আর তারপর একদিন বজ্রাঘাত হলো।
সবাই শুনলো–চৌধুরী-গিন্নী মারা গেছে।
সে এক অদ্ভুত মৃত্যু! কোনও কান্নাকাটির শব্দ নেই। আর কাঁদবার তখন কে-ই বা ছিল বাড়িতে যে কাঁদবে! গৌরী গিয়ে ডেকে এনেছিল বেহারি পালের বউকে। বেহারি পালের বউ এল। বেহারি পাল নিজেও এল। খবর পেয়ে আরো অনেকে এল। বুড়োমানুষ তারক চক্রবর্তী লাঠি হাতে টুক টুক করে এসে হাজির হলো।
বেহারি পালের বউ যখন ভেতরের ঘরে গিয়ে পৌঁছুল তখন চৌধুরী-গিন্নী স্থিরদৃষ্টিতে ছাদের দিকে চেয়ে আছে। মনে হলো যেন বলছে-তোমরা বলে দাও, আমি কী দোষ করেছি, আমাকে বলে দাও তোমরা–
কিন্তু তখন কে-ই বা সে কথা বলে দেবে, আর কে-ই বা সে প্রশ্নের উত্তর শুনবে! প্রশ্ন আর উত্তরের ঊর্ধ্বলোকে আর এক মহাজিজ্ঞাসার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তখন চৌধুরী গিন্নীর ছোট প্রশ্নটা যেন একেবারে নিরর্থক হয়ে গেছে। যখন চৌধুরী-গিন্নীকে নিয়ে পাড়ার ছেলেরা নদীর ধারের শ্মশানের চিতার ওপর তুললো, তখনও সেই প্রশ্নটা যেন তার চোখের তারায় অনির্বান হয়ে ঝুলছিল। আর তারপর যখন তার সমস্ত শরীরটা আগুনের শিখায় পুড়ে ছাই হয়ে গেল, তখনও বুঝি তার সে প্রশ্নটার উত্তর মেলেনি। তাই বুঝি সে প্রশ্নটা ধোঁয়া হয়ে সমস্ত আকাশ বাতাস আচ্ছন্ন করে কি-দিগন্তে ছুটে বেড়াতে লাগলো। অনুচ্চারিত শব্দে যেন জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে সকলকে প্রশ্ন করতে লাগলো–তোমরা বলে দাও, কী অপরাধ করেছি আমি, বলে দাও তোমরা–
–তারপর?
তারপর চৌধুরী মশাই একেবারে একলা হয়ে গেলেন। একেবারে একলা। সেই যে দোতলার ঘরের মধ্যে গিয়ে ঢুকলেন, সেখান থেকে আর বেরোলেন না। গৌরী রান্না করে খাবার দিয়ে আসে তাঁর ঘরে। আপন মনে বিড়বিড় করে তিনি যেন সব-সময় কী বকেন আর তারপর যখন সন্ধ্যে হয় তখন চারদিকে জানালা দরজা বন্ধ করে বিছানায় এলিয়ে পড়েন।
কিন্তু তারও ওই এক প্রশ্ন! তোমরা বলে দাও, কী অপরাধ করেছি আমি, বলে দাও তোমরা–আমার পূর্বপুরুষের এই সম্পত্তি, এই ঐশ্বর্য, এই স্থাবর অস্থাবর এত গয়নাগাঁটি- জমিজমা-পুকুরবাগান এ কার হাতে ছেড়ে দিয়ে আমি যাবো? কার ওপর গচ্ছিত করে দিয়ে আমি নিশ্চিন্ত হবো? এই সর্ষে ছোলা-ধান-পাটের ক্ষেত, এই পুকুর, বিল, বাগান–এসব কিছুর স্বত্ব কে ভোগ করবে? কার উত্তরাধিকারের মধ্যে দিয়ে আমি অতীন্দ্রিয়লোকে গিয়ে অনন্তকাল ধরে অক্ষয় হয়ে বাঁচবো?
এক-একদিন রাত্রে হঠাৎ ঘড়ঘড় শব্দ হতো। কথা বন্ধ হয়ে গেলে যেমন মানুষের গলা দিয়ে অস্পষ্ট একরকম শব্দ বেরোয় ঠিক তেমনি। কর্তাবাবুর অশরীরী উপস্থিতি যেন তাকে আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলতো।
কর্তাবাবুর অশরীরী উপস্থিতির অসহ্যতায় চৌধুরী মশাই সন্ধ্যেবেলাই দরজা-জানালা সব বন্ধ করে দিতেন। তবু রেহাই পেতেন না তিনি। কর্তাবাবুর গলা তখন স্পষ্ট হয়ে উঠতো। তিনি স্পষ্ট গলায় বলতেন–মায়া-দয়া কোর না বাবা, কারোর ওপর মায়া-দয়া কোর না, মায়া-দয়া করলেই সর্বনাশ, তাহলে এই জমি-জমা, পুকুর-বাগান কিছুই আর থাকবে না–
চৌধুরী মশাই বলতেন–কিন্তু আমি তো মায়া-দয়া করিনি কর্তাবাবু, আমি তো কারোর ওপর কোনও মায়া-দয়া দেখাইনি। আমি তো কারোর এক পয়সার বাকি খাজনা ছাড়িনি, যে আমায় ঠকাতে চেয়েছে তাকে তো আমি রেহাই দিইনি, আমি তো স্বার্থসিদ্ধির জন্যে নিজের পুত্রবধূকেও অব্যাহতি দিইনি? তবে? তবে কেন আমার এ সর্বনাশ হলো? তোমার কথা বর্ণে বর্ণে মেনেও কেন আমি সর্বস্বান্ত হলাম?
এ-প্রশ্নের কোনও জবাব মিলতো না কারো কাছে। সবাই তখন চৌধুরী মশাই-এর জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তিনিও বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন সকলের সান্নিধ্য থেকে। সে তখন তার এমন এক জীবন যাকে গ্রহণ করাও বলে না আবার বর্জন করাও বলে না। তখন তিনি নিজের জন্মভূমি, নিজের বাড়ি থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন। কেউ এলেও তার সঙ্গে তিনি দেখা করেন না। যেন নিজের কৃতকর্মের অপরাধের বোঝায় তিনি নিজেই ক্লান্ত, বিভ্রান্ত, বিপর্যন্ত।
শালাবাবু সমস্ত ঘটনাগুলো শুনলে। তার চোখের সামনে দিয়ে অনেকগুলো স্বপ্ন, অনেকগুলো স্মৃতি যেন খুব তাড়াতাড়ি ভেসে গেল। সেই কবে দিদির বিয়ের সময় সে নিজের বউ আর ছেলে মেয়ে ছেড়ে ভাগলপুর থেকে চলে এসেছিল, তার পর থেকে এই নবাবগঞ্জকে কেন্দ্র করেই তার জীবন কত দিক পরিক্রমা করেছে। সেই সদানন্দ যখন ছোট ছিল তখন তাকে নিয়ে কোথায় কোথায় গেছে। কতদিন রানাঘাটে রাধার বাড়িতে, কতদিন কলকাতার কালীঘাটে। আর যখনই টাকার দরকার পড়েছে তখনই এসে হাত পেতেছে দিদির কাছে। টাকা চাইলেই দিদি তার সিন্দুকটা খুলেছে আর দু’হাতে টাকা বার করে দিয়েছে। সেই দিদির মারা মাওয়ার খবর শুনে প্রকাশের মত লোকও কেমন অসহায়ের মত বাড়িটার দিকে শেষবারের মত চেয়ে দেখলে। তার মনে হলো সব শেষ। চিরকালের মত সব শেষ।
–আর জামাইবাবু? জামাইবাবু কোথায় গেল?
বেহারি পাল মশাই বললে–তোমার জামাইবাবু তো কিছুদিন এখানেই ছিল। একদিন দেখলুম গরুর গাড়িতে করে ইস্টিশানের দিকে যাচ্ছেন। আমি জিজ্ঞেস করলুম–কোথায় যাচ্ছেন চৌধুরী মশাই, তা চৌধুরী মশাই বললেন–ভাগলপুরে শ্বশুর মশাই-এর নাকি অসুখ–
শালাবাবু চমকে উঠেছে। বললে–পিসেমশাইএর অসুখ? তাই নাকি? কী রকম অসুখ?
