আগের লোকটা বললে–তা এতই যদি নাতির শখ চৌধুরী মশাই-এর তো চৌধুরী মশাই নিজেই তো আর একটা বিয়ে করতে পারতো!
–তাতেও যে লোকলজ্জা!
–এতই যদি লোকলজ্জার ভয় তো তখন মনে ছিল না? এখন লজ্জা-সরমের আর বাকীটা কী রইল?
পাশের লোকটা বললে–তা অত হ্যাঙ্গামে যাবার দরকারটা কী ছিল? গায়ে তো ছেলের অভাব নেই, কারো কাছ থেকে দেখে-শুনে পছন্দ করে একটা পুষ্যিপুত্ত্বর নিলেই পারতো চৌধুরী মশাই!
নিতাই বললে–কেন, তার চেয়েও তো সোজা পথ ছিল একটা–
সবাই উদগ্রীব হয়ে উঠলো–কী পথ? কী পথ?
নিতাই বললে–কেন, চৌধুরী-গিন্নীর কি ছেলে হবার বয়েস ফুরিয়ে গিয়েছে? একটা ছেলে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে, তা আর-একটা তো বিয়োতে পারতো–
সবাই হো হো করে হেসে উঠেছে।
কেদার বললে–দূর, চৌধুরী-গিন্নীকে সেদিন দেখলি নে তুই? কী রকম বুড়ি হয়ে গিয়েছে! সে-পথ থাকলে কি আর চৌধুরী মশাই চেষ্টা করতো না?
কিন্তু যাঁদের নিয়ে এত আলোচনা, এত কানাঘুষো, তাঁদের তখন আর চোখে দেখতে পায় না কেউ। আগে চৌধুরী মশাই নিজেই ক্ষেত-খামার দেখতে বেরোতেন। যেদিন বাগান ঘেরা হবে সেদিন নিজে সকাল থেকে গিয়ে জন-মজুরের কাজের তদারকি করতেন। কিন্তু তার পর থেকে আর তাঁর টিকি দেখতে পাওয়া যেত না।
লোকে বলতো–আহা, মনে বড় কষ্ট পেয়েছে চৌধুরী মশাই–
–কীসের কষ্ট? কষ্টটা কীসের?
–না, অমন জোয়ান ছেলে, এই বুড়ো বয়সে একমাত্তর ছেলে নিরুদ্দেশ হয়ে গেলে বাপের মনে কষ্ট হয় না?
–তা অমন লোকের কষ্ট হওয়াই উচিত। খুব হয়েছে, বেশ হয়েছে। মাথার ওপর ভগবান বলে কেউ নেই ভেবেছে চৌধুরী মশাই? ভেবেছে ডুবে-ডুবে জল খেলে কেউ টের পাবে না?
একজন বললে–তবে ভাই বউ বটে, হ্যাঁ! বউ-এর মত বউ! অন্য কেউ হলে ঘেন্নায় গলায় দড়ি দিত। এ-বউ লেখাপড়া জানা বলে সকলকে জানান দিয়ে শ্বশুরের মুখে জুতো মেরে চলে গেল!
–যেমন বুনো ওল তেমনি বাঘা তেঁতুল!
একজন অনেকক্ষণ ধরে বিবেচনা করে ভেবেচিন্তে বললে–আসলে ছেলেটারই দোষ! সব দোষই সদার। বাড়িতে সোমত্ত বউ রেখে সদা পালালোই বা কেন?
নিতাই বললে–কেন পালাবে না? সে কি আমাদের মত গো-মুখ্য? আমাদের বাপ মা যাকে-তাকে একটা গলায় ঝুলিয়ে দিলে আর আমরাও তাকে নিয়ে ঘর করি। কিন্তু সদা তো কলেজে পড়েছে। রেলবাজারের ইস্কুলে আর কলেজে যে এত বছর পড়লো তা কি মিছিমিছি! পেটে তার বিদ্যে পড়েছে যে!
–তুই থাম, সেজন্যে সদা বাড়ি ছাড়েনি। ছেড়েছে অন্য কারণে।
–কী কারণে ছেড়েছে?
এই প্রশ্নে এসেই সবাই থেমে যায়। কেউ বলে বাপের ওপর রাগ করে, কেউ বলে কলকাতার কোন মেয়ের সঙ্গে নাকি লাভ ছিল।
–দূর দূর, সব বাজে কথা! ছেড়েছে সংসার করবে না বলে।
–কেন সংসার করবে না?
–আরে, দেখতিস না ছোটবেলা থেকেই কেমন বিবাগী-বিবাগী ভাব। কখনও আমাদের সঙ্গে তাস খেলেছে? আমাদের ক্লাবে যাত্রা করেছে? সেবার কত করে ধরলুম ‘পাষাণী’ বইতে বিশ্বামিত্র ঋষির পার্টটা নিতে, তা নিলে? কতবার দেখেছি একলা-একলা মাঠে-মাঠে ঘুরতে। ওপারে কালীগঞ্জের বাবুদের ভাঙা বাড়িটা পড়ে আছে, কতদিন হাট করতে গিয়ে দেখেছি সে ভাঙা বাড়ির মধ্যে ঢুকেছে। দেখা হলে জিজ্ঞেস করতুম–কী রে, ওখানে ঢুকছিস কী করতে? সদা হাসতো, কিছু বলতো না। আমি তখনই জানি ও একদিন বিবাগী হয়ে যাবে!
–বিবাগী হয়ে যাবে কেন! কোন্ দুঃখে?
–তোদের মতো মুখ্য মানুষদের নিয়েই যত জ্বালা! বিষ্ণুপ্রিয়া পালায় দেখিসনি, নিমাই বউকে ছেড়ে চলে গেল?
আসলে চৌধুরী বংশ নিয়ে তর্কই হয়, কিন্তু ফয়শালা কিছুই হয় না। কিংবা হয়ত একটা ফয়শালা হোক সেটা কেউ চায় না। মনে হয় তারপর কী হবে সেইটেই তারা দেখবে। এখন তো বউ চলে গেছে, এখন চৌধুরী মশাই কী করবে? আবার কি বিয়ে করবে, না পুষ্যি নেবে?
কিন্তু একদিন দেখা গেল ননী ডাক্তারকে নিয়ে কৈলাস সামন্ত হন্তদন্ত হয়ে বাড়ির সদরে ঢুকছে!
ডাক্তারবাবুকে ডেকেছে কেন গো গোমস্তা মশাই? কার অসুখ?
কৈলাস বললে–গিন্নীমার!
অসুখ এমন সব বাড়িতেই হয়ে থাকে। তবে নবাবগঞ্জের কারো বাড়িতে অসুখ করলে হুট করে কেউ ডাক্তার ডাকে না, টোটকা-টাটকা খেয়েই সেরে যায় সকলের জ্বরজারি। রেলবাজারের ননী ডাক্তারকে ডাকলে মোটা টাকার গুনোগার দিতে হয়। কর্তাবাবুর যখন অসুখ হয়েছিল তখন রোজ আসতো ননী ডাক্তার। টাকার বাণ্ডিল নিয়ে গেছে তখন। কিন্তু আবার কার অসুখ? ছোটখাটো অসুখ হলে তো আর ননী আসতো না।
তারপর সেই ননী ডাক্তার রোজ-রোজ আসতে লাগলো।
কৈলাস গোমস্তাকে দেখেই সবাই জিজ্ঞেস করে কী গো গোমস্তা মশাই, তোমাদের গিন্নীমা কেমন আছেন?
কৈলাস মুখ গম্ভীর করে বলে–না গো, ভালো না, বড্ড বাড়াবাড়ি–
কৈলাস গোমস্তা আড়ালে চলে গেলেই সবাই বলাবলি করে বাড়াবাড়ি হবে না? পাপের ফল ফলবে না? চোখের জল ফেলতে ফেলতে বউটা চলে গেছে, তার চোখের জল কি মিথ্যে হবে গো?
কথাটা সবাই সায় দেয়। চোখের সামনে সমস্ত বাড়িটার ওপর যে অলক্ষ্মী নেমে আসছিল তা সকলের চোখেই পড়েছিল। সন্ধ্যে হলেই আলো নিভে যেত চণ্ডীমণ্ডপের। পরমেশ মৌলিক অনেকক্ষণ চৌধুরী মশাই-এর জন্যে খেরো খাতা কোলে করে বসে থাকতো। তারপর যখন দেখতো চৌধুরী মশাই তখনও আসছেন না তখন আস্তে আস্তে দীনুকে দিয়ে ভেতরে খবর পাঠাতো। দীনু ভেতর থেকে এসে বলতো–আজ আর ছোট মশাই খাতা দেখবেন না, কালকে দিনের বেলা দেখবেন বললেন–
