বুঝতে পারছি না। এরকম স্বপ্নই বা আপনি দেখতে গেলেন কেন? আর আমি ছাড়া কি আর বামুন কেউ নেই কলকাতায়? আপনার বাড়ির পাশেই তো কত বামুন পেতে পারেন।
বুড়ি বললে–তাতে তো কাজ হবে না বাবা! চান করে উঠেই যে আমি তোমার মত বামুনকে প্রথম দেখেছি। অন্য কোন বামুনের চরণ-পূজো করলে তো আমার কোনও লাভ হবে না!
সদা তবু বুঝতে পারলে না। বললে–লাভ মানে? আমার চরণ-পূজো করে আপনার কী লাভ?
বুড়ি বললে–তোমাকে আর দুঃখের কথা বলবো কী বাবা। আমার বাতের অসুখ। বাতের অসুখে আমি জেরবার হয়ে যাচ্ছি। শেষকালে বাবা তারকনাথের মন্দিরে গিয়ে হত্যে দিয়েছিলুম। সেখানে বাবা স্বপ্ন দিলেন যে পূর্ণিমের দিন গঙ্গায় চান করবি, চান করে আসার পথে প্রথম যাকে বামুন বলে জানতে পারবি তার চরণ-পূজো করলে তোর বাতের ব্যথা সেরে যাবে। এ কোমরের ব্যথা আমার এমন যে একেবারে নড়ে বসতে পারিনে। তা তুমি বাবা আমার এ উবকারটা করতে পারবে না!
এ এক অদ্ভুত প্রস্তাব! এমন ঘটনা সদানন্দ জীবনে কখনও শোনেনি কারো কাছ থেকে।
বললে–আমার চরণ-পূজো কী করে করবেন? কতক্ষণ সময় লাগবে?
বেশিক্ষণ তোমায় কষ্ট দেব না বাবা। তোমার পায়ে ফুল-গঙ্গাজল দিয়ে পেন্নাম করবো আমি আর বাজারের মিষ্টি এনে তোমাকে দেব, আর তুমি পেসাদ করে দেবে! আধঘণ্টার মধ্যেই তোমায় আমি ছেড়ে দেব বাবা-বেশি সময় লাগবে না–
