বেহারি পাল বললে–তা কী জানি, তোমার জামাইবাবু তো গেছেন সেই মাসখানেক হলো এখনও তো এলেন না। আর কী জন্যেই বা আসবেন বলে? এখেনে তো আর কেউ রইল না। তোমার দিদি রইল না, তোমার ভাগ্নেও রইল না, আর তোমার ভাগ্নে বউ সেও পর্যন্ত রইল না। তাহলে আর এখানে একলা একলা পড়ে থাকবেন কী নিয়ে বলো না? কার জন্যে পড়ে থাকবেন? আর সম্পত্তি? যাদের জন্যে সম্পত্তি করা তারাই যখন রইল না তখন আর কাদের জন্যেই বা সম্পত্তি দেখবেন?
এরপর শালাবাবু আর দাঁড়ালো না। বললে—যাই–
বেহারি পাল আবার বললে–আর তা ছাড়া তোমার পিসেমশাই-এরও তো কেউ নেই? কীর্তিপদবাবুর? তারও তো অনেক টাকা! সুলতানপুরের অত সম্পত্তি! তিনি মারা গেলে তো তোমার জামাইবাবু সব পাবে। তোমার পিসেমশাই-এর তো আর কোনও সন্তান নেই?
প্রকাশ বললে–না।
–তাহলে? তোমার জামাইবাবুই তো এখন সেই সম্পত্তির একমাত্র ওয়ারিশান। তারপর তোমার জামাইবাবুর পর আর কে পাবে? সদা ফিরে এলে সদা পাবে, আর নয় তো তুমি!
এত কথা প্রকাশের মনে পড়েনি। তাহলে? তাহলে তো শেষ পর্যন্ত পিসেমশাই-এর সমস্ত সম্পত্তি তার কপালেই নাচছে। কী আশ্চর্য! কথাটা খেয়াল হতেই আর দাঁড়ালো না প্রকাশ। বললে–যাই পাল মশাই, আমি যাই
তারপর সকলের দিকে চেয়ে বললে–যাই হে, কিছু মনে কোর না তোমরা, পিসেমশাই এর অসুখ, এ সময়ে আমার বাইরে থাকা উচিত নয়–
বলে রেলবাজারের দিকে হন হন করে হাঁটা দিলে। তাড়াতাড়ি পা চালালে দুটোর ট্রেনটা ধরা যাবে!
পেছন থেকে বেহারি পাল জিজ্ঞেস করলে–খাওয়ার কী হবে তোমার শালাবাবু? দুটো খেয়ে গেলে হতো না?
চুলোয় যাক গে খাওয়া! টাকা ছড়ালে কপালে খাওয়া অনেক জুটবে। এখন যদি গিয়ে ভালোয় ভালোয় প্রকাশ দেখে পিসেমশাই মারা গেছে তবেই সুরাহা। জামাইবাবু একলা আর কত খাবে! দেখা-শোনা করতেও তো লোক দরকার। আর তারপরে জামাইবাবুই বা আর ক’দিন? জামাইবাবু মারা গেলে তখন?
কথাটা কল্পনা করতেই প্রকাশ দু’হাত জোড় করে উদ্দেশ্যে প্রণাম করলে। হে মা কালী, হে মা মঙ্গলচণ্ডী, আমি জীবনে কোনও পাপ করিনি, জীবনে কখনও কোনও অন্যায় করিনি, জীবনে কারো টাকা মারিনি, আমার দিকে একটু দেখো মা। আমি বড় অনাথ! কে সম্পত্তি করে যায় আর কে তা খায়! ইচ্ছাময়ী সবই তোমার ইচ্ছা, আমরা তো কেবল নিমিত্ত মাত্র। জয় মা কালী, জয় মা মঙ্গলচণ্ডী!
বলে মোবারকপুরের রাস্তা ধরলে। মোবারকপুরের রাস্তাটা পেরোলেই সাইকেল রিকশার আড্ডা। সেখান থেকে এক দৌড়ে একেবারে সোজা রেলবাজার।
প্রকাশ হনহন করে রাস্তা মাড়াতে লাগলো।
.
সমরজিৎবাবু ঠিকই করে ফেলেছিলেন। রোজ-রোজ অশান্তির চেয়ে চিরকালের মত একটা পাকাপাকি বন্দোবস্ত করে রাখা ভালো। যেদিন রাণাঘাট স্টেশনে সদানন্দকে দেখেছিলেন সেইদিন থেকেই একটা ক্ষীণ ইচ্ছে তাঁর মনের মধ্যে বাসা বাঁধতে শুরু করেছিল। তারপর বাড়িতে অশান্তিটা যত বেড়েছে ততই সে ইচ্ছেটা আরো বড় হয়ে মনের মধ্যে দৃঢ়মূল হয়েছে। পৈত্রিক সম্পত্তিটার কথা ভেবেই একদিন নিজের করে নিয়েছিলেন তাঁর খোকাকে। ভেবেছিলেন স্বভাবচরিত্র ভালো, বংশটাও ভদ্র, এক বিধবা ছাড়া তখন খোকার কেউ ছিল না আর। যতদিন বুড়ি-মা বেঁচে ছিল ততদিন তাকে মাসে মাসে পাঁচশো টাকা পাঠিয়েছেন। তারপর যেদিন তিনি মারা গিয়েছে তখন থেকে মুক্তি।
একদিন খোকা এসে সামনে দাঁড়ালো। সমরজিৎবাবু বললেন–কী হলো? চাই কিছু তোমার?
খোকা বললে–না, চাই না কিছু–
–তাহলে?
খোকা বললে–আমি একটা চাকরি নিয়েছি–
চাকরি! চাকরি শুনেই সেদিন বিস্মিত হয়ে উঠেছিলেন সমরজিৎবাবু। বললেন–চাকরি নিয়েছ মানে? কে তোমায় চাকরি নিতে বলেছে? কিসের চাকরি?
–পুলিসের।
পুলিসের চাকরি! সমরজিৎবাবুর তখন যেন বিস্ময়ের আর সীমা রইল না। বললেন– হঠাৎ যে তুমি চাকরি নিলে? কত মাইনে?
–দেড় শো টাকা।
–দেড় শো টাকা মাইনে নিয়ে কি তুমি রাজা হবে? আমি তো চারদিকে চাঁদাই দিই মাসে দেড় শো টাকা করে। আর তুমি এ বাড়ির ছেলে হয়ে কিনা দেড় শো টাকা মাইনের চাকরি করবে?
গৃহিণী গোলমাল শুনে ঘরে এসে দাঁড়ালো। বললে–কী হয়েছে গো? কী বলছে খোকাকে?
সমরজিৎবাবু বললেন–ওই দেখ, তোমার ছেলে দেড় শো টাকা মাইনের পুলিসের চাকরি নিয়েছে–
গৃহিণী বললে–সে কী রে খোকা, তোকে চাকরি নিতে কে বললে?
খোকা বললে–কেউ বলেনি–
–কেউ বলেনি তো চাকরি নিতে গেলি কেন? দরখাস্ত করেছিলি?
–না।
অন্য ছেলের বাবা-মা’রা ছেলের চাকরি পাওয়ার খবরে খুশী হয়, খুশী হয়ে কালী বাড়িতে গিয়ে পূজো দেয়। কিন্তু এবাড়িতে সেদিন উল্টো হয়েছিল। ছেলের চাকরি পাওয়ার খবর যেন তাদের কাছে শোক সংবাদ বলে মনে হয়েছিল। খোকা রোজ ময়দানে ফুটবল খেলতে যেত। সেখান থেকেই একদিন এক বন্ধুর সঙ্গে তাদের বাড়ি গিয়েছিল। বন্ধুর বাবা পুলিসের একজন বড় অফিসার। খোকার স্বাস্থ্য দেখে তাঁর খুব ভালো লেগেছিল।
বলেছিলেন–তুমি চাকরি কররে?
কী খেয়াল হয়েছিল খোকার কে জানে! বলেছিল—হ্যাঁ—
বলতে গেলে খোকার সেই স্বাস্থ্য দেখেই, চাকরি। আর তার সঙ্গে তার ফুটবল খেলতে পারার গুণ। সমরজিৎবাবুও যে তাকে নিজের ছেলে করে নিয়েছিলেন সেও সেই স্বাস্থ্য। অন্য লোকের যে জিনিসটা থাকলে জীবন সুখের হয়, খোকার কাছে সেই জিনিসটাই শেষ পর্যন্ত হলো কাল।
